দু’জনে ফ্রান্সিসের কেবিনঘরে এলো। ফ্রান্সিস লেখাটা দেখাল। নকশা দেখাল। সব বলল। শাঙ্কোরা কীভাবে নকশাটা পেয়েছে তাও বলল। হ্যারি বলল,হু। তা হলে কখন তরবারি খুঁজতে যাবে?
আজ রাতেই। ফ্রান্সিস বলল।
রাত হল। ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে ডেকে পাঠাল। শাঙ্কো এলো। ফ্রান্সিস বলল, তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। বিশ্রাম করো। তুমি আর আমি টিলার নীচের জঙ্গলে যাব। রাজা ওভিড্ডোর তরবারি উদ্ধার করব। তুমি দুটো মশাল, চকমকি পাথর নেবে।
রাত বাড়ল। শাঙ্কো ফ্রান্সিসের কাছে এলো। ফ্রান্সিস তৈরি হল। নকশাটা কোমরের ফেট্টিতে জড়িয়ে রাখল। তারপর দু’জনে জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো।
সময়টা বোধহয় শুক্লপক্ষের কোনোও রাত। আকশে উজ্জ্বল চাঁদের আলো। দুজনে নৌকোয় নামল। ফ্রান্সিস নৌকো বেয়ে চলল তীরভূমির দিকে। তীরে পৌঁছল। চলল টিলার দিকে।
কপাল ভালো। পাহারাদার সৈন্যদের হাতে ধরা পড়তে হল না। সদর রাস্তাটায় সৈন্যরা পাহারা দিচ্ছিল। ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো তখন একটা বাড়ির পেছনে আড়াল নিল। সৈন্যরা কিছুক্ষণ ওই এলাকায় ঘোরাঘুরি করল। তারপর উত্তর দিকে চলে গেল। সেই সময় ফ্রান্সিসরা রাস্তা পার হল।
টিলার তলায় দাঁড়িয়ে দেখল, ওখানে বুনো চোট গাছের জঙ্গল।
ফ্রান্সিসরা জঙ্গলে ঢুকল। চেস্টনাট গাছগুলো ছাড়া ছাড়া। তাই অনেক জায়গাতেই চাঁদের আলো পড়েছে। তবু ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে মশাল জ্বালতে বলল। শাঙ্কো চকমকি ঠুকে দুটো মশাল জ্বালাল। ফ্রান্সিস বলল, শাঙ্কো, লক্ষ্য রাখো কোনও শুকনো মরা গাছ পাও কিনা।
দু’জনেই বুনো লতাগাছ আর ঝোঁপের মধ্যে দিয়ে খুঁজতে লাগল শুকনো মরা গাছটা। এভবে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ দেখল একটা শুকনো গাছের কাণ্ড। চারপাশে সব সজীব গাছ। ওই গাছটাই শুধু মরা শুকনো।
ফ্রান্সিস হাতের মশালটা একটা গাছের নিচু ডালে আটকে সেই গাছটার কাছে এলো। গাছটার কাণ্ড হাত দিল। কিছুটা ছাল উঠে এলো।
এইবার ফ্রান্সিসের চিন্তা হল, খুঁজে খুঁজে মরা গাছটা তো পাওয়া গেল। কিন্তু রাজা ওভিড্ডোর তরবারির সঙ্গে এই গাছটার সম্পর্ক কী? এইমরা গাছটার মধ্যেই কি তরবারিটা ঢোকানো আছে? গাছটার ভেতরটা কী ফাঁপা? তা হলে সেটা দেখতে হয়। ফ্রান্সিস বলল, শাঙ্কো, মশাল রেখে এসো। মরা কাণ্ডটায় ধাক্কা দিতে হবে।
শাঙ্কোর হাতের মশালটা মাটিতে পুঁতে ফ্রান্সিসের কাছে এলো। দুজনে মিলে কাণ্ডটায় ধাক্কা দিতে লাগল। গাছটা নড়তে লাগল। কিন্তু ভেঙে পড়ল না।
শাঙ্কো বলল, দাঁড়াও ফ্রান্সিস, আমি জাহাজ থেকে একটা বেলচা নিয়ে আসছি।
কিন্তু পাহারাদাররা যদি এখনও থাকে? ফ্রান্সিস বলল।
আমি সাবধানে যাব, সাবধানে আসব। তুমি ভেবো না।
শাঙ্কো লতাপাতা, ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে এসে রাস্তায় পড়ল। চাঁদের আলোয় দেখল পাহারাদার সৈন্যরা বেশ দূরে, ওরা বোধহয় সেনা আবাসে ফিরে যাচ্ছে। আর একদল আসবে।
শাঙ্কো দ্রুত পায় হামাগুড়ি দিয়ে রাস্তা পার হল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ছুটল নৌকো রাখার জায়গার দিকে।
ফ্রান্সিস ঘাসের উপর বসে রইল। একটু পরেই মরা গাছটায় পিঠ ঠেকিয়ে আরাম করে বসল। বেলটা না আনলে এখন আর কিছু করার নেই। ফ্রান্সিসের একটু তন্দ্ৰামতো এলো। টি ট্রি করে একটা রাতজাগা পাখি ডেকেই চলেছে।
হঠাৎ পট্পট্ শব্দে ফ্রান্সিসের তন্দ্রাভাবটা কেটে গেল। ও পেছন ফিরে তাকাল। দেখল–শাঙ্কোর রেখে যাওয়া মশালটা মাটিতে পড়ে গেছে। মশালের আগুন থেকে ঝরা পাতার মধ্যে আগুন লেগে গেছে। আগুন বাড়তে লাগল।
ফ্রান্সিস দ্রুত উঠেদাঁড়াল। একটা নিচুগাছ থেকে পাতাশুদ্বুডাল ভাঙল। সেইডালটা দিয়ে আগুন নেভাবার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু আগুন বেড়েই চলল। সেইসঙ্গে ধোঁয়া উঠতে লাগল। ফ্রান্সিস বুঝল সে। ভীষণ বিপদে পড়ে গেছে। রাজা অপৰ্তের সৈন্যরা ধোঁয়া দেখতে পাবে। কী ব্যাপার? আবশ্য তার আগেই দেখতে ছুটে আসবে। পালাতে হবে।
ফ্রান্সিস পেছন ফিরে পালাবার জন্য ছুটল। কিন্তু কয়েকটা গাছ পেরোতেই দেখল সামনে রাজা অপৰ্তোর সৈন্যরা দল বেঁধে আসছে। ফ্রান্সিস বুঝল-পালানো অসম্ভব। ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ল। দাড়িগোঁফওয়ালা একটা সৈন্য ফ্রান্সিসের সমানে এসে দাঁড়াল। একটু হেসে বলল–তুমি পালাচ্ছিলে?
-হ্যাঁ।
–পারবে এত সৈন্যদের বন্ধনী থেকে পালাতে? গোঁফদাড়িওয়ালা বলল।
–চেষ্টা করতাম। ফ্রান্সিস বলল।
মরতে। দাঁড়িগোঁফওয়ালা হেসে বলল
ফ্রান্সিস চুপ করে রইল। দাড়িগোঁফওয়ালা জিজ্ঞেস করল–
–এত রাতে তুমি এখানে কী করছিলে?
–চেস্টনাট গাছের ফল কুড়োচ্ছিলাম। ফ্রান্সিস বলল।
কাল সকালে কুড়োতে পারতে। দাড়িগোঁফওয়ালা বলল।
–দেরি হয়ে যেত। কাল সকালের মধ্যেই তোক সব ফল কুড়িয়ে নিত। ফ্রান্সিস বলল।
যাক গে–তুমি নিজেও জানো যে তুমি মিথ্যে কথা বলছে। আমাদের হাত থেকে তোমার নিস্তার নেই। এটুকু বলে গলা চড়িয়ে বলল–চল।
–কোথায়? ফ্রান্সিস বলল।
–সৈন্যাবাসে–বাকি রাতটুকু ওখানেই থাকবে। কালকে সকালে রাজা অপৰ্তোর রাজসভায় যাবে। রাজা অপর্তো নিশ্চয়ই তোমাকে শাস্তি দেবেন। দাড়িগোঁফওয়ালা বলল।
আমার অপরাধ? ফ্রান্সিস চড়া গলায় বলল।
–তুমি গভীর রাতে লুকিয়ে আমাদের রণকৌশল জানার চেষ্টা করো। দাড়িগোঁফওয়ালা বলল।
