তিনজনে বড়ো ঘরটায় এলো। খাটে বসল। শাঙ্কো সৈন্যদের হাতে ধরা পড়া, পালানো, সব ঘটনাই বলল। তারপর বলল, ফ্রান্সিস,এবার তো জাহাজেফিরতে হয়। কী করবে?
এখন কিছু নয়। খাওদাও, বিশ্রাম করো। রাতে জাহাজে ফিরতে হবে। ফ্রান্সিস বলল। তারপরেমাথারচুল, পোশাক থেকে ধুলোবালি ঝেড়ে ফেলতেলাগল। ফ্রান্সিসইএকসরাইখানা থেকে খবরকিনে আনল। দুপুরের খাওয়া হল। ফ্রান্সিস আবার বেরোল। সরাইখানারমালিকের কাছ থেকে এক হাঁড়ি জল নিয়ে এলো। শাঙ্কোরা এতক্ষণে জল খেতে পেল।
এবার শাঙ্কো সেই লেখাটা আর নকশাটার কাগজটা ফ্রান্সিসকে দিল। শাঙ্কো ওসব কীভাবে পেয়েছে তা বলল।
ফ্রান্সিস খাটে শুয়ে পড়ল। প্রথমে লেখাটা পড়ল। তারপর নকশাটা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখল। বলল, শাঙ্কো, নকশায় দুটো জিনিস লক্ষ্য করো। এক, টিলার গায়ে গুহা; আর দুই, জঙ্গলের মধ্যে একটা শুকনো গাছ। ওই টিলার গুহাতেই লোকটি নকশাটা পেয়েছিল। এখন দেখতে হবে মরা শুকনো গাছটার কোনোও গুরুত্ব আছে কিনা।
তা হলে তো ওই বনে যেতে হয়। বিস্কো বলল।
তাই যেতে হবে। রাজা ওভিড্ডোর তরবারি ওখানেই কোথাও আছে, মানে রাজা ওভিড্ডো গোপনে রেখে গেছেন। ফ্রান্সিস বলল।
ওই জঙ্গলে এত খোঁজাখুঁজি করা সম্ভব? শাঙ্কো বলল।
সেটা ওই জঙ্গলে না গিয়ে বলতে পারছি না। ফ্রান্সিস বলল।
সন্ধে হল। ফ্রান্সিস বলল, এখন নয়। গভীর রাতে জাহাজে ফিরতে হবে।
রাত্রে খাবার ফ্রান্সিসই নিয়ে এলো। ওর পোশাক দেখে কেউবিদেশি বলে ভাবইেপারলনা। রাত গম্ভীর হল। নিস্তব্ধ রাত। একসময় ফ্রান্সিসরা খাট থেকে নামল। তৈরি হল। ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। দরজা খুলে রাস্তায় উঠল। রাস্তা জনশূন্য। ফ্রান্সিস বলল, রাস্তা দিয়ে যাওয়া চলবে না। ওখানে এখন যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। সৈন্যরা সজাগ এখন। নিম্মই পাহারা জোরদার করা হয়েছে। আমরা ঝোপজঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাব। ধরা পড়ার সম্ভাবনা কম।
রাস্তা পার হয়ে ফ্রান্সিসরা বুনো ঝোপজঙ্গলে ঢুকল। চাঁদের আলো উজ্জ্বল ঝোপ জঙ্গল মোটামুটি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তিনজনে চলল।
যখন জাহাজঘাটার কাছে এলো, তিনজনেই হাঁপাচ্ছে। নিজেদের জাহাজ লক্ষ্য করে তীরভূমিতে হেঁটে হেঁটে আসতে দেখল ওদের নৌকো দুটো জলে ভাসছে। তিনজনেই নৌকোয় উঠল। দাঁড় টেনে চলল নিজেদের জাহাজের দিকে। নৌকো দুটো জাহাজের গায়ে লাগল। ফ্রান্সিসরা হালের কাছে দড়িদড়া ধরে ডেক-এ উঠে এলো। মাস্তুলের ওপর থেকে নজরদার পেড্রো চেঁচিয়ে বলল, ফ্রান্সিসরা এসেছে, ফ্রান্সিসরা এসেছে।
মারিয়া খুব দুশ্চিন্তায় ছিল। তখনও ঘুমোতে পারেনি। পেড্রোর ডাক শুনে মারিয়া ছুটল সিঁড়ির দিকে। ডেক-এ উঠে এসে ফ্রান্সিসদের দেখল। ওদিকে ভাইকিং বন্ধুরাও ছুটে এলো। ফ্রান্সিসরা ফিরে এসেছে। সবাই খুশি।
পরদিন সকালে রাঁধুনি বন্ধু ফ্রান্সিসের কাছে এলো। খাওয়ার জল খুব বেশি নেই। জল আনতে হবে। ফ্রান্সিস ডেক-এ উঠে এলো। শাঙ্কো আর বিস্কোকে বলল, তোমরা জল আনতে গিয়েছিলে। পিপে দুটো কী হল। শাঙ্কো তখন সবই বলল।
ওইটা দোকানটা চিনতে পারবে? ফ্রান্সিস বলল।
হ্যাঁ, হ্যাঁ। শাঙ্কো বলল।
তাহলে এখন চলো। তেমারসবচেয়ে ঘেঁড়া যে জামাটা আছে সেটা পরে এসো। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস এ-দেশের পোশাকটা পরল। শাঙ্কো ওর ভেঁড়াখোঁড়া পোশাকটা পরে নিল।
দু’জনে নৌকো বেয়ে তীরে এলো। সদর রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলল। ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে বলল, বেশ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটো। শাঙ্কো সেভাবেই হাঁটতে লাগল। দোকানটার সামনে এলো। শাঙ্কো দোকানদারকে দেখিয়ে দিল। ফ্রান্সিস এগিয়ে গিয়ে শাঙ্কোকে দেখিয়ে বলল, একে চিনতে পারেন?
দোকানদার একটুক্ষণ শাঙ্কোর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, সৈন্যরা ধরে এনেছিল।
ওর এক বন্ধুও ছিল? ফ্রান্সিস বলল।
হ্যাঁ। দোকানি বলল।
এরা দুটো জলের পিপে রেখে গেছে।
হ্যাঁ, হ্যাঁ। দোকানদার দোকানের ভেতর থেকে পিপে দুটো বের করে দিল।
ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো পিপে দুটো নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এলো। ফ্রান্সিস বলল, খাবার জল কোথায় পাওয়া যাবে সেটা জেনেছিলে?
হ্যাঁ, ওই টিলাটার নীচে নাকি ঝরনা আছে। শাঙ্কো বলল।
ঠিক আছে। চলো সেখানে। ফ্রান্সিস বলল।
দুজনে চলল টিলাটার দিকে। দুজনের হাতে দুটো পিপে। দূর থেকে দেখল টিলাটা। ন্যাড়া মাথা টিলা। কিছুক্ষণের মধ্যে টিলাটার নীচে পৌঁছল। দেখল টিলাটার নীচে কিছু গাছগাছালি আছে। তারই মধ্যে দিয়ে ঝরনার জল পড়ছে। জলধারাটা খুব বেশি জোরে পড়ছে না। মাটির হাঁড়ি কাঠের গামলা নিয়ে বেশ কিছু লোক জল নিতে এসেছে। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হল তারপর ফ্রান্সিসরা পিপে বসাল। জল ভরল। বেশ কিছু লোক ফ্রান্সিসদের তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল। সহজেই বুঝল–ওরা বিদেশি। ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো খাবার জল নিয়ে জাহাজে ফিরে এলো। হ্যরি বলল, ফ্রান্সিস, জলের সমস্যাটা তো মিটল। এবার জাহাজ চলুক দেশের দিকে।
ফ্রান্সিস একটু হেসে বলল, আজকের রাতটা এখানেই থাকতে হবে।
ব্যাপার কী বলো তো?
রাজা ওভিড্ডোর তরবারি খুঁজে বের করতে হবে।
হ্যারি দু’হাত ছড়িয়ে বলল, ব্যস, হয়ে গেল!
ফ্রান্সিস হেসে বলল, আমার কেবিনঘরে এসো। সব বলছি। নকশাটাও দেখবে।
