মারিয়া প্যাচানো কাপড়টা খুলে পেটিকা দেখে হাঁ হয়ে গেল। ফ্রান্সিস হেসে বলল, পেটিকাটা খোলো। মারিয়া খুলল সেটা। পেটিকায় অলঙ্কার, কত বিচিত্র আকার সেসবের। বইরের ঝিকিয়ে উঠেছে অলঙ্কারগুলো। অত অলঙ্কার দেখে মারিয়া হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ফ্রান্সিসের দিকে৷ ফ্রান্সিস বলল, মারিয়া, এবার কিন্তু আমার হাত শূন্য নয়।
মারিয়া হেসে বলল, তোমার হাত শূন্য থাকলেও আমার কোনও দুঃখ থাকত না। তোমরা অক্ষত ফিরে এসেছ, এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া। ওদিকে ভাইকিং বন্ধুরা শাঙ্কোকে ঘিরে ধরেছে। শাঙ্কো হাত-পা নেড়ে তখন রানি তুহিনার অলঙ্কারের পেটিকা উদ্ধারের ঘটনাটা বলছে।
রাজা ওভিড্ডোর তরবারি
তখন সবে ভোর হয়েছে। ফ্রান্সিসদের জাহাজের চারপাশে কুয়াশার আস্তরণ। নজরদার পেড্রো মাস্তুলের ওপর থেকে চেঁচিয়ে বলল, ডাঙা দেখতে পাচ্ছি। কুয়াশা না কাটলে আর কিছু দেখা যাবে না।
ঘুম-ভাঙা চোখে কয়েকৰ্জন ভাইকিং কেবিনঘর থেকে জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো। তখনই হঠাৎ একটা জোর হাওয়ায় সমুদ্রের ওপর ছড়ানো কুয়াশার আস্তরণ সরে গেল। পেড্রো চেঁচিয়ে বলল, বন্দর, একটা ছোটো বন্দর দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্সিসকে ডাকো।
ভাইকিংদের কয়েকজন ছুটে সিঁড়ি বেয়ে একটা কেবিনঘরের দরজার সামনে এলো। এই কেবিনঘরে ফ্রান্সিস আর মারিয়া থাকে। দরজায় আঙুল ঠুকে একজন ভাইকিং গলা। চড়িয়ে বলল, ফ্রান্সিস, একটা ছোটো বন্দরের কাছে এসেছি আমরা। এবার কী করব?
দরজা খুলে গেল। ফ্রান্সিস বলল, চলো। আগে সব দেখি।
ফ্রান্সিসরা ডেক-এ উঠে এলো। ফ্রান্সিস জাহাজ চালক ফ্লেজারের কাছে এলো। বলল, ফ্লেজার, জাহাজ এখনই ওই বন্দরে ভিড়িও না। সবকিছু দেখেশুনে তারপর এগোব। ফ্লেজার জাহাজ ঘোরাল।
মারিয়া আর হ্যারি এলো। হ্যারি রেলিঙে ঝুঁকে বন্দরটা দেখল। বলল, ফ্রান্সিস, একটু ভেবেচিন্তে কাজ করতে হবে। লক্ষ্য করো যে দুটো জাহাজ বন্দরে ভেড়ানো, সেই দুটো জাহাজই যুদ্ধজাহাজ। ব্যবসায়ীদের জাহাজ নয়। তার মানে এই এলোকায় বোধহয় যুদ্ধের আয়োজন চলছে। কাজেই জাহাজ এখানেই থামালে ভালো হয়।
কথাটা ঠিকই বলেছ। ফ্রান্সিস বলল। তারপর ফ্লেজারকে বলল, জাহাজ এখানেই থামাও। তারপর শাঙ্কোর দিকে তাকিয়ে বলল, শাঙ্কো, এখানেই নোঙর ফেলো। আমরা আর এগোব না।
ঘরঘর শব্দে নোঙর ফেলা হল। জাহাজ দাঁড়িয়ে পড়ল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই শাঙ্কো আর বিস্কো তৈরি হল। ফ্রান্সিস তলোয়ার সঙ্গে নিতে নিষেধ করলে। শাঙ্কো আর বিস্কো দড়িতে বেঁধে দুটো পিপে ছোটো নৌকোটায় নামাল। তারপর নিজেরাই নামল। নৌকো চালাল তীরভূমির দিকে। জাহাজঘাটার দিকে গেল না।
নির্বিঘ্নেই তীরে পৌঁছল। তারপর নৌকো থেকে পিপে দুটো নিয়ে চলল খাওয়ার জলের সন্ধানে। প্রথমে জানতে হবে খাওয়ার জল কোথায় পাওয়া যাবে। যাচ্ছে ওরা যখন তখন দেখতে পেল একটা বিরাট প্রান্তরের মধ্যে মাত্র একটা বাড়ি। ধারেকাছে আর কোনও বাড়ি নেই।
দু’জনে বাড়িটার কাছে এলো। বন্ধ দরজার আঙুল ঠুকল। দরজা খুলে গেল। এক বৃদ্ধ এসে দাঁড়ালেন। শাঙ্কো জিজ্ঞেস করল, এখানে জল কোথায় পাব বলতে পারেন?
বৃদ্ধ একটু চুপ করে থেকে বললেন, আপনারা বিদেশি?
হ্যাঁ। কিন্তু বিদেশি বলে কি আমাদের জলতেষ্টা পায় না? শাঙ্কো বলল।
বৃদ্ধ বললেন, সেকথা নয়। এটা পোর্তুগালের মধ্যে। এখানকার রাজা অপর্তো। উত্তরে আছে লরুল্লা। রাজার নাম ভিলিয়ান। সেটা উত্তর স্পেনের মধ্যে। দুই রাজ্যে চলছে যুদ্ধের প্রস্তুতি। এই সময় বিদেশি আপনাদের বিপদ হতে পারে।
শাঙ্কো বুঝল জল জোগাড় করা বেশ কষ্ট হবে। বৃদ্ধটি আঙুল তুলে উত্তর দিকটা দেখিয়ে বললেন, ওইদিকেই বন্দর এলাকা। ওই এলাকা পার হয়ে দেখবেন একটা উঁচু টিলা। তার নীচে আছে ঝরনা। সেই ঝরনার জলই আমরা খাই।
ঠিক আছে। দেখি জল আনতে পারি কি না। শাঙ্কো বলল।
দু’জনে চলল বন্দর এলাকার দিকে। যেতে যেতেশাঙ্কো বলল, এই বন্দর এলাকাটাই এড়াতে চেয়েছিলাম। কিন্তু হল না। এখান দিয়েই যেতে হবে ঝরনাটায়।
বন্দর এলাকায় এলো। দেখল, বেশ ব্যস্ত এলাকা। দোকানপাট। বাড়িঘর। রাস্তায় বেশ লোকজন। একজন লোক বাজার টাজার করে যাচ্ছিল। শাঙ্কো তাকে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা এখানে ঝরনাটা কোথায়? লোকটি আঙুল তুলে টিলাটা দেখাল।
দু’জনে টিলার দিকে চলল। টিলাটার নীচে পৌঁছবার আগেই চারজন সৈন্য ওদের দিকে ছুটে এলো। দু’জনকে ঘিরে দাঁড়াল। দাড়ি গোঁফওয়ালা সৈন্যটি বলল, দাঁড়াও। শাঙ্কোর দাঁড়িয়ে পড়ল। সৈন্যটি বলল, তোমাদের পরিচয়?
আমরা ভাইকিং। শাঙ্কো বলল।
এখানে কী করে এলে? সৈন্যটি বলল।
জাহাজ চালিয়ে এসেছি। বিস্কো বলল।
তোমরা লরুল্লার রাজা ভিলিয়ানের গুপ্তচর!
তোমরা লরুল্লার রাজা ভিলিয়ান, এসব নাম এই প্রথম শুনলাম। শাঙ্কো বলল।
সেসব বুঝি না। তোমাদের বন্দি করা হল। সৈন্যটি বলল।
আমাদের জাহাজে জলের অভাব হয়েছে। আমরা জল নিয়ে যেতে এসেছি। তাই পিপে এনেছি। শাঙ্কো বলল।
ওসব অজুহাত শুনব না। চলো। সৈন্যটি বলল।
পিপে দুটো? বিস্কো বলল।
এই দোকানে রেখে যাও। সৈন্যটি বলল। তারপর কাছের দোকানটার দোকানিকে ডাকল। দোকানি তো ভয়ে সারা। তাড়াতাড়ি ছুটে এলো। সঙ্গে ওর কর্মচারী। সৈন্য বলল, এই পিপে দুটো তোমাদের দোকানে রাখো দোকানদার আর তার কর্মচারী মিলে পিপে দুটো নিয়ে গেল।
