শাঙ্কো কাগজটা নিয়ে খাটে এসে বসল। বিস্কো বলল–কী ব্যাপার? কাগজটা কী? কাগজটার একপিঠে একটা বিবৃতিমতো লেখা। অন্যপিঠে একটা নকশা আঁকা।
–কীরকম নকশা? শাঙ্কো বিস্কোকে কাগজটা দেখাল। বিস্কো কিছুই বুঝল না।
–গুপ্তধনের সন্ধান টন্ধান এই নকশায় আঁকা হয়েছে–এটাই আমার বিশ্বাস।
ঠিক আছে। আগে বিবৃতিটা পড়ি। এটা পড়লে অনেককিছু জানা যাবে। শাঙ্কো বলল।
শাঙ্কো থেমে থেমে পড়তে লাগল—
লিসবনের শহরতলিতে আমাদের বাড়ি। দারিদ্র্য আর অভাব ছিল আমাদের নিত্য সঙ্গী। আমি তাহা সহ্য করতে পারিলাম না। ভাগ্যান্বেষণে বহির্বিশ্বে বাহির হইয়া পড়িলাম। নানা দেশে ঘুরিয়া বেড়াইলাম। তারপর এই ভিগোনগরে আসিলাম। আশ্রয় পাইলাম। তখনই শুনিলাম রাজা ওভিড্ডোর লুক্কায়িত সাত হাত লম্বানিরেট সোনায় তৈয়ারি তরবারির কথা। লোকমুখে শুনিলাম,সাত হাত লম্বা সেইতরবারির কোষেনাকিমহামূল্যবান হীরামুক্তা চুনিপান্না বসানো। সম্পূর্ণ কোষটি মিনেকরা। লোকমুখে আরও শুনিলাম যে, সেই তরবারি এখানকার টিলায় নাকি গুপ্তভাবে রাখা হইয়াছে। আমি সেই তরবারির সন্ধানে জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করিয়া আজ আমি বৃদ্ধ অথর্ব। আমার জীবন শেষ হইয়া আসিয়াছে। একবার ভাবিলাম নকশাটি ছিঁড়িয়া ফেলি পুড়াইয়া ফেলি। কিন্তু রাখিলাম এই আশায়, যদি কেহ রাজা ওভিড্ডোর তরবারি খুঁজিয়া বাহির করিবার চেষ্টা করে।
রাজা ওভিড্ডোর তরবারি নকশা সম্পর্কে বলি, উহা আমি টিলার পশ্চিমদিককার গুহায় পাইয়াছিলাম। ইহাতে সেই গুহা, টিলা এবং টিলার নীচে চোটগাছের জঙ্গল অঙ্কিত আছে। একটি মৃত গাছের শুষ্ক কাণ্ডও অঙ্কিত আছে। ইহার অর্থ বুঝি নাই।
পড়া শেষ হল। শাঙ্কো কাগজটা বিস্কোকে পড়তে দিল। বিস্কো মনোযোগ দিয়ে নকশাটা দেখতে লাগল।
দু’জনে খাটে বসে রইল।
রাত হল। রাত বাড়তে লাগল। এবার কিছু খেতে হয়। শাঙ্কো আবার সেই সরাইখানা থেকে খাবার নিয়ে এলো। দু’জনে খেল।
দু’জনে খাটে শুল। শাঙ্কো ভাবতে লাগল এখন কী করে জাহাজে ফেরা যায়। ফ্রান্সিসকে এই লেখা আর নকশাটা দিতে হবে। এসব ভাবতে ভাবতে শাঙ্কো ঘুমিয়ে পড়ল। বিস্কো তার আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে।
ওদিকে শাঙ্কো আর বিস্কো জাহাজেনা ফেরায় ভাইকিংরা বেশ দুশ্চিন্তায় পড়ল। ফ্রান্সিস রাতে ভালো করে ঘুমোতে পারল না। মাঝে-মাঝেই ডেক-এ উঠে আসতে লাগল। কিন্তু ওরা দু’জন ফিরল না। মারিয়া বলল, ফ্রান্সিস, অত দুশ্চিন্তা করছ কেন? শাঙ্কোদের কোনোও বিপদ হয়নি। বড়োজোর এখানকার কয়েদখানায় বন্দি হয়ে আছে। তুমি কাল সকালে যাও। কয়েদখানা খুঁজে বের করে ওদের কোনোও হদিস পাও কিনা দ্যাখো।
হ্যাঁ, কাল সকালে তো যেতেই হবে। খোঁজ করতেই হবে। ফ্রান্সিস বলল।
পরদিন সকালে বন্ধুরা কয়েকজন ফ্রান্সিসের কাছে এলো। শাঙ্কো আর বিস্কো সম্বন্ধে তাদের আশঙ্কার কথা জানাল। ফ্রান্সিস সকালের খাবার খেতে খেতে বলল, কিছু ভেবো না। আমি এক্ষুণি বেরোচ্ছি। ওদের ঠিক খুঁজে বের করব। বন্ধুরা চলে গেল।
ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়িয়ে বলল, মারিয়া, লিসবনে যে এ-দেশের পোশাকটা কিনেছিলাম ওটা বের করে দাও।
ওই পোশাক দিয়ে কী হবে? মারিয়া বলল।
হবে, হবে। তুমি দাও পোশাকটা। ফ্রান্সিস বলল।
অল্পক্ষণের মধ্যেই ফ্রান্সিস ওই পোশাকটা পরে নিল। তারপর ডেক-এ উঠে এলো। বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে নিয়ে বলল, ভাইসব, আমি শাঙ্কো আর বিস্কোর খোঁজে যাচ্ছি। তোমরা কেউ তীরভূমিতে যাবে না।
ফ্রান্সিস দড়ি ধরে ধরে ওদের ছোটো নৌকোটায় নামল। জাহাজে বাঁধা দড়ি খুলে নৌকো ছেড়ে দিল। দেখল শাঙ্কোরা যে নৌকো চড়ে এসেছিল সেটা তীরে ভেড়ানো রয়েছে। কিন্তু নৌকোয় পিপে দুটো নেই।
ফ্রান্সিস এবার এক কাণ্ড করল। তীরভূমি থেকে ধুলোবালি নিজের মাথায়, মুখে, গায়ের পোশাকে ছিটিয়ে দিল। এক খ্যাপাটে মানুষের মতো চেহারা হল ওর।
প্রান্তর পার হয়ে জাহাজঘাটার কাছে বড়ো রাস্তাটায় এলো। তারপরে দুহাত তুলে বলতে লাগল, হে শাঙ্কো, হে বিস্কো, দেখা দাও। রাস্তায় একটু যায় আর দাঁড়িয়ে। পড়ে গলা ছেড়ে বলে, হেশাঙ্কো, হেবিস্কো দেখা দাও। অল্পক্ষণের মধ্যেই ফ্রান্সিসের ওপর সকলের নজর পড়ল। রাস্তার পথচারীরা, দোকানটোকানে কেনাবেচায় ব্যস্ত মানুষেরা অবাক হয়ে ফ্রান্সিসকে দেখতে লাগল। ফ্রান্সিস সেইভাবে বলেই চলেছে, হে শাঙ্কো, হে বিস্কো দেখা দাও।
ফ্রান্সিসের গায়ে এ-দেশের পোশাক দেখে ফ্রান্সিসকে কেউ বিদেশি বলে চিনতে পারল না। ফ্রান্সিস দু’হাত ওপরে তুলে বলে চলল, হে শাঙ্কো-হেবিস্কো দেখা দাও। এইভাবে যেতে যেতে ফ্রান্সিস ভাবল, গলিগুলোর মধ্যে ঢুকেও বলতে হবে। এবার ফ্রান্সিস গলিতে ঢুকল। চেঁচিয়ে বলতে লাগল। একটা গলি শেষ করে ডান দিকের গলিতে ঢুকল। একটু এগিয়েইদু’হাত তুলে বলতে লাগল। কিছুদুর গিয়ে পোড়ো বাড়িটার কাছে এলো। চিৎকার করে বলল, হে শাঙ্কো, হে বিস্কো দেখা দাও।
ঘরের মধ্যে শাঙ্কো আর বিস্কো চমকে উঠল। লাফিয়ে উঠল। ফ্রান্সিসের গলা শাঙ্কো দরজার কাছে ছুটে এলো। দরজা একটু ফাঁক করে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস কাছাকাছি আসতেই শাঙ্কো দেশীয় ভাষায় বলে উঠল আমরা এখানে। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ল। আস্তে আস্তে দরজার কাছে এলো। তারপর এক ঝলক এদিক-ওদিক দেখে দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ল। দরজা বন্ধ করে দিল। দরজায় কোনো খিল নেই। শাঙ্কো বিস্কো ছুটে এসে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল। তিনজনই আনন্দে উদ্বেল। কিন্তু জোরে কথা বলতে পারছে না। দরজার পরেই রাস্তা। লোকজন যাচ্ছে আসছে।
