–বেশ। চলুন। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল।
দুজনে চলল রাজার রাজসভায়। এদিকে ওদিকে পাথরের ঘরবড়ি ছাড়িয়ে একটা বড়ো বাড়িতে ঢুকল দুজনে। বাড়ির দরজায় সশস্ত্র প্রহরী। দুজনে ঘরটায় ঢুকল। ফ্রান্সিস দেখল–ঘরের দক্ষিণ দিকে রাজসিংহাসনে রাজা অপৰ্তো বসে আছে। সিংহাসনটা কাঠের। আসন পাখির পালকে তৈরি। নীলাভ সাটিন কাপড়ে ঢাকা। একপাশে বৃদ্ধ মন্ত্রী। অন্যপাশে সেনাপতি আর অমাত্যরা।
বিচার চলছিল। দাড়িগোঁফওয়ালা বলল–তুমি আমার সঙ্গে এসো। সে কিছুদূর এগিয়ে গেল। ফ্রান্সিসও পেছনে পেছনে এলো।
আর একটা বিচার আরম্ভ হল। দাড়িগোঁফওয়ালা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। ফ্রান্সিস রাজসভার চারদিক দেখতে লাগল।
অল্পক্ষণের মধ্যেই বিচার শেষ হল। দাড়িগোঁফওয়ালা একটু এগিয়ে গেল। রাজা অপৰ্তোর নজরে পড়ল। রাজা অপৰ্তো বলল–তোমার কিছু বলার আছে? দাড়িগোঁফওয়ালা মাথা একবার একটু নুইয়ে মাথা তুলল। ফ্রান্সিসকে দেখিয়ে যা যা ঘটেছে সব বলল। রাজা ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বলল–তোমরা ভাইকিং-বিদেশি। আমার রাজ্যে এসেছ গুপ্তচর হয়ে।
কাদের গুপ্তচর হয়ে এসেছি? ফ্রান্সিস বলল।
–খুবই সহজ। লরুল্লার রাজ্য ভিলিয়ানের হয়ে। রাজা বলল।
–আমি রাজা ভিলিয়ানের নাম এই প্রথম শুনলাম। ফ্রান্সিস বলল।
–তুমি বুদ্ধিমান। নিজেকে বাঁচাবার জন্যে তুমি মিথ্যে বলছো। রাজ বলল।
–আমি যা সত্য তাই বলছি। খুব দৃঢ়স্বরে ফ্রান্সিস বলল।
উঁহু। কিছু লুকোবার চেষ্টা করছে। রাজা বলল।
–আমার লুকোনোর কিছু নেই। যা সত্য তাই বললাম। ফ্রান্সিস বলল।
-তুমি শুধু ফল কুড়োবার জন্যে চেস্টাটের জঙ্গলে যাওনি। আমাদের যুদ্ধ আয়োজনের সংবাদ রাজা ভিলিয়ানকে পৌঁছে দেওয়ার কাজ তুমি নিয়েছো। রাজা বলল।
–মিথ্যে অপবাদ। আমি কেন গুপ্তচরবৃত্তি করতে যাবো। ফ্রান্সিস বলল।
–অনেক অর্থ পাবে সেই লোভে। রাজা বলল।
আমার সেই লোভ নেই। অনেক মূল্যবান গুপ্তধন আমি আবিষ্কার করেছি। কিন্তু সেই কাজেরজন্যে একটা স্বর্ণমুদ্রাও আমি নিইনি। আমি এখনও বলছি-আমি নির্দোষ। ফ্রান্সিস বলল।
রাজা অপৰ্তো ক্রুদ্ধ হল। বলল–থামো-তুমি দোষী কি নির্দোষ তার বিচার পরে। হবে। ততদিন তুমি সৈন্যাবাসে বন্দী থাকবে। বাইরের জগতের সঙ্গে তোমার কোনো যোগ থাকবে না। রাজা বলল।
আমাকে অন্যায়ভাবে বন্দী করে রাখা হচ্ছে। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমাকে যে হত্যা করা হয়নি–এটাই যথেষ্ট। রাজা বলল।
–বিনা প্রমাণে? ফ্রান্সিস বলল।
–প্রমাণের দরকার নেই। আমার হুকুমই প্রমাণ। রাজা বলল।
ফ্রান্সিস আর কোনো কথা বলল না। বুঝল রাজাঅপর্তোর কাছেন্যায় বিচার পাওয়া অসম্ভব। বিনা বিচারে বন্দীদের হত্যা করা রাজা অপত্যের কাছে কোনো অপরাধই নয়। এর কাছে প্রমাণ টমানের কথা বলা অর্থহীন। রাজা অপৰ্তো রগচটা লোক। বেশি কথা বললে হয়তো বিরক্ত হয়ে ফাঁসির হুকুম দিয়ে বসতে পারে।
ফ্রান্সিস চুপ করে রইল।
রাজসভার কাজ শেষ হল। রাজা অপৰ্তো উঠে দাঁড়াল। মন্ত্রী অমাত্য সেনাপতি আর প্রজারাও উঠে দাঁড়াল। রাজা অপতো সভা থেকে চলে গেল।
দাড়িগোঁফওয়ালা ফ্রন্সিসের কাছে এলো। বলল–এবার চলো। ফ্রান্সিস দেখল বৃদ্ধ মন্ত্রীমশাই বেরোবার দরজার দিকে যাচ্ছে। ফ্রান্সিস দাড়িগোঁফওয়ালাকে বলল–আমি মন্ত্রীমশাইর সঙ্গে কথা বলবো।
–মন্ত্রীমশাই তোমাকে মুক্তি দিতে পারবে না। দাড়িগোঁফওয়ালা বলল।
–না–অন্য ব্যাপারে মন্ত্রীমশাইর সঙ্গে কথা বলবো।
–বেশ। যাও। পালাবার চেষ্টা করবে না। গোঁফদাড়িওয়ালা বলল।
ফ্রান্সিস মন্ত্রীমশাইর সামনে এসে দাঁড়াল। বলল–মন্ত্রীমশাই? মন্ত্রীমশাই দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল কী ব্যাপার?
কয়েকটা ঘটনা জানতে চাই। ফ্রান্সিস বলল।
–বলো। মন্ত্রী বলল।
–আচ্ছা রাজা ওভিড্ডো কে ছিলেন? ফ্রান্সিস বলল।
প্রায় দেড়শো বছর আগে এখানকার রাজা ছিলেন। মন্ত্রী বলল।
–তিনি কি খুব ধনী ছিলেন? ফ্রান্সিস বলল।
-হ্যাঁ। শুনেছি–খুব খেয়ালি রাজা ছিলেন। ধনী ছিলেন তো বটেই। একটা প্রায় সাত হাত লম্বা তলোয়ার তৈরি করিয়েছিলেন। নিরেট সোনায় তৈরি। রাজবাড়ির কর্মকারেরা ঐ তলোয়ার তৈরি করেছিল। তলোয়ারের কোষের গায়ে হীরে মুক্তো মণিমাণিক্য গাঁথা ছিল। মন্ত্রী বলল।
–এটা কী করে জানলেন?-ফ্রান্সিস বলল।
–খেয়ালি রাজা ছিলেন তো। তলোয়ার তৈরি হবার পর সেটা প্রজাসাধারণের দেখার জন্যে একটা লম্বা কাঠের আসনে তলোয়ারটা রেখে রাজবাড়ির চত্বরে রেখেছিলেন। তলোয়ারের সামনে ভিড় লেগেই থাকতো। সন্ধেহলে তলোয়ারটা প্রাসাদের ভেতরে অস্ত্রাগারে রেখে দেওয়া হত। মন্ত্রী বলল।
–সেই তরবারিটার কী হল? রাজা ওভিড্ডো মারা যাবার পর আর কেউ ঐতরবারি চোখে দেখে নি? ফ্রান্সিস বলল।
-হা-মারা যাবার কিছুদিন আগে তরবারিটা অস্ত্রাগার থেকে বের করা বন্ধ হল। তারপর সেই তরবারি যে কোথায় কীভাবে ওভিড্ডো লুকিয়ে রাখলেন কেউ সেটা জানতে পারে নি। মন্ত্রী একটু থেমে বলল। রাজ ওভিড্ডোর পর তো আরো রাজা রাজত্ব করেছেন। তারা চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কেউ খুঁজে পান নি।
ফ্রান্সিস আড়চোখে তাকিয়ে দেখলদাড়িগোঁফওয়ালা একটু দূরে দুই পাহারাদারের সঙ্গে গল্প করছে। এই সুযোগ। ফ্রান্সিস কোমরের ফেট্টি থেকে নকশাটা বের করল। মন্ত্রীমশাইকে দেখাল শুধু নকশাটা। মন্ত্রীমশাই নকশাটা দেখে বলল কীসের নকশা?
