–আমি শুনেছি প্রতি সোমবার মন্ত্রণাকক্ষে শাসকওয়াজির্মো আর মন্ত্রী সেনাপতিরা বসে। দু’একজন অমাত্যও থাকেন। আপনাকে শুধু সোমবারের পাহারার কাজ করতে হবে। ফ্লেজার বলল।
–ঠিক আছে–দেখছি। কালকেই তো সোমবার। ইগর বলল।
–আপনি একটু চেষ্টা করলেই এই কাজটা করতে পারবেন। ফ্লেজার বলল। ইগর আস্তে আস্তে চলে গেল।
ফ্লেজার বলে উঠল–এখন যদিফ্রান্সিস থাকতো আমরা কত নিশ্চিন্ত হতে পারতাম।
–ওসব ভেবে কী হবে। দায়িত্ব আমাদের ওপর পড়েছে সেটা পালন করার দায়িত্বও আমাদের। ভেন বলল।
পরের দিনটা শুধু কী হয় কী হয় ভেবেই ফ্লেজারের আর ভেন-এর সময় কাটল।
সন্ধে পর্যন্ত সরাইখানাতেই থাকল। একটু রাত হতেই দুজনে বেরোল। হাঁটতে হাঁটতে রাজবাড়ির সামনে এলো। একটা গাছের নীচে দুজনে দাঁড়াল।
বেশ রাত হল। সেনাপতি মন্ত্রী অমাত্যরা ঘোড়ার গাড়ি চেপে চলে গেল।
এবার ইগর বেরোবে।
দুজনে সদর দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। সাত বাড়তে লাগল।
ইগর আর অন্য প্রহরীরা সাধারণ পোশাকে বেরিয়ে এলো।
-চলো। বলি এবার। ভেন বলল।
–না ভেন। এখন নয়। ওর সহকর্মীদের সামনে কোনো কথা নয়। ফ্লেজার বলল।
দুজনে ইগরদের পেছনে পেছনে চলল।
একজন দুজন করে ইগরের সহকর্মীরা চলে গেল। রইল একজন সহকর্মী।
– এখন কী করবে? ভেন বলল।
–ইগর একা না হওয়া পর্যন্ত আমরা ওর কাছে যাব না। ফ্লেজার বলল।
সরাইখানার কাছাকাছি এসে একজন সহকর্মী চলে গেল। একা ইগরের সঙ্গে কথা বলা যায়। ভেন বলল–এখুনি কথা বলা যায়।
–না ভেন। অধৈর্য হয়ো না। ফ্লেজার বলল।
ইগর সরাইখানায় ঢুকল। মালিক ছুটে এলো। ঘাড় কাত করে বলতে লাগল– আসুন–আসুন। একটু দেরি হল আসতে।
হুঁ। সেই দুজন লোক কোথায়? ইগর বলল।
ওঁরা তো বেরিয়ে গেছেন। মালিক বলল।
বেরিয়ে গেছেন? ইগর কথাটা বলে দরজার দিকে তাকাল। দেখল দুজন দাঁড়িয়ে আছে।
ইগর কোনো কথা না বলে ভেতরে ঢুকল। ফ্লেজারদের বিছানার কাছে এসে দাঁড়াল।
দুজনে এসে ইগরের সামনে দাঁড়াল।
ইগর একবার দুজনের দিকে তাকিয়ে নিয়ে আস্তে আস্তে বলল–শাসক ওয়াজির্মো সেনাপতি মন্ত্রীরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে–সেটা আমি একটা কাগজে লিখে নিয়ে এসেছি। ইগর বুক পকেট থেকে একটা কাগজ বের করল। ফ্লেজারকে দিল।
ফ্লেজার কাগজটা মোমবাতির কাছে নিয়ে গেল। পড়তে লাগল
প্রথমে আমরা রানি ঈশিকার দেশ আক্রমণ করবো। ঈশিকার সৈন্যবল কম। আমরা, অতর্কিত আক্রমণ করবো। রানিকে সৈন্য সাজাবার সময়ই দেব না। কিন্তু আমরা সামনাসামনি অক্রমণ করবো না। চোরাগোপ্তা আক্রমণ করবো। রানির আবাসে গিয়ে রানিকেই বন্দী করবো। তাহলেই সৈন্যদল হতাশ হবে। তখন তাদের বন্দী করা হবে। এই আক্রমণে প্রথমেই সেনাপতি যাবে কিনা সেটা পরে আলোচনা করে স্থির করতে হবে।
ফ্লেজার হাসিমুখে এগিয়ে গিয়ে ইগরকে জড়িয়ে ধরল। বলল–আমরা প্রায় পনেরোজন বন্ধুকে আপনি বাঁচালেন।
-দেখুন গিয়ে রানি ঈশিকা কী বলে দেখুন। ইগর বলল। তারপর চলে গেল।
ফ্লেজার আনন্দে ভেন-এর হাত জড়িয়ে ধরল। বলল–ভেন-অর এক মুহূর্তও নয়। আমরা এক্ষুণি রওনা দেব। থর্ন বোনের মধ্য দিয়ে যাবো। চলো।
অল্পক্ষণের মধ্যে পোশাক কাপড়টাপর সব গুছিয়ে নিয়ে সরাইখানা থেকে বেরোবে বলে দরজার কাছে এলো। সরাইওয়ালা এগিয়ে এলো। দরজার তালা খুলে দিল।
দুজনে বেরিয়ে এলো। ভেন কোমর থেকে একটা ছোটো সোনার চাকতি বের করে সুরাইওয়ালাকে দিল। সরাইওয়ালা খুশির হাসি হাসল।
থর্নবনের মধ্যে দিয়ে দুজন আস্তে আস্তে যেতে লাগল। অনেকটা এসেছে দুজনে।
তখনই গাছপালার ফাঁক দিয়ে ফ্লেজারের নজরে পড়ল একটা ছোটো কুঁড়েঘর। ওরা কুঁড়েঘরটার কাছে এলো। ফালি কাঠের দরজা। দেখল দরজা বন্ধ। ফ্লেজার দরজার কাছে এলো। আঙ্গুল ঠুকে শব্দ করল। দরজা খুলে গেল। দুজনে দেখল–এক পাকা দাড়ি গোঁফওয়ালা বৃদ্ধ।
বেশ শান্ত সৌম্য চোহারা। বৃদ্ধ জিগ্যেস করল–কে তোমরা? কী চাও।
আমরা ভাইকিং বিদেশি। জাহজে চড়ে আমরা এসেছি। কিছু বন্ধু জাহাজ থেকে এখানে এসেছিল। খাদ্য আর জল নিয়ে যেতে। কিন্তু তারা আজও জাহাজে ফেরেনি। এখন কোথায় আছে অথবা অন্য কোথাও চলে গেছে কিনা সেই খোঁজেই আমরা এসেছি।
–তোমরা এখন কোথায় যাবে? বৃদ্ধ জানতে চাইল।
শাসক মিনের রাজ্যে। ফ্লেজার বলল।
–সে তো এই থর্ন বনভূমির মধ্যে ওপাশে কিনারা দিয়ে যেতে পারো তো। বৃদ্ধ বলল।
–না। আমরা বনভূমির মধ্যে দিয়েই যাবো। লুকিয়ে যাবো। ফ্লেজার বলল।
–বেশ যাও। কিন্তু নিশানা হারিও না। যদি নিশানা হারাও তবে এই বনভূমিতেই ঘুরে বেড়াতে হবে। বন থেকে বেরোবার পথ পাবে না। বৃদ্ধটি বলল।
না-না। আমরা নিশানা ঠিক রাখবো। ফ্লেজার বলল।
বৃদ্ধটি বলল–এই দুই রাজ্যের মধ্যে লড়াই আর থামল না। রানি ঈশিকার পিতা যখন রাজা ছিলেন অনেক চেষ্টা করেছিলেন দুই রাজ্যের বিরোধ মিটিয়ে ফেলতে। কিন্তু এই শাসক মিনের পূর্বেকার রাজা রাজি হয়নি। বরং বিনা কারণে লড়াই বাধিয়ে বসল। এরকম লড়াই-এ শুধু সৈন্যদের সাধারণ মানুষদের প্রাণ যায়। এইসব লড়াইয়ের সময় সবচেয়ে বিপদ হয় আমার। দুই রাজ্যেরই সীমা হল এই থর্ন বনভূমি। দুপক্ষের সৈন্যরা বনের মধ্যে ঢোকে। দুই দলে লড়াই চলে এই বনভূমিতে। যে দল জেতে তারা অন্য রাজ্যের মালিকানা পায়। লড়াই থামে। কিন্তু সে আর কতদিন। আবার লড়াই শুরু হয়। রাজ্য ফিরে পাবার লড়াই। এভাবেই এখানকার দুই রাজ্যের মধ্যে লড়াই চলেছে দীর্ঘদিন ধরে। আমি লড়াইয়ের সময় শুধু চেয়ে চেয়ে দেখি আমার কত কষ্টে রোয়া ফুলফলের গাছ সৈন্যদের দাপাদাপিতে গোড়া থেকে উপড়ে যায়। কিছুই বলার নেই। রাজাদের রাজ্য বাড়াবার লিঙ্গ নির্দয় মানসিকতা শুধুমৃত্যুই ডেকে আনে। রাজারা অক্ষত থাকেন। মনে সাধারণ সৈন্যরা। এত হত্যা এত রক্তপাত তবু কারো চৈতন্য হয় না।
