–আমার লাভ? ফ্রান্সিস বলল।
বিনিময়ে প্রচুর অর্থ পাও লরুল্লার রাজা ভিলিয়ানের কাছ থেকে। দাঁড়িগোঁফওয়ালা বলল।
–রাজা ভিলিয়ান আমার মতো এক নগণ্য বিদেশির কথা বিশ্বাস করবেন কেন? ফ্রান্সিস বলল।
ভিলিয়ানই তোমাকে পাঠিয়েছে। নিশ্চয়ই বিশ্বাস করেই পঠিয়েছে। দাড়িগোঁফওয়ালা বলল।
–আমি রাজা ভিলিয়ানের নাম এই প্রথম শুনলাম। ফ্রান্সিস বলল।
–বাজে কথা। চলো। কালকে রাজা অপৰ্তোর রাজসভায় যা বলতে চাও বলো। বলা যায় না–রাজা অপৰ্তো তোমাকে মুক্তিও দিতে পারেন। গোঁফদাড়িওয়ালা বলল।
দাড়িগোঁফ আর দাঁড়াল না। সৈন্যদের দিকে তাকিয়ে বলল–এটাকে নিয়ে আয়।
কয়েকজন ফ্রান্সিসকে ঘিরে দাঁড়াল। তারপর ফ্রান্সিসকে নিয়ে চলল।
চেস্টনাটের বন শেষ হল। সবাই বাইরে রাস্তায় এসে দাঁড়াল।
দাড়িগোঁফওয়ালা বলল–পাঁচজন ওটাকে নিয়ে যা। সৈন্য আবাসে রাখবি। দুজন নজরে রাখবি যেন পালাতে না পারে।
পাঁচজন সৈন্য ফ্রান্সিসকে নিয়ে চলল। দাড়িগোঁফওয়ালার নির্দেশমতো ফ্রান্সিসকে সৈন্যাবাসের দিকে নিয়ে চলল।
ওদিকে শাঙ্কো জাহাজ থেকে বেলচা নিয়ে এলো। বড়ো রাস্তা পার হতে গিয়ে থমকেদাঁড়াল, দেখল ফ্রান্সিসকে বন্দী করে কয়েকজন রাজা অপৰ্তোর সৈন্য চেস্টাট গাছের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসছে। পেছনে পেছনে আরো সৈন্য জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলো। চলল জাহাজঘাটের দিকে।
পাঁচজন সৈন্য ফ্রান্সিসকে নিয়ে রাজবাড়ির দিকে চলল। উত্তরমুখো।
শাঙ্কো কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। এখন ফ্রান্সিসকে উদ্ধার করতে লড়াইয়ে একা নেমে কিছুই করতে পারবেনা। তার জন্যে বন্ধুদের সাহায্য দরকার। শাঙ্কো ভাবল আগে দেখি ফ্রান্সিসকেওরা কোথায় বন্দী করে রাখে। সেই জেনে ওরা ফ্রান্সিসকেমুক্ত করতে চেষ্টা করবে।
আকাশ চাঁদের আলো। বেশ কিছুদূর পর্যন্ত সবই দেখা যাচ্ছে।
গাছগাছালির আড়ালে আড়ালে শাঙ্কো চলল বন্দী ফ্রান্সিসের পেছনে পেছনে।
ফ্রান্সিসকে নিয়ে সৈন্যরা এলো সৈন্য আবাসের সামনে। তারপর ফ্রান্সিসকে একটা ঘরে ঢুকিয়ে দিল।
দূর থেকে শাঙ্কো সবই দেখল। কিন্তু বুঝে উঠতে পারছে না কী করবে এখন। শাঙ্কো একটা গাছের নীচে বসল। পূর্বের আকাশে লালচে আলো ফুটে উঠল। অল্পক্ষণ পরেই সূর্য উঠল। শাঙ্কো তাকিয়ে রইল সেই দিকে। এখন দিশেহারা। একদিকে ফ্রান্সিস বন্দী। অন্যদিকে জাহাজে মারিয়া, বন্ধুরা, তারাও উদ্বিগ্ন। ফ্রান্সিস শাঙ্কোর কোনো খবর নেই।
শাঙ্কো উঠেদাঁড়াল। মারিয়া ও বন্ধুদের উৎকণ্ঠা দূর করতে হবে। তারপর ভাববেকী করবে।
বেলচাটা কাঁধে নিয়ে শাঙ্কো সদর রাস্তা এড়িয়ে ঝোপ জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলল। একে গায়ে বিদেশি পোশাক তার ওপর হাতে বেলচা। সহজেই রাজা অপৰ্তোর সৈন্যদের চোখে পড়ে যাবে। আমি যাই বলে বোঝাইনা কেন ওরা আমাকে ছাড়বে না। আমার বন্দী জীবন। ফ্রান্সিস যে ঘরে বন্দী হয়ে আছে। ওকে যে সেই ঘরেই বন্দী করে রাখবে তার কোনো মানে নেই। হয়তো অন্য ঘরে বন্দী করবে। ফ্রান্সিসের ঘরে বন্দী করে রাখলে তবু দুজনে মিলে পালাবার পরিকল্পনা করতে পারতো। কিন্তু একা বন্দী হলে পালাতে গিয়ে ধরাও পড়তে পারি। একবার ধরা পড়লে মুক্তির কোনো আশা নেই মৃত্যু হওয়াও বিচিত্র নয়।
জংলা ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে শাঙ্কো হাঁটতে লাগল। গা হাত পা কাটা ঝোঁপের ঘষায় কেটে গেল। হাত পা জ্বালা করতে লাগল। কিন্তু শাঙ্কো দমল না। কাটা ফোপ জঙ্গলের মধ্যে দিয়েই চলল।
বেলা বাড়ছে। শাঙ্কো ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাতর। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জাহাজে পৌঁছাতে হবে। শাঙ্কো দ্রুত চলল। এসে সারা গা হাত পা কাটাগাছে কেটে ক্ষত বিক্ষত হয়ে গেল। শাঙ্কো মুখ বুজে যন্ত্রণা সহ্য করতে লাগল।
সমুদ্রতীরে যখন পৌঁছল তখন বেশ বেলা হয়েছে। শাঙ্কো বালিয়াড়িতে নামল। দেখল নৌকোটা জলের কাছে ডাঙায় তোলা আছে। শাঙ্কো নৌকোটা টেনে টেনে জলের ওপর আনল। দেখল গলুইয়ে বৈঠেটা রয়েছে। শাঙ্কো বেলচাটা নৌকোয় রাখল। তারপর নৌকোটাকে এক ধাক্কায় সমুদ্রের জলে নামিয়ে বৈঠে বাইতে লাগল। নৌকো চলল জহাজের দিকে।
জাহাজের কাছে আসতে ভাইকিং বন্ধুরা ধ্বনি তুলল–ও-হো-হোশাঙ্কো নৌকোটা জাহাজের গায়ে ভেড়াল। দড়ি দিয়ে নৌকোটা বাঁধল জাহাজের সঙ্গে। ঝোলানো দড়িদড়া ধরে ধরে জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো।
ভাইকিং বন্ধুরা ছুটে এসে শাঙ্কোকে ঘিরে দাঁড়াল। সকলেরই এক প্রশ্নফ্রান্সিস কোথায়? ও এলো না কেন?
শাঙ্কো আস্তে আস্তে সব ঘটনাই বলল। ফ্রান্সিস বন্দী শুনে বন্ধুদের মন খারাপ হল। একপাশে মারিয়া দাঁড়িয়েছিল। শুনল সব। কিন্তু কোনো কথা বলল না। রেলিঙের কাছে এসে দাঁড়াল। তীরভূমির দিকে তাকিয়ে রইল। চোখ ছলছল করছে।
হ্যারি এগিয়ে এলো। বলল রাজকুমারী আপনি চিন্তা করবেননা–মন খারাপ করবেন না। আর কয়েকটা দিন যেতে দিন। ফ্রান্সিস ঠিক বন্দী অবস্থা থেকে পলিয়ে আসবে। আমাদের বড়ো সান্ত্বনা যে ফ্রান্সিস একা। একা ফ্রান্সিসকে কেউ বন্দী করে রাখতে পারবে না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। মারিয়া কিছু বলল না। তীরভূমির দিকে তাকিয়ে রইল।
ওদিকে পরদিন সকালে বন্দী ফ্রান্সিসকে খেতে দেওয়া হল দুটো পোড়া রুটি আর আনাজে তৈরি ঝোলমতো। ফ্রান্সিস খেয়ে নিল। দাড়িগোঁফওয়ালা ঢুকল। বলল চলো তোমাকে রাজা আপৰ্তোর রাজসভায় যেতে হবে।
