সেই জায়গায় পাথরের দেওয়ালের অংশ দেখা গেল। হ্যারি বলল, ফ্রান্সিস, তবে কি রানি তুহিনার আমলেই এই মাটির প্রলেপ দেওয়া হয়েছিল?
ঠিক তাই। ফ্রান্সিস বলল।
কিন্তু কেন দেওয়া হয়েছিল? হ্যারি বলল।
খুব সহজ–অন্য তিনটে দেওয়াল ছেড়ে দিয়ে এই উত্তরের দেওয়ালেই মাটির প্রলেপ দেওয়া হয়েছিল কিছু জিনিস লোকচক্ষুর আড়ালে রাখতে। ফ্রান্সিস বলল।
হ্যারি লাফিয়ে উঠল। বলল, রানি তুহিনা চার পাপড়ির ফুলের নকশা গোপন রাখার জন্যেই এটা করেছিলেন।
ঠিক বলেছ। ফ্রান্সিস বলল। তারপর দেওয়ালটার নীচের দিকে কুড়ুলের ঘা মারতে লাগল। মটি ছিটকে পড়তে লাগল। পাথরের দেওয়াল দেখা যেতে লাগল। যতদূর হাত যায় ততদুর পর্যন্ত ফ্রান্সিস মাটির পলেস্তরা খসিয়ে দিল। কিন্তু পাথরের দেওয়ালে কিছুই দেখা গেল না। ফ্রান্সিস হাঁফাতে লাগল। এবার হ্যারিও কুড়ল চালিয়ে অনেকটা মাটি খসাল।
একটু বিশ্রাম নিয়ে এবার ফ্রান্সিস মইটা দেওয়ালে রাখল। অন্য সব ঘরে দেওয়ালের একটা নির্দিষ্ট উচ্চতায় তিন পাপড়ি ফুলের নকশা কুঁদে তোলা হয়েছে। এবার ফ্রান্সিস ওই নির্দিষ্ট উচ্চতা হিসেব করে কুড়ুল চালাতে লাগল। হিসেব করে কুড়ল চালাতে লাগল।
মাটি খসে পড়তে লাগল। হঠাৎই দেখা গেল, সেই ফুলের পাপড়ি। ফ্রান্সিস এবার সাবধানে মাটি খসাল। ফুটে উঠল চার পাপড়ির ফুলের নকশা।
মইয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ হাঁফাতে লাগল। মেঝেয় হ্যারি, শাঙ্কো আর জিতা গভীর আগ্রহ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কিছুসময় গেল। এবার ফ্রান্সিস জোরে কুড়ুল চালাল ওই নকশাটার ওপর।নকশাটা খানখান হয়ে ভেঙ্গে পড়ল। একটা প্রায় চৌকোণো ফেঁকর দেখা গেল। ফ্রান্সিস কুড়ুল ঠুকে ফোকরটা বড়ো করল। মশালের আলো এখানে পৌঁছোয়নি। কাজেই ভেতরে কী আছে দেখা গেল না।
ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে ফোকরের ভেতরে হাত ঢোকাল। হাতে ঠেকল একটা লম্বামতো কাঠের বাক্স। ও বুঝল, ওটা অলঙ্কার রাখার পেটিকা।
আস্তে আস্তে ফ্রান্সিস পেটিকা বাইরে নিয়ে এলো। হ্যারি আর শাঙ্কো চিৎকার করে উঠল, ও হো হো। ওদের আনন্দের ধ্বনি।
ফ্রান্সিস মই রেখে আস্তে আস্তে নেমে এলো। শাঙ্কো গিয়ে মশালটা নামিয়ে আনল।
মশালের আলোয় দেখা গেল পেটিকার গায়ে ধুলোর আস্তরণ পড়ে গেছে। ফ্রান্সিস আস্তে আতে ঢাকনাটা খুলল। দেখা গেল পেটিকায় কত রকমের অলঙ্কার। প্রায় দুশো বছর আগেকার অলঙ্কার। ধুলো ময়লা লেগেছে। তাই মশালের আলোয় ঝিকিয়ে উঠল না অলঙ্কারগুলো। তবু কত মূল্যবান রানি তুহিনার অলঙ্কারগুলো। পেটিকাটাও কী সুন্দর! কালো কাঠের পেটিকা। তার গায়ে সোনা-রুপোর লতাপাতা, ফুলের নকশা।
হ্যারি বলল, ফ্রান্সিস। এখন এই অলঙ্কারগুলো কী করবে?
জিতাকে দেব। ওদেরই দেশের এক রানির সম্পদ এসব। জিতাই পাবে। ফ্রান্সিস বলল।
জিতা বলল, এত সম্পদ পেলে আমার দুঃখদুর্দশার জীবন শেষ হবে, এটা ঠিক। কিন্তু ফ্রান্সিস যদি এই সম্পদ আবিষ্কার না করত তবে তো আমি কিছুই পেতাম না। তাই বলছি ফ্রান্সিস, তুমি যতটা চাও ততটাই নাও, বাকিগুলো আমি নেব।
হ্যারি বলল, না। বরং সব অলঙ্কার দু’ভাগে ভাগ করে দু’জনে নাও।
জিতা মাথা নেড়ে বলল, বেশ। তারপর কোমরের ফেট্টি খুলে মেঝেয় পাতল। পেটিকা থেকে সব অলঙ্কার ঢালা হল। হ্যারি, জিতাকেই ভাগ করতে বলল। সব দু’ভাগ হল।
ফ্রান্সিস বলল, জিতা, এই গয়নাগুলোর ওপর আমার বিন্দুমাত্র লোভ নেই। আগের কয়েকটা অভিযান আমি কিছুই আমার স্ত্রীকে এনে দিতে পারিনি। তাই আমার অংশ পেটিকায় ভরে তাকে দেব। খুব খুশি হবে সে।
এবার নিজেদের জাহাজে ফেরা। ফ্রান্সিস জিতাকে বলল, তুমি এই বনের বাইরে আমাদের নিয়ে চলো। বড়ো রাস্তায় গিয়ে একটা ফসল-টানা গাড়ি জোগাড় করে দেবে, যাতে আমরা জাহাজঘাটে যেতে পারি। জিতা মশাল হাতে গুহাপথ দিয়ে চলল, পেছনে ফ্রান্সিসরা। ওরা যখন বাইরে এলো, রাত হয়েছে। চাঁদের ম্লান আলোর মধ্যে দিয়ে সবাই চলল।
একসময় বড়ো রাস্তায় এলো। জিতা গ্রামে গিয়ে কৃষকদের গাড়ি আর একজন গাড়োয়ানকে নিয়ে এলো। ফ্রান্সিসরা গাড়িতে উঠল। ফ্রান্সিস জিতার ফেট্টির কাপড় কিছুটা নিল। পেটিকাটা কাপড় দিয়ে জড়িয়ে রাখল।
জিতা হাত বাড়িয়ে ফ্রান্সিসের হাত ধরল। একটু কান্নাভেজা গলায় বলল, কোনওদিন, ভাবিনি আমার দুঃখ-দারিদ্র ঘুচবে। ফ্রান্সিস তুমি আমাকে নতুন জীবন দিলে। ফ্রান্সিস মৃদু হেসে জিতার হাতে চাপদিয়ে হাত সরিয়ে নিল। ফ্রান্সিসদের গাড়ি চলল জাহাজঘাটার দিকে।
ফ্রান্সিস পথ দেখিয়ে গাড়িটা নিয়ে এলো জাহাজঘাটা থেকে দূরে যেখানে ওরা নৌকোটা পারে তুলে রেখে গেছে, সেখানে। ফ্রান্সিস ভাবল, নৌকোটা তো পাওয়া যাবে না। মাছ-ধরিয়েদের পাড়া থেকে নৌকো আনতে হবে। কিন্তু আশ্চর্য, পারে এসে দেখল ওদের নৌকোটা রয়েছে।
ওরা চিৎকার করে উঠল, ও হো হো।
নৌকোয় উঠল ওরা। নৌকো চলল ওদের জাহাজের দিকে।
একসময় ওদের নৌকো ওদের জাহাজের গায়ে এসে লাগল। ততক্ষণে ভাইকিং বন্ধুদের আনন্দের চিৎকার, হাসি শুরু হয়ে গেছে।
ফ্রান্সিসরা জাহাজে উঠে এলো। সবাই ছুটে এলো ওদের কাছে। মারিয়াও ছুটে এলো হাসতে হাসতে। ফ্রান্সিস কাপড়ে প্যঁচানো পেটিকাটা মারিয়ার হাতে দিল। মারিয়া আর ভাইকিং বন্ধুরা তখনও বুঝতে পারল না ওটা কী। মারিয়া প্যাঁচানো কাপড়টা খুলছিল না। ফ্রান্সিসই বলল, কাপড়টা খুলে কী আছে দ্যাখো।
