–ঠিকই বলেছেন। এমন সব রাজাদের অভাব নেই যারা দাম্ভিক নির্মম স্বার্থান্ধ। প্রজাদের মঙ্গলসাধনের কথা তারা কখনো ভাবেই না। আরবীয় শাসক মিনকে এখনো দেখিনি কিন্তু রানি ঈশিকার পরিচয় পেয়েছি। অত্যন্ত ঘৃণ্য তার মনোভাব। এখানের জাহাজঘাটায় নাকি ক্রীতদাস কেনবেচার হাট বসে। সেসময় তিনি কয়েদঘরে আটক করা বন্দীদের ক্রীতদাসের হাটে বিক্রি করেন। তার বিবেকে বাধে না। ভেন বলল।
–রানি ঈশিকার নির্মমতার অনেক খবরই আমি জানি। কিন্তু তাঁকে সংযত করার উপায় আমি জানি না। অবশ্য উনি আমার মতো বনবাসী এক বৃদ্ধের কথা শুনতে যাবেন কেন। বৃদ্ধ বলল।
উনি বলেন এখন ওর নাকি খুব অর্থাভাব চলছে তাই ক্রীতদাস হিসেবে বন্দীদের বিক্রি করবেন। ফ্লেজার বলল।
–হ্যাঁ। নিষ্ঠুর নির্মম কাজ যারা করেন তারা সবসময়ই যুক্তি দেখান। ইনিও তাই। বৃদ্ধ বলল।
বৃদ্ধ তারপর বলল–তাহলে আরবীয় শাসক মিনের রাজত্বে যাবে?
–হ্যাঁ। বন্ধুদের যদি বন্দীশালায় পাই তাহলে আর কোথাও যাবো না। না পেলে যে করে হোক বন্ধুদের খবর পেতেই হবে। খবর পাবোই। তারপর বন্ধুদের নিয়ে পালাবো। জাহাজঘাটায় যাবো। জাহাজে উঠে দেশের দিকে যাত্রা করবো। ফ্লেজার বলল।
-বেশ! তোমাদের সাফল্য কামনা করছি। যীশু তোমাদের রক্ষা করুন। বৃদ্ধ বলল।
দু’জনে কুঁড়েঘর থেকে বেরিয়ে এলো। চলল মিনের রাজ্যের দিকে। বনের মধ্যে কিছুটা যেতে আকাশে বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল। গাছগাছালির ডালপাতারে ফাঁকের মধ্যে দিয়ে আকাশ যেটুকু দেখল তাতে ফ্লেজার বুঝল ঝড় আসবে।
ফ্লেজার বলল–ভেন–ছোটো। দুজনে গাছ গাছালির ফাঁক দিয়ে ছুটল। সশব্দে বাজ পড়তে লাগল। ঝড়ের হাওয়ায় গাছগুলো মাথা ঝাঁকাতে লাগল। শুকনো ডালপাতা ভেঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। সেই সঙ্গে ধুলোবালি উড়ল। দু’জন চোখ কুঁচকে ছুটলো। একটু পরেই নামল বৃষ্টি। গাছের ডালপাতায় বৃষ্টি পড়ার চট্রচট শব্দ। তার মধ্যে দিয়েই দুজনে ছুটল। কিন্তু জোরে ছুটতে পারছে না। নিচু গাছের বৃষ্টি ভেজা কাণ্ডে পা পিছলে যাচ্ছে।
হাঁপাতে হাঁপতে ফ্লেজার বলল–বুঝলে ভেন ঝড় আমাদের উপকারই করল। ভেনও হাঁপাতে হাঁপাতে বলল
–ও কথা বলছো কেন?
–এই ঝড় জলের মধ্যে শাসকমিনের সৈন্যরা বনভূমি ছেড়ে পালাতে ব্যস্ত থাকবে। আমরাও নির্বিঘ্নে শাসক মিনের রাজত্বে গিয়ে পৌঁছতে পারবো। ফ্লেজার বলল।
–রানি ইশিকার সৈন্যরাও আর এদিকে আসবে না ভেন বলল।
–ঠিক তাই। সুতরাং আমরা নিরাপদ। ফ্লেজার বলল।
–তাই তো মনে হচ্ছে। ভেন বলল।
হঠাই বন শেষ। সামনে বিস্তৃত ঘাসে ঢাকা প্রান্তর।
তখন বেশ রাত হয়েছে। প্রান্তরের পরেই রাজপথ। দুজনে প্রান্তরেনামল। আকাশের মেঘলা ভাবটা তখনও যায়নি। চাঁদ ঢাকা পড়ে গেছে মেঘে।
বেশ অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে দুজনে রাজপথে উঠল। এবর কয়েদঘরটা খুঁজে বের। করা। দুজনে রাজপথ ধরে সমুদ্রের দিকে জাহাজঘাটের দিকে আসতে লাগল। বুড়োটা বলেছিল একটা রুপালি গাছের বাঁ পাশের রাস্তা ধরে গেলে কয়েদখানা পাওয়া যাবে।
তখন হাওয়ার জোর থাকলেও বৃষ্টি কমে গেছে। টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছে।
হঠাৎ অস্পষ্ট জ্যোৎস্নায় ওরা দেখল একদল মিনের সৈন্য পুবমুখো যাচ্ছে। ফ্লেজার দ্রুত ভেন-এর হাত ধরে পথের পাশের মোটা গাছটার পেছনে গিয়ে লুকোল।
অস্পষ্ট জ্যোৎস্নায় ভালো দেখা যাচ্ছে না। ওর মধ্যেই পুবদিকে খুব আবছা তিন চারটে লম্বাটে ঘর দেখা গেল। সৈন্যরা সেই ঘরগুলোর একটাতে ঢুকে গেল।
ফ্লেজার বলল–ভেন–ঐ ঘরে নিশ্চয়ই কিছু হবে। হয় সভাটাভা হবে নয়তো শাসক মিনের কোনো নির্দেশ সৈন্যদের জানানো হবে।
বলো কি! এতো বাঘের গুহায় ঢোকা। ভেন বলল।
–আমরা গুপ্তচর হয়েই এসেছি। কাজেই ভয়ে পিছোনো চলবে না। খবর সংগ্রহ করতেই হবে। চলো। ফ্লেজার বলল।
মাটিতে বুক পা ঘেষে ঘেষে দুজনে চলল সৈন্যাবাসের দিকে। আকাশে চাঁদ ঢাকা মেঘ। খুব অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে চারদিকে। সৈন্যরা যে ঘরটায় আলো জ্বলছিল সেই ঘরটার পেছনে এসে ওরা দাঁড়াল। জানালা মাত্র একটা। তারই নীচে দুজনে বসল। ঘরের ভেতরে সৈন্যরা চুপচাপ।
হঠাৎ সৈন্যরা বোধহয় বেঞ্চি ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। শব্দ হল। বসল। সেনাপতির উঁচু গলা শোনা গেল–যে কারণে তোমাদের ডাকা হয়েছে সেটা বলছি। রানি ঈশিকার? সৈন্যসংখ্যা আমাদের চেয়ে বেশি। তাই তিউনেশিয়া থেকে আরও সৈন্য আনার ব্যবস্থা করেছি। সেই সৈন্যদল এলেই আমরা একটু গুছিয়ে নিয়ে রানি ঈশাকার দেশ আক্রমণ করবো। সেই সৈন্যদল এখানে আশা পর্যন্ত তোমরা খাওদাও বিশ্রাম করো। তারপরেই যুদ্ধ। এবার তোমরা যাও। বিশ্রাম করো গে।
সৈন্যরা উঠে দাঁড়াল। তারপর নিজেদের ঘরে ফিরে গেল। কিছুক্ষণ পরেই সৈন্যদের কথাবার্তা থেমে গেল। সবাই শুয়ে পড়ল, চারিদিক নিস্তব্ধ হল। শুধু গাছের পাতা কাঁপিয়ে হাওয়া চলার শব্দ।
সেই ঘরের পেছন থেকে ওরা আস্তে আস্তে সরে এলো। তারপর প্রান্তরে বুক পেতে শুয়ে পড়ল। বুক হাঁটু ঘষতে ঘষতে চলল রাস্তার দিকে। এভাবে বেশ কিছুদূর এসে দু’জনেই উঠে দাঁড়াল। পোশাকে জলকাদা লেগেছে।
এখন কী করবে? ভেন বলল।
সেই বৃদ্ধের ঘরে আশ্রয় নেওয়া যায়। ভেন বলল।
–ঠিক আছে। তাই চলো। ফ্লেজার বলল।
দুজনে বৃষ্টিভেজা বনভূমি দিয়ে চলল। ফ্লেজার জাহাজ চালনায় দক্ষ। ও ঠিক দিক নির্ণয় করে চলল। বড়ো বড়ো গাছের ডালপাতার ফাঁক দিয়ে যতটা আকাশ দেখা যাচ্ছে তারই ওপর নির্ভর করে আর আশেপাশের গাছপালা দেখে দেখে ফ্লেজাররা চলল।
