ফ্লেজার দেখল, কয়েদঘরের পেছনে কিছুটা পরেই বনজঙ্গল শুরু হয়েছে। ওইদিক দিয়েই কয়েদঘরের পেছনে চলে যেতে হবে। ওখান দিয়েই আক্রমণ করতে হবে।
ফ্লেজার ডানদিকে বনজঙ্গলের দিকে সবাইকে যেতে ইঙ্গিত করল। সবাই সেদিকে চলল। ওদিকে দিয়ে ঘুরে ওরা কয়েদঘরের ঠিক পেছনে চলে এলো। সবাই অল্প হাঁফাচ্ছে তখন। ফ্লেজার সবাইকে একসঙ্গে জড়ো হতে বলল। সবাই একত্র হল গোল হয়ে। ফ্লেজার মৃদুস্বরে বলল, হঠাৎ আক্রমণ করেই সৈন্যদের ডান বাহু জখম করতে হবে। তা হলেই ওরা তলোয়ার চালাতে পারবে না। বিদ্যুৎগতিতে এই কাজ সারতে হবে। তবেই ওরা হার স্বীকার করতে বাধ্য হবে। শিরস্ত্রাণ আর বর্ম কোনও কাজেই লাগবে না। পেড্রোকে ডেকে ফ্লেজার বলল, পেড্রো তোর কাজ হল ছুটে গিয়ে মশাল দুটো মাটিতে ফেলে দিবি। পা দিয়ে চেপে আগুন নিবিয়ে দিব। বারান্দা অন্ধকার হয়ে যাবে। অন্ধকারে আমাদেরই সুবিধে হবে। একটু থেমে ফ্লেজার বলল, সবাই তলোয়ার খোলো। কিন্তু শব্দ না হয়।
এবার সবাই আস্তে আস্তে তলোয়ার খুলে তৈরি হল। একজন ভাইকিং বন্ধু বলল, ফ্লেজার, যদি এই কয়েদঘরে ফ্রান্সিসরা না থাকে, সেটা আগে না জেনে জীবনের ঝুঁকি নেব কেন?
ফ্লেজার বলল, ফ্রান্সিসদের খোঁজে যেখানেই যাবে সেখানেই জীবনের ঝুঁকি নিতে হবে। এবারে কথা নয়, কাজ। একসঙ্গে সবাই পাহারদারদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ো। ওরা আমাদের চেয়ে সংখ্যায় কম।
কয়েদঘরের অন্ধকার পেছন দিক দিয়ে দ্রুত এসে ভাইকিংরা প্রহরীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। পেড্রো ছুটে এসে মশাল দুটো পাথরের খাঁজ থেকে তলোয়ারের খোঁচায় নামিয়ে পা দিয়ে চেপে নিভিয়ে দিল। অন্ধকার হয়ে গেল বারান্দাটা। আক্রমণের প্রথম ধাক্কায় প্রহরীরা হকচকিয়ে গেল। কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। ততক্ষণে পাঁচজন প্রহরী। বাহুতে তলোয়ারের ঘা খেয়ে খাপ থেকেতলোয়ার খুলতেই পারল না। খোলা তলোয়ার। ছিল মাত্র দু’জন প্রহরীর হাতে। এদের দুজনের ওপর প্রায় অন্ধকারে তিন-চারজন ভাইকিং কাঁপয়ে পড়ল। দু’জন প্রহরীই মেঝেয় ওপর চিত হয়ে পড়ল। হাত থেকে তলোয়ার ছিটকে গেল। লড়াই শেষ। প্রহরীরা অনেকেই গোঙাতে লাগল। ভাইকিংরা চিৎকার করে উঠল, ও-হো-হো। যুদ্ধজয়ের চিৎকার। সঙ্গে সঙ্গে কয়েদঘর থেকেও চিৎকার উঠল, ও-হো-হো। তা হলে ফ্রান্সিসরা এই কয়েদঘরেই বন্দী হয়ে আছে। ভাইকিংরা হইহই করে উঠল।
ফ্রান্সিস ফ্লেজারদের আক্রমণে সময় থেকেই দরজার লোহার গরাদে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। তখন পেড্রো মশাল নিভিয়ে দিয়েছে। অন্ধকারে ঠিক বুঝতে পারছিল না। আক্রমণকারী কারা। চাঁদের অস্পষ্ট যেটুকু আলো আসছিল তাতেই ফ্রান্সিস বুঝল, আক্রমণ করেছে ভাইকিং বন্ধুরা। ততক্ষণে মারিয়া, হ্যারিরা সবাই এসে জড়ো হয়েছে দরজার কাছে।
লড়াই শেষ হতেই ভাইকিংদের যুদ্ধজয়ের ধ্বনি উঠল।ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে ডাকল। ফ্লেজার। ফ্লেজার কয়েদঘরের দরজার কাছে ছুটে এলো। ফ্রান্সিস পাহারাদারদের একজনকে দেখিয়ে বলল, ওকে ধরো। ওর কোমরে চাবির গোছা আছে। ওকে দরজা খুলে দিতে বলো। তাড়াতাড়ি করো। মিনের বাড়ি থেকে, সেনা ছাউনি থেকে সৈন্যরা হইচই, গোলমাল নিশ্চয়ই শুনেছে। এক্ষুণি ছুটে আসবে। তাড়াতাড়ি।
ফ্লেজার ছুটে গিয়ে চাবিওয়ালা প্রহরীটিকে ধরল। বলল, তালা খুলে দাও। আমি তালা খুবল না। প্রহরীটি বলল।
ঠিক আছে, চাবিটা দাও। ফ্লেজার বলল
আমাকে না মেরে চাবি পাবে না। প্রহরীটি বলল।
তাহলে মরো। কথাটা বলে ফ্লেজার প্রহরীটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। প্রহরীটি ফ্লেজারের প্রথম আক্রমণটা ঠেকাল। এবার দু’জনের তলোয়ারের লড়াই চলল। এগিয়ে পিছিয়ে ফ্লেজার নিপুণ হাতে তলোয়ার চালাতে লাগল। প্রহরীটির তখন দম ফুরিয়ে এসেছে। ও মুখ হাঁ করে হাঁফাতে লাগল। তেমন জোরে আর তলোয়ার চালাতে পারছে না।
ফ্লেজার হঠাই প্রহরীটির মার এড়িয়ে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে দ্রুত তলোয়ারের কোপ মারল ওর কাধ লক্ষ্য করে। প্রহরীটি সেই মার ঠেকাতে পরল না। ফ্লেজারের তলোয়ার পাহারাদারটির ডান কাঁধে বিধে গেল। তলোয়ার তুলে নিল ফ্লেজার। পাহারাদারটির কাঁধ থেকে রক্ত পড়তে লাগল। পাহারাদারটি ক্ষতস্থানে হাত চেপে ধরে বসে পড়ল। ফ্লেজার ওর কোমর থেকে চাবির থোকাটা খুলে নিল। দরজার কাছে এগিয়ে এলো। দরজার কাছে তখন ভাইকিং বন্ধুদের ভিড়। ফ্লেজার ভিড়ের মধ্যে দিয়ে গিয়ে দরজার তালায় চাবি ঢোকাল। ঘোরাল। তারা খুলল না। ফ্রান্সিস বলল, সবচেয়ে বড়ো চাবিটা লাগবে। ফ্লেজার দরজা খুলে ধরল। ফ্রান্সিসরা সবাই দ্রুত বেরিয়ে এলো। কিছু বাবার সৈন্যও বেরিয়ে এসে পালিয়ে গেল। ফ্রান্সিস চেঁচিয়ে বলে উঠল, ভাইসব, এখনও লড়াই শেষ হয়নি। ওই দেখো মিনের সৈন্যরা ছুটে আসছে।
চাঁদের আলোয় দেখা গেল মিনের সৈন্যরা খোলা তলোয়ার হাতে ছুটে আসছে। পনেরো-কুড়িজন সৈন্য।
মারিয়া শাঙ্কো ছাড়া সকলে প্রহরীদের হাতে থেকে কেড়ে নেওয়া তলোয়ার নিয়ে তৈরি হল। অনেকেমিনের পরাজিত সৈন্যদের শিরস্ত্রাণ, বর্ম খুলে নিয়ে নিজেরা পরেছে।
ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল, ভাইসব আমরা এগিয়ে যাবনা। ওরা প্রান্তরটা পার হয়ে আসুক। এতে ওরা ক্লান্ত হবে। তাতে আমাদেরই সুবিধে হবে।….
