সৈন্যটি বলল, আমাদের সঙ্গে এসো। পালাবার চেষ্টা করবে না। সৈন্যটি চলল।
একটু যেতেই সৈন্যটির সঙ্গী দু’জন বলল, আমরা টিলার নীচে নজর রাখতে যাচ্ছি। তোমরা যাও। দুজন সৈন্য চলে গেল। গোঁফদাড়িওয়ালা সৈন্যটি আর তার সঙ্গীটি চলল।
যেতে যেতে শাঙ্কো মৃদুস্বরে ওদের দেশের ভাষায় বলল, বিস্কো, দাড়িওয়ালা আমার, চিমসেটা তোমার। কিছুটা যেতেই দেখা গেল একটা মোড়। শাঙ্কো আবার বলল, ডান দিকের গলিটা দিয়ে। গোঁফদাড়িওয়ালা সৈন্যটি গলা চড়িয়ে বলল, কী বলছ তোমরা?
যিশুর নাম নিচ্ছি। শাঙ্কো বলল।
গোঁফদাড়িওয়ালা খ্যাক খ্যাক করে হেসে উঠল। শাঙ্কো হঠাৎ পেট চেপে বসে। পড়ল। গোঁফদাড়িওয়ালা এগিয়ে আসছে, তখনই শাঙ্কো দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে দাড়িওয়ালার পেটে মাথা দিয়ে লাগাল এক গুঁতো। দাড়িওয়ালা দু’হাত তুলে রাস্তায় চিৎ হয়ে পড়ে। গেল। বিস্কো অন্যটির পায়ে এমনভাবে নিজের পা জড়িয়ে টান মারল যে, সেই সৈন্যটিও রাস্তায় পড়ে গেল। বিস্কো পা দিয়ে ল্যাং মারতে ওস্তাদ। বন্ধুদের এভাবে ফেলে দেয়। দুজনেরই হাত থেকে তলোয়ার ছিটকে গেল।
জলদি। শাঙ্কো কথাটা বলেইডান দিকের গলিতে ঢুকে পড়ল। পেছনে বিস্কো। দুজনে ছুটল।
সৈন্য দু’জন উঠে দাঁড়াল। তাদের সারা গায়ে ধুলোবালি লেগেছে। দাড়িওয়ালার দাড়িতেও ধুলো লেগেছে। দু’জনে গা থেকে ধুলো ঝাড়তে লাগল। তারপর গলিটায় ঢুকে শাঙ্কোদের ধরতে ছুটল। তখন বেশ দেরি হয়ে গেছে।
শাঙ্কোরা ছুটছে তখন। একটু পরে বাঁ দিকে একটা পোড়ো বাড়ি দেখল। দরজা হাট করে খোলা। দু’জনেই খোলা দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ল। শাঙ্কো দরজা বন্ধ করে দিল। দরজার খিলটা আধ ভাঙা। শাঙ্কো ঐ খিলটা চেপে ধরে রইল। দু’জনে কিছুক্ষণ দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে রইল। হাঁফাতে লাগল। কিছুক্ষণ পরেই দেখল, গোঁফদাড়িওয়ালা সৈন্যটি তার সঙ্গীকে নিয়ে রাস্তা দিয়ে ছুটে চলে গেল। দুজনে নিশ্চিত। বাড়িটার ছাত ভেঙে পড়েছে। পাথরের দেওয়ালে, থামে বুনো গাছ জন্মেছে। সামনের আধ-ভাঙা ঘরটায় দু’জনে ঢুকল। দেখল ঘরটার দরজা-জানালার চিহ্ন নেই। শুধু একটা জানলা অর্ধেকটা ভাঙা। লোহার ফ্রেম সবটা ভেঙে পড়েনি। ঘরটার মাঝামাঝি জায়গায় একটা খাট। খাটটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে একসময়ে খাটটা শৌখিন খাট ছিল। এখনও কাঠের গায়ে ফুল-লতাপাতার কাজ করা। খাটটার ওপরে জমা ধুলোটুলো ঝেড়ে নিয়ে দু’জনে বসল।
বেশ বেলা হয়েছে। খিদেয় পেট জ্বলছে। কিন্তু ওরা বাইরে বেরোতে সাহস পাচ্ছে না। খাওয়ার ব্যবস্থা করতেইহবে। শাঙ্কো উঠেদাঁড়াল। বলল, বিস্কো, আমি খাবার কিনে আনছি।
আবার ওই দাড়িওয়ালার পাল্লায় পড়বে। বিস্কো বলল।
না, না। দেখি চেষ্টা করে। শাঙ্কো বলল।
শাঙ্কো ভাঙা বাড়িটা থেকে বেরিয়ে এলো। চলল সদর রাস্তার দিকে। সদর রাস্তায় এসে হাঁটতে লাগল পুবমুখে। কিছুটা যায় আর চারপাশের লোকজন দেখে। সৈন্য দেখলেই কোনো দোকানে ঢুকে পড়ছে। সৈন্যরা চলে গেলেই বেরিয়ে আসছে। কপাল ভালো বলতে হবে, একটা ছোটো সরাইখানা দেখল। ও ঢুকে পড়ল। একটা লোক রুটি তৈরি করছে। দোকানের মালিক কাঠের বাক্স সামনে নিয়ে বসে আছে। শাঙ্কো রুটি, আলু আর নানা শাকের তৈরি তরকারি চাইল। যে-লোকটি রুটি তৈরি করেছিল সে এগিয়ে এলো। দুটো গোল পাতায় ভরে দিল রুটি-তরকারি। শাঙ্কো কোমরের ফেট্টি। আলগা করে ভাঙানি মুদ্রা দিল মালিককে। খাবার নিয়ে চলে এলো ভাঙা বাড়িটায়। দু’জনে রুটি তরকারি খেল। যা খিদে পেয়েছিল। কিন্তু জল নেই। জল খাওয়া হল না।
শাঙ্কো ভাঙ্গা খাটে শুয়ে পড়ল। রাত না হলে এখন আর কিছু করার নেই। রাত একটু বাড়লেই পালাবে। শাঙ্কো চোখ বুজে শুয়ে রইল। মাঝে মাঝে চোখ খুলছে। মাথার ওপর ভাঙ্গা ছাত দেখছে। আকাশ দেখছে। দেওয়াল দেখছে। কবেকার বাড়ি কে জানে! কারা থাকত এই বাড়িতে? পায়া ভাঙা খাটটা দেখে মনে হয় কোনো অবস্থাপন্ন পরিবারই এই বাড়িতে থাকত।
ঘরের এদিক-ওদিক দেখতে দেখতেশাঙ্কো হঠাই দেখল–পূবদিকের একটা জানালা প্রায় অটুট। অন্য জানালাগুলোর অস্তিত্বই নেই। জানালার জায়গাগুলোয় ফোকর; ভাঙা পাথর। সবগুলো জানলা ভাঙা। একটা জানালার ফ্রেম কী করে এতটা অটুট রইল। শাঙ্কো খাট থেকে উঠল।
জানালাটার কাছে এলে। জানালার কাছে এসে দেখল জানালার ফ্রেমটা লোহা দিয়ে তৈরি। শাঙ্কো দুহাতে জানলাটা ধরে টেনে দিল। ঝাঁকুনি দিল। কিন্তু জানালার ফ্রেম ভাঙা গেল না। শাঙ্কো হাল ছাড়ল না। অন্যসব জানালা নিষ্মই কাঠের তৈরি ছিল। শুধু এটাই কেন লোহার ফ্রেমের? নিশ্চয়ই এর কোনো কারণ আছে।
শাঙ্কো এবার শক্ত হাতে জানালার ফ্রেমটা ঝাঁকাতে লাগল। হাঠাৎই জানালার নীচের দিকে ফ্রেমের অংশটা ভেঙে বেরিয়ে এলো। ঝর ঝর করে পাথরের কুচি পড়ল। শাঙ্কো তখন হাঁপাচ্ছে। ফ্রেমের ভাঙা অংশটা ফেলে দিল। দেখল সেখানে একটা টানা গতমতো। তার মধ্যে একটা পার্চমেন্ট কাগজ। শাঙ্কো একটু অবাকই হল। কীসের কাগজ এটা? কাগজটা হলদে হয়ে গেছে। শাঙ্কো আস্তে আস্তে গোটানো কাগজটা ওর ছুরি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বের করে আনল। গোল করে পাকানো কাগজটা আস্তে আস্তে খুলল। দেখল কাগজটার ওপর দিকে কী যেন লেখা। এক নজর দেখেই বুঝল লেখাটা পুরোনো স্পেনীয় ভাষায় লেখা। লেখাটার মাথায় লেখা রাজা ওভিড্ডোর তরবারি। শাঙ্কো কাগজটা ওলো। দেখল একটা নকশা।
