–রাজা ওভিড্ডো এই নকশাটা রেখে গিয়েছিলেন। ফ্রান্সিস বলল।
–এতে দেখা যাচ্ছে পুরানো নকশা। মন্ত্রী বলল।
–এটা দেখে আপনি কিছু বুঝতে পারছেন? ফ্রান্সিস বলল।
মন্ত্রীমশাই মাথা নেড়ে বলল–উঁহু। কিছুই বুঝতে পারছি না।
–ভালো করে দেখুন ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ দেখছি তো একটা টিলা একটা গুহামতো গাছপালা।
–কী গাছ? ফ্রান্সিস বলল।
–বলতে পারবো না। মন্ত্রী বলল।
–আচ্ছা একটা মরা গাছ আছে লক্ষ্য করেছেন? ফ্রান্সিস বলল।
-হ্যাঁ। মন্ত্রীমশাই নকশাটা ফ্রান্সিসকে ফেরৎ দিয়ে বলল–মা মেরিই জানেন এই নকশার অর্থ কী? ফ্রান্সিস নকশাটা কোমরের ফেট্টিতে রেখে দিল।
ফ্রান্সিস সিংহাসনের বেদী থেকে নেমে এলো। দাড়িগোঁফওয়ালা এগিয়ে এলো। বলল–কী? ছাড়া পাবার কিছু উপায় দেখলে?
–না। আমি অন্য বিষয়ে কথা বলেছি। ফ্রান্সিস বলল।
দাড়িগোঁফওয়ালা আর একজন সৈন্য ফ্রান্সিসকে নিয়ে চলল। ফ্রান্সিস তখন ভাবছে মন্ত্রীমশাইও নকশার কিছু বুঝল না। বলতেও পারল না কিছু। শুধু জানা গেল বছর একশো দেড়শো আগে এখানে রাজত্ব করত ওভিড্ডো নামে এক খামখেয়ালি রাজা। নিরেট সোনা দিয়ে একটা তরবারি বানিয়েছিল। তাব মৃত্যুর পর থেকে আর সেই সোনার তরবারি খুঁজে পাওয়া যায়নি। খামখেয়ালি রাজা ওভিড্ডো কোথায় কীভাবে তরবারিটি গোপনে রেখে গেছে কেউ জানে না। তারপরে যারা রাজত্ব করেছে তাদের কেউ কেউ সোনার তরবারি খুঁজেছে। কিন্তু পায়নি।
ফ্রান্সিসকে পাহারা দিয়ে দাড়িগোঁফওয়ালা আর অন্য সৈন্যটি সৈন্যাবাসে ওর ঘরে পৌঁছে দিয়ে গেল।
সেদিন বিকেলে শাঙ্কো হ্যারির কেবিনঘরে এলো। বিছানায় বসল। বলল–হ্যারি আমি আজ রাতে সমুদ্রতীরে নামবো। বেলচাটাও সঙ্গে নেব। ঐ চেস্টাটের জঙ্গল যাবো। দেখি রাজা ওনোবিজ্ঞের তরবারির কোনো হদিশ করতে পারি কি না।
–কিন্তু ঐ জঙ্গলেই তো ফ্রান্সিস রাজা অপৰ্তোর সৈন্যদের হাতে ধরা পড়েছে। এখনও বন্দী রয়েছে। হ্যরি বলল।
–ফ্রান্সিসকে নিয়ে ভেবো না। ও একা। অতি সহজেই পালাতে পারবে। আমি অতি সাবধানে যাবো। পাহারাদার সৈন্যদের দৃষ্টি এড়িয়ে একবার চেস্টনাটের জঙ্গলে ঢুকতে পারলেই আর ভয় নেই। শাঙ্কো বলল।
ফ্রান্সিস নেই তার ওপর তুমি যদি বন্দী হও? আমাদের দুশ্চিন্তার শেষ থাকবে না। তুমি যেও না। হ্যারি বলল।
হ্যারি ঐ তরবারিটার খোঁজ করতেই হবে। কিচ্ছু ভেবো না। বিপদ দেখলেই এক ছুটে সমুদ্রের ধারে চলে যাব। তারপর সমুদ্রে নেমে পড়বো। নিঃশব্দে সাঁতরে আমাদের এই জাহাজে চলে আসবো। শাঙ্কো বলল।
–দেখো–যদি পারো। তবে তুমিও বন্দীহলে আমরা অসহায় হয়ে পড়বা। হ্যারি বলল।
–কিছুই ভেবো না। শাঙ্কো বলল।
রাত একটু বাড়তেই শাঙ্কো বেলচাট নিয়ে জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো। দেখল হ্যারি দাঁড়িয়ে আছে। শাঙ্কো জাহাজের হালের দিকে গেল। দড়ির মইটা নামাল। বেলচাটা একহাতে ঘাড়ে তুলে মইয়ের কাঠের সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। নৌকোয় উঠল। অনুজ্জ্বল চাঁদের আলোয় হ্যারির দিকে চেয়ে হাত নাড়ল। নৌকো ছেড়ে দিল।
জ্যোৎস্না খুব উজ্জ্বল নয়। সমুদ্রেও জলের ওপরে কুয়াশার নীলচে আস্তরণ মতো। শাঙ্কো কুয়াশার আন্তরণের মধ্যে দিয়ে নৌকো চালাল। একটু বেশ ঠাণ্ডাহওয়া দিচ্ছে।
শাঙ্কো বৈঠে চালাল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই নৌকো তীরভূমিতে পৌঁছল। নৌকো থেকে নেমে নৌকো থেকে বেলচা তুলে নিল। নৌকোটা ঠেলে বালিয়াড়িতে এনে রাখল।
বেলচাটা কাঁধে নিয়ে শাঙ্কো চলল বুনো চেস্টনাট গাছের জঙ্গল লক্ষ্য করে। ঝোপঝাপের মধ্যে দিয়ে শাঙ্কো চলল। সদর রাস্তার কাছে এলো। সাবধানে ঝোঁপের আড়াল থেকে সদর রাস্তার দিকে তাকাল। দেখল রাজা অপৰ্তোর একদল সৈন্য সারি বেঁধে জাহাজঘাটের দিকে চলেছে। কারো মুখে কথা নেই। ধুপ ধুপ পায়ের শব্দ হচ্ছে শুধু। সবার হাতে খোলা তলোয়ার! যুদ্ধের আবহাওয়া এখানে। তাই দিনরাত পাহারা চলেছে।
শাঙ্কো ভাবল এ সময়ে গোপনে কোনো কাজ করা যাবেনা। ভাবল–আমরা নকশা পেয়েছি। সোনার তরবারি কোথায় থাকতে পারে তারও একটা অনুমান করতে পেরেছি। এখন দরকার কাজে নামা।
একটু পরেই দেখল জাহাজঘাট থেকে একদল সৈন্য রাজবাড়ির দিকে চলেছে। ধুলোঢাকা পথে ওদের পায়ের শব্দ উঠছে ধুপ ধুপ।
শাঙ্কো অপেক্ষা করতে লাগল। রাস্তার দুই দিকে তাকিয়ে কিছুদূর পর্যন্ত দেখল। না। আর কাউকে দেখা যাচ্ছে না। শাঙ্কো রাস্তায় শুয়ে পড়ল। তারপর হিঁচড়ে হিঁচড়ে চলল। পথ শেষ। শাঙ্কো দ্রুত উঠে দাঁড়িয়েই এক ছুট দিল চেস্টনাট গাছের জঙ্গলের দিকে। কাঁধে বেলচা।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই চেস্টনাট গাছের জঙ্গলে ঢুকে পড়ল। হাঁপাতে হাঁপাতে এবার অস্তে আস্তে চলল। অনুজ্জ্বল জ্যোৎস্না। তার ওপর জঙ্গল। জ্যোৎস্না পড়ছেও কম। ওর মধ্যেই সাবধানে পা ফেলে ফেলে চলল।
জঙ্গলের এদিক-ওদিক ঘুরতে ঘুরতে সেই মরা গাছটার কাছে এলো। দূর থেকে গাছের ফাঁক দিয়ে দেখল একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে গাছটার কাছে। গাছটাকে ধরে গাছের গোড়ায় যেন কিছু ঢালছে। শাঙ্কো এক ছুটে গিয়ে লোকটার সামনে দাঁড়াল। লোকটা চমকে উঠল। শাঙ্কো দেখল লোকটা বৃদ্ধ। গায়ে এই দেশীয় ঢোলাহাত জামা। হাতে একটা কাঠের পাত্র। বৃদ্ধটি কাঠের পাত্রটা সরিয়ে আনল। শাঙ্কো বৃদ্ধটির কাছে গিয়ে বলল–আপনি কে? ভাঙা ভাঙা গলায় বৃদ্ধটি বলল–আমি একজন বৈদ্য।
