কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃদ্ধের ঘরটা দেখতে পেল। ভেন পাথরের বারান্দায় উঠে বন্ধ দরজায় টোকা দিল। একটু পরে দরজা খুলে গেল। বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে। বৃদ্ধ হেসে বলল এসো এসো। বাইরে বোধহয় বৃষ্টি কমেছে।
—হ্যাঁ। বৃষ্টি থেমে গেছে। ভেন বলল।
–ভেতরে এসো। বৃদ্ধ বলল।
দুজনে অন্ধকার ঘরে ঢুকল। বৃদ্ধ একটা মশাল জ্বালল। ফ্লেজারদের চেহারা- মাথা পোশাক দেখে বলল–তোমরা কি আছাড় টাছার খেয়েছিলে।
হ্যাঁ। ফ্লেজার বলল-বুঝলেন–একেবারে কাদার মধ্যে।
দুজনে ওপরের এদেশীয় পোশাক খুলল। নিজেদের দেশীয় পোশাক আর খুলল না। ঘরে একটা কাঠের পাটাতন পাতা। তাতে মোটা সুতোয় কাজ করা মোটা কাপড় পাতা। বৃদ্ধ বলল–কোথায় যে তোমাদের শুতে দি।
–পাথরের মেঝেতেই শোব। কিন্তু বড্ড খিদে পেয়েছে। ফ্লেজার বলল।
–ঘরে কিছু ফলমূল আছে। খাও। বৃদ্ধ বলল।
বলেছিলাম আর কিছু নেই? ভেন বলল।
–হ্যাঁ। আটা চিনি এসব আছে। কিন্তু
–ব্যস্। আমি উনুন পাতছি। কাঠকুটো আছে তো?
–হ্যাঁ–হ্যাঁ। বৃদ্ধ বলল।
–তাহলে তিনটে বড়ো পাথর নিয়ে আসছি।কথাটা বলে ভেন ঘরের বাইরে চলে গেল। বৃদ্ধ বলল–তোমরা পরিশ্রান্ত। এই কাঠের পাটাতনে বসে বিশ্রাম করো।
–মেঝেতেই বসছি। এসবে আমরা অভ্যস্ত। ফ্রেজার মেঝেতে বসে পড়ল। ভেন পাথর নিয়ে ফিরে এলো। তিনটে পাথর বসিয়ে উনুন মতো বানাল। মশালের আগুন দিয়ে কাঠকুটো জ্বেলে উনুনে দিল। বৃদ্ধগিয়ে পাটাতনে বসল।
কিছু মনে করবেন না আপনার ঘুম ভাঙ্গালাম। ফ্লেজার বলল।
–কী যে বলো। তোমরা আমার অতিথি। আমার এই ভাঙ্গা ঘরে তোমরা যে আতিথ্য গ্রহণ করেছো এতেই আমি ধন্য। বৃদ্ধ বলল।
ফ্লেজার মেঝেয় শুয়ে পড়ল। একটু তন্দ্ৰামতো এলো। ভেন-এর রান্নাও চলল।
ভেন-এর রান্না হল। দুজনে হাপুস হুপুস করে চিনিমাখা রুটি খেল।
তারপর দুজনে মেঝেয় শুয়ে পড়ল।
সকালে পাখির ডাকে ঘুম ভাঙ্গল দুজনের। হাতমুখ ধুয়ে ওরা গত রাতের বাড়তিরুটি খেল।
এবার ফ্লেজার সমস্যায় পড়ল কী করবে এখন? বলল-ভেন–এখন কী করবে?
–দেখো ফ্লেজার ফ্রান্সিসদের খোঁজ করতে গেলে গভীর রাতে যেতে হবে। অত রাতে কোথায় খুঁজবো? তার চাইতে আমি যেটা ভাবছি বলছি। একটু থেমে ভেন বলল– ফ্রান্সিসদের কয়েদঘরে বন্দী করে রাখা হয়েছে কিনা এটা বুঝতে হলে একটা কথা ভাবছি। রাজকুমারীকে ফ্রান্সিস কয়েদঘরে রাখতে দেবে না। নিম্মই রাজকুমারীকে জাহাজে থাকার ব্যবস্থা করবে। ফ্রান্সিসের কথায় শাসক মিন নিই রাজি হবে। এটা মিনের কাছেও সুবিধার মনে হবে।
রাজকুমারী জাহাজে বন্দী হয়ে থাকলে ফ্রান্সিসরা আর পালাতে পারবে না। রাজকুমারীকে রেখে ওরা কখনও পালাতে চাইবে না।
-হ্যাঁ এটা ঠিক বলেছো। ফ্লেজার বলল।
–তাহলে ফ্রান্সিসদের খোঁজে এখনই না গিয়ে আমাদের জাহাজে চলো। ওখানে রাজকুমারীকে পাবো। সব জানতে পারবো। ফ্রান্সিসরা কেমন আছে, কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েছে কিনা পালাবার কী উপায় ভাবছে–এসব জানতে পারবো রাজকুমারীর কাছ থেকে। ভেন বলল।
–ঠিক আছে। চলো আমাদের জাহাজেই যাওয়া যাক। ফ্লেজার বলল।
বৃদ্ধকে ধন্যবাদ জানিয়ে দুজনে ওদের জাহাজ যেখানে নোঙর করে আছে সেই সমুদ্রে তীরভূমির দিকে চলল।
ঘণ্টাখানেকের মধ্যে দুজন সমুদ্রতীরে পৌঁছল। দেখল জাহাজ নোঙর করাই আছে। তীরভূমিতে ওদের দুটো নৌকো বেলভূমিতে তোলা আছে।
একটা নৌকোতে ওরা উঠে বসল। দাঁড় নৌকোর গলুই থেকে তুলে নিল ফ্লেজার। নৌকো চালাল জাহাজের দিকে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই নৌকো গিয়ে জাহাজের গায়ে ভিড়ল। দুজনে জাহাজে উঠল। ওদের রাঁধুনি পিত্তন ছুটে এলো। ফ্লেজারকে জড়িয়ে ধরল। বলল–আর সবাই কোথায়?
–রাজকুমারী কোথায়?
–সেই খোঁজেই তো এখানে এলাম। ফ্লেজার বলল।
–কেউ তো জাহাজে ফেরে নি। পিওন বলল।
–তাহলে রাজকুমারীকে জাহাজে রাখা হয়নি। তবে রাজকুমারী এখন কোথায় আছেন? ভেন বলল।
–তা তো বলতে পারবো না। পিত্তন বলল।
যাক গে–পিওান আমাদের খেতে দাও। ভেন বলল।
-ঠিক আছে। তোমরা বিশ্রাম করো। আধ ঘণ্টার মধ্যে তোমাদের খেতে দেব। পিত্তান বলল।
পিত্তান আধ ঘণ্টার মধ্যে রুটি মাংসের ঝোল বেঁধে দিল। ফ্লেজার আর ভেন খেতে শুরু করল। দুজনে কোনো কথা না বলে খেতে লাগল। বারদুয়েক আরো রুটি মাংস চেয়ে খেল। খাওয়া শেষ।
এইবার দুজনে বুঝল–কী ক্লান্ত ওরা। ফ্লেজার কেবিনঘরে এসেই শুয়ে পড়ল। ভেন কিছুক্ষণ পিত্তানের সঙ্গে গল্পগুজব করল। তারপর কেবিনঘরে এসে শুয়ে পড়ল। অল্পক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল।
দুজনে সন্ধে পর্যন্ত ঘুমোল।
তারপর তিনজনেই ডেক-এ উঠে এলো। তাকিয়ে রইল তীরভূমির দিকে। ফ্রান্সিসরা কেউ এলো কিনা। কিন্তু তীরভূমি জনশূন্য। তিনজনে কেবিনঘরে ফিরে এলো।
পরদিন সকালের খাবার খেয়ে তিনজনে ডেক-এ উঠে এলো। তীরভূমির দিকে তাকিয়ে রইল। ফ্রান্সিস বা অন্য কোনো বন্ধুদের দেখা গেল না। ফ্লেজার ভেবে পেল না কোথায় ফ্রান্সিসদের খোঁজ করবে।
সন্ধেবেলায়ও ওরা ডেক-এ উঠে তাকিয়ে রইল সমুদ্রতীরের দিকে। কেউ এলো না।
ভেন বলল–ফ্রেজার এখন কী করবে?
–আমাদের দুজনকে তো রানি ঈশিকার কয়েদঘরে ফিরে যেতেই হবে। যে খবরটা মিন-এর সৈন্যাবাসে পেয়েছি সে খবরটা রানি ঈশিকাকে তো দিতেই হবে। দেখা যাক সেই খবর পেয়ে রানি খুশি হয়ে আমাদের মুক্তি দেয় কিনা।
