ফ্লেজার বলতে লাগল–মোট তিনজন প্রহরী আমাদের খবর নিয়ে ভেতরে ঢোকে। আমাদের খাওয়া হয়ে গেলে তিনজন এঁটো থালা বাটি নিয়ে চলে যায়। তিনজন যখন ঢোকে তখন দরজা খোলা থাকে। চারজন সৈন্য তখন দরজার সামনে থাকে। ফ্লেজার থামল। তারপর বলতে লাগল–আমরা ততক্ষণ অপেক্ষা করবো না। তিন প্রহরী যখনই খাবার নিয়ে ঢুকবে তখনই আমরা ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ব। গরম ঝোল ওদের চোখে ছুঁড়ে ফেল। ওরা তখন চোখের জ্বালায় অস্থির হয়ে যাবে। তখন দরজা খোলা। আমরা এক ছুটে বাইরে বেরিয়ে এসে পেছনের ঐ বনভূমির দিকে ছুটবো।
বাইরের চারজন প্রহরী কিছু বোঝার আগেই দ্রুত বনের দিকে ছুটবো। প্রচণ্ড বৃষ্টি আর অন্ধকারের মধ্যে প্রহরীরা আমাদের হদিশ করতে পারবে না। ওর মধ্যেও যদি কোনো প্রহরী আমাদের মধ্যে কাউকে ধরে ফেলে তাহলে আমি তাকে উদ্ধার করে নিয়ে ছুটবো। এই হল পরিকল্পনা। এখন এই পরিকল্পনা মতো কাজ করা। তোমাদের কারো কিছু বলার থাকলে বলো। কেউ কোনো কথা বলল না।
রাত বাড়তে লাগল। ঝড়বৃষ্টি সমানে চলেছে।
একসময় প্রহরী তিনজন খাবার নিয়ে দরজা খুলে ঢুকল। সঙ্গে সঙ্গে চার-পাঁচজন ভাইকিং প্রহরীদের মধ্যে যে ঝোলের মস্ত বড়ো কাঠের গামলটা নিয়ে ঢুকল তার ওপর আঁপিয়ে পড়ে ঝোলের গামলাটা কেড়ে নিল। তারপর দ্রুত হাতে তিনজনের মুখে ঝোল ছিটিয়ে দিল। তিনজনই চোখে হাত চাপা দিয়ে বসে পড়ল। খাবারদাবার সব ছিটকে পড়ল। তিনজনের তখন চোখ জ্বলছে।
ফ্লেজার ছুটে দরজা পার হল। বাইরের প্রহরীরা কিছু বোঝার আগেই জড় বৃষ্টির মধ্যে ভাইকিংরা সিঁড়ি থেকে লাফ দিয়ে নীচে নেমেই ছুটল বনভূমির দিকে।
একজন ভাইকিং বৃষ্টিভেজা মাটিতে আছড়ে নেমে পড়ল। একজন প্রহরী কতকটা আন্দাজেই খোলা তলোয়ার হাতে ছুটে এলো। দলের সামনে ছিল ফ্লেজার। অন্ধকার অস্পষ্ট দেখল ভাইকিং বন্ধুকে ফিরে দাঁড়িয়ে ফ্লেজার ছুটে এসে বন্ধুকে তুলল। তারপর দুজনেই ছুটল। তখনই বিদ্যুৎ চমকাল। একজন প্রহরী ফ্লেজার আর ফ্লেজারের বন্ধুকে দেখল। খোলা তলোয়ার হাতে জোরে আসতে লাগল। ফ্লেজার হঠাৎ ওর সামনে হামা দিয়ে বসে পড়ল। অন্ধকারে প্রহরীটি ফ্লেজারের গায়ে পা বেঁধে উপুড় হয়ে পড়ে গেল। হাত থেকে তলোয়ারও ছিটকে গেল।
ফ্লেজার বন্ধুকে নিয়ে প্রাণপণে ছুটল। একটু পরেই বনভূমির শুরু। বন্ধুরা আগেই বনে ঢুকে পড়েছে। ফ্লেজার আর ওর বন্ধু বনভূমিতে ঢুকে পড়ল।
বনভূমিতে একটানা বৃষ্টি পড়ার শব্দ।
কিছু পরে ফ্লেজার বলল–ভাইসব–এখন আর ছুটে চলার দরকার নেই। সবাধানে চলো। সবাই আমার পেছনে এসো।
ঐ বৃষ্টি আর বনের অন্ধকারের মধ্যে ফ্লেজার সেই বৃদ্ধের বাড়ির সামনে এসে হাজির হল। দরজার টোকা দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
দরজা খুলে গেল। বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে। অন্ধকারে ফ্লেজারকে চিনতে পারল না। ফ্লেজার বলল–কিছুদিন আগে আমি আর আমার বন্ধু আপনার ঘরে আশ্রয় নিয়েছিলাম। আপনার মনে আছে বোধহয়।
-হ্যাঁ হ্যাঁ মনে আছে বৈকি। তোমরা ভাইকিং। তাই না। বৃদ্ধ বলল।
–হ্যাঁ। আমি বন্ধুদের নিয়ে এসেছি। এখানে রাতটা থাকবো। ফ্লেজার বলল।
— নিশ্চয়ই। এসো। বৃদ্ধ বলল।
ভাইকিংরা বৃদ্ধের ঘরের বারান্দায় উঠে দাঁড়াল। তারপর গায়ের পোশাক খুলে গা মাথা মুছতে লাগল।
বৃদ্ধ চকমকি পাথর ঠুকে মশাল জ্বালাল। এতক্ষণ পরে আলো দেখে ভাইকিংরা খুশি হল। অন্ধকার থেকে আলোয়। ভাইকিংরা ঐ ছোট্ট ঘরের মেঝেতে বসল। কেউ কেউ শুয়ে পড়ল। তখনও কেউ কেউ ওরা হাঁপাচ্ছে।
ফ্লেজার বৃদ্ধের কাছে এলো। বলল–যে কোনো কারণেই হোক আমাদের আজকের রাতের খাওয়া জোটেনি। আমাদের খেতে দেবার মতো কিছু আছে?
–এই বনভূমির বাইরে শহরে গ্রামে যারা থাকে তারা আমাকে ভক্তিশ্রদ্ধ করে। তারা খাবার জিনিসটিনিস দিয়ে যায়। আজ সকালেই এক ধনী ব্যবসায়ী এসেছিলেন। দু’বস্তা আটা চিনি আনাজপাতি ফলটল দিয়ে গেছেন। এনেছেন ফেরাতে তো পারি না। আমর আর কতটুকু লাগে।
যদি দয়া করে ওখান থেকে কিছু দেন তাহলে আমাদের ক্ষুধা মেটে। ফ্লেজার বলল।
নিশ্চয়ই। রান্নার উনুন আছে। আপনাদের কেউ রান্নার লোক আছে। বৃদ্ধবলল।
–হ্যাঁ আছে। আপনার শুকনো কাঠ আছে?
–হ্যাঁ। পেছনের চিলতে ঘরটায় আছে।
–ঠিক আছে। আপনি দেখিয়ে দিন।
–যে রাঁধবে তাকে আসতে বলো।
ফ্লেজার ভেনকে ডাকল। বলল সব। ভেন বলল–আগেরবার তো আমিই বেঁধেছিলাম।
ভেন সব দেখেটেখে এলো। ফ্লেজারকে বলল–খাবার কী আছে আমি জানি।
কম কম করে খেলে আমাদের হয়ে যাবে।
–তুমি রান্না শুরু করো। যেটুকু খেতে পারি তাতেই হবে। ফ্লেজার বলল।
ভেন দেখল ওর হাতের মশালটা ছাড়া আর একটা মশাল দরজার ওপরে রয়েছে।
ভাইকিংরা সারা ঘরের মেঝেয় শুয়ে পড়ল। ঘুমও এলো।
একটা দুটো পাখির ডাক শোনা গেল।
রাত শেষ।
ভোর হল।
তখনও কেউ কেউ ওঠেনি।
সকাল হতে সবাই উঠল।
ফ্লেজার বলল–ভাইসব। আমাদের এক্ষুণি এখান থেকে চলে যেতে হবে। আমরা বন্দর শহর সিউতাতে আরবীয় শাসক মিন-এর রাজত্বে যাবো। ওখানে ফ্রান্সিসদের খোঁজ করতে হবে।
এবার ফ্লেজাররা নিঃশব্দে চলল ওই ঝুপসি পাতার গাছটার দিকে। গাছের নীচে এসে দাঁড়াল। বাঁ দিকে আবার চলল। চিলতে রাস্তাটা ধরে কিছুটা উঁচু-নিচু জমি পার হয়েই কয়েদঘরটা দেখা গেল। কয়েদঘরের লোহার দরজার দুটো মশাল জ্বলছে। আলোয় দেখা গেল সাত-আটজন পাহারাদার দাঁড়িয়ে বসে আছে। ডানপাশে ঘাসে ঢাকা একটা মাটির ঢিবি। ফ্লেজার ফিসফিস করে বলল, সবাই ঢিবিটার পেছনে বোসো। সবাই ঢিবিটার পেছনে গিয়ে বসল। এবার ফ্লেজার ভাবতে লাগল কিভাবে ওই পাহারাদারদের কাবু করা যায়, ছুটে গিয়ে ওদের সামনাসামনি আক্রমণ করা যায়। কিন্তু ওদের মাথায় শিরস্ত্রাণ, বুকে বর্ম। সামনাসামনি আক্রান্ত হলে ওরা লড়াইয়ের জন্যে নিজেদের তৈরি করার সময় পারে। ফ্লেজার বুঝল, এই সময়টুকু ওদের দেওয়া চলবে না। আক্রমণ করতে হবে অতর্কিতে, হঠাৎ যাতে ওরা তৈরি হওয়ার সময় না পায়।
