সৈন্যরা বলল, ফ্রান্সিস, আমি বন্ধুদের বলেছি ওই শিরস্ত্রাণ আর বর্ম সৈন্যদের সুযোগ বুঝে বাহুতে তলোয়ার চালাতে।
ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, তুমি ঠিক বলেছো। কথাটা বন্ধুদের আর একবার মনে করিয় দাও। কথাটা ফ্লেজার আবার গলা চড়িয়ে বলল।
সৈন্যরা খোলা তলোয়ার হাতে ছুটে আসতে লাগল। সবচেয়ে আগে সেই সেনাপতি। বিস্তৃত ঘাসের প্রান্তরটা পার হয়ে আসতে সত্যিই ওরা বেশ পরিশ্রান্ত হল। হাঁফাতে হাঁফাতে ফ্রান্সিসদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
শুরু হল লড়াই। বেশিরভাগ ভাইকিং শিরস্ত্রাণ বর্ম পরে ছিল। কাজেই সৈন্যরা ওদের সহজে কাবু করতে পারল না। প্রচণ্ড লড়াই চলল। ফ্রান্সিস একা চারজন সৈন্যের সঙ্গে লড়াই করতে লাগল। সৈন্যদের তলোয়ারের ঘাষে ফ্রান্সিসের জামা অনেক জায়গায় কেটে গেল। শরীরেও লাগল। রক্ত পড়তে লাগল। ফ্রান্সিস বুঝল, সৈন্যদের মাথায় তলোয়ার চালিয়ে লাভ নেই। কাজেই ও একটু সুযোগ পেলেই সৈন্যরা বাহু হাত লক্ষ্য করে তলোয়ার চালিয়ে লাভ নেই। এসে সৈন্যরা আহত হতে লাগল। আহত হাত থেকে তলোয়ার ফেলে দিতে লাগল। ফ্রান্সিস তখন অন্য সৈন্যদের দিকে ধেয়ে গেল। লড়াই চালাতে লাগল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মিনের সৈন্যরা হার স্বীকার করতে লাগল। হঠাৎ সেই সময় সেনাপতি ফ্রান্সিসের একেবারে সামনে এসে পড়ল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে সেনাপতিকে আক্রমণ করল। দু’জনের তলোয়ারের লড়াই জমে উঠল।দু’জনেই নিপুণ হাতে তলোয়ার চালাতে লাগল। ততক্ষণে আহত সৈন্যরা পালাতে শুরু করেছে। ভাইকিংরা লড়াই থামিয়ে দু’জনের তলোয়ারের লড়াই দেখতে লাগল। লড়াই চালাতে চালাতে ফ্রান্সিস চাপা গলায় হাঁফাতে হাঁফাতে বলল–বলেছিলাম সুযোগ পেলেই তোমাকে আমি হত্যা করবো। আজ সেই সুযোগ এসেছে। বুঝল বর্ম শিরস্ত্রাণ পরা সেনাপতিকে সহজে কাবু করা যাবে না। ঠিক করল সেনাপতির মথার শিরস্ত্রাণটিকে ফেলে দিতে হবে। ফ্রান্সিস তলোয়ার চালাতে চালাতে তক্কে তকে রইল। সুযোগ এসে গেল। সেনাপতি একটু অন্যমনস্ক হয়েছে। তখন ফ্রান্সিস বিদ্যুৎগতিতে শরীরের সমস্ত শক্তি নিয়ে সেনাপতির মাথা লক্ষ্য করে তলোয়ার চালাল। শিরস্ত্রাণের বন্ধনি ছিঁড়ে গেল। শিরস্ত্রাণ ছিটকে গিয়ে মাটিতে পড়ল। ফ্রান্সিস আর সেনাপতিকে আত্মরক্ষার সুযোগ দিল না। দ্রুত সেনাপতির মাথায় তলোয়ারের কোপ বসাল। সেনাপতির হাতের তলোয়ার ফেলে দিয়ে দু’হাতে মাথা চেপে ধরল। তারপর বসে পড়ল।
ফ্রান্সিস সেনাপতির বুকে গলায় তলোয়ার বিধিয়ে দিল।
লড়াই শেষ। ফ্রান্সিস হাঁফাতে হাঁফাতে জিতার কাছে এলো। বলল, জিতা মিনের কি আরও সৈন্য এখানে আছে?
হ্যাঁ। রানি তুহিনার প্রাসাদের ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজে তাদের লাগানো হয়েছে। দুই পাণ্ডিতকে সাহায্য করছে তারা।
হু–সেই সৈন্যরা আসার আগেই আমাদের প্রায় সবাইকে জাহাজে ফিরে যেতে হবে। পরিশ্রান্ত ভাইকিংরা কেউ কেউ প্রান্তরের ঘাসে বসে পড়েছে। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল ভাইসব, শুধু আমি, শাঙ্কো, হ্যারি আর জিতা এখানে থাকব। রানি তুহিনার দুর্গের সন্ধান করব। রানির গুপ্তভাণ্ডার উদ্ধার করব।
যে ভাইকিংরা বসে পড়েছিল তারা উঠে দাঁড়াল। লড়াইয়ে আহতদের ওরা ধরে ধরে নিয়ে চলল। সবাই চলল জাহাজঘাটার দিকে।
তখন সূর্য উঠেছে। রোদ ছড়িয়ে পড়েছে বনে, কয়েদঘরের মাথায়। বনজঙ্গলের মাথায়।
হ্যারিকে ডেকে ফ্রান্সিস বলল, চলো, রানি তুহিনার দুর্গে যাই।
চারজন বনের মধ্যে দিয়ে চলল রানি তুহিনার দুর্গের দিকে। যখন দুর্গে এসে পৌঁছল তখন বেলা হয়েছে। দুর্গের প্রবেশ পথেই একটা মশাল রাখা ছিল। মশালটা ফ্রান্সিস তুলে নিল। গুহাপথে ঢুকল চারজন।
রানির শয়নকক্ষে ঢুকল। দেখল, যা কিছু ওরা রেখে গিয়েছিল, সবই আছে। জিতা উনুনের কাছে গিয়ে রান্নার উদ্যোগ করতে লাগল।
ফ্রান্সিস মেঝেয় বসল। তারপর ক্লান্তিতে শুয়ে পড়ল। চিত হয়ে শুল। দেখল, ওপরে পাথরের ছাদ। প্রকৃতির হাতে তৈরি ছাদ। পাশ ফিরে তাকাল। পাথরের দেওয়ালগুলো দেখল। তখনই উত্তরদিকের দেওয়ালটার দিকে চোখ পড়ল। সত্যিই আশ্চর্য্য! উত্তরদিকের দেওয়ালটা অনেকটা মসৃণ। এটাও প্রকৃতির আর-এক খেয়াল।
সঙ্গে সঙ্গে আর একটা চিন্তাও মাথায় খেলে গেল, এ ঘরের কোনও দেওয়ালেই তিন পাপড়ির ফুল খোদাই করা নেই। আবার ফ্রান্সিসের চোখ পড়ল উত্তরাদিককার অনেকটা মসৃণ দেওয়ালের দিকে। প্রকৃতির হাতে এত মসৃণ একটা দেওয়াল তৈরি হতে পারে? যতি তা না হয় তবে এখানেই যারা বাস করে গেছে তারা দেওয়ালটি ছেনি দিয়ে যতটা সম্ভব মসৃণ করেছে। কিন্তু তারা অন্য দেওয়ালগুলো মসৃণ করল না কেন?
ফ্রান্সিস এসব ভাবছে তখনই হ্যারি ওই মসৃণ দেওয়ালে ফ্রান্সিসের মইটা ঠেকা দিয়ে রাখছিল। বোধহয় ভালো করে ঠেকা দিতে পারেনি। তাই হ্যারি ঘুরে দাঁড়াতেই মইটা দেওয়াল লেগে মেঝেয় পড়ে গেল। ফ্রান্সিস দেখল, দেওয়ালে মইয়ের ঘষায় একটা অস্পষ্ট দাগ হয়েছে। পাথরে দাগ?
ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। ছুটে গেল দেওয়ালটার কাছে। মইয়ের ঘষায় দাগ লাগা জায়গাটা দেখল। চিৎকার করে বলে উঠল, হ্যারি, শাঙ্কো, এই দেওয়ালে মাটির প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। তাই এত মসৃণ। ফ্রান্সিস ছুটে গিয়ে কুড়ুলটা নিয়ে নিয়ে এলো। দেওয়ালটায় কুড়ুলের ঘা মারল। মাটির চাঙড়া উঠে এলো। আবার ঘা মারল। বেশ কিছু গুঁড়ো মাটি ঝরে পড়ল।
