ফ্লেজার প্রায় কিছুই দেখছে না। নানা চিন্তা মাথায়? ফ্রান্সিসরা কোথায়? ওরা লড়াইটড়াইয়ে নেমে পড়েছে কিনা। তবে ভরসা ঐ ফ্রান্সিস। বোকার মতো কোনো কাজ ফ্রান্সিস করবে না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ফ্লেজার। আবার কবে আমাদের সবাইর সঙ্গে সবাইর দেখা হবে। এসব ভাবতে ভাবতে হঠাই মনে পড়ল রাজবাড়িতে শাসক ওয়াজির্মোর স্থাপিত স্কুল, ছেলেদের বাড়ি এসবের কথা।সরাইখানার মালিক যা বলেছিল। তার সঙ্গে শাসক ওয়াজির্মোর কাজের কোনো মিল নেই। সরাইওয়ালা অসৎ। সে মানুষের সগুণ দেখতে পায় না। মানুষের নামে কুৎসা রটাতে সে ভালোবাসে। যাক গে–তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক থাকা খাওয়া। চলে গেলেই তার সঙ্গে সম্পর্ক শেষ।
ফ্লেজাররা সন্ধের কিছু পরেই খেয়ে নিল। নিজেদের জায়গায় শুয়ে বসে অপেক্ষা করতে লাগল।
তখন একটু বেশি রাত হয়েছে। হঠাৎ ফ্লেজাররা শুনল চড়া গলার হাসি। সেইসঙ্গে সরাইওয়ালার বিগলিত সুরে বলা–আসুন–আসুন ইগর।
–খেতে দাও। চড়া গলা ইগরের।
ভেন কাঠের বিছানা থেকে নামল। দোকানঘরের পিছন দিককার দরজার কাছে এলো। দেখল ইগরকে। বেশ স্বাস্থ্যবান লম্বা চওড়া চেহারা। ভেন চলে এলো। বিছানায় বসতে বসতে বলল–প্রহরীর যেমন চেহারা হওয়া উচিত তেমনি চেহারা।
–এখন আমাদের প্রস্তাব শুনে কী বলে দেখি। ফ্লেজার বলল।
ফ্লেজাররা অপেক্ষা করতে লাগল।
ইগরের খাওয়া হল। ইগর বারপাঁচেক মাংস রুটি চাইল। সরাইমালিক ফ্লেজার আর ভেন-এর কাছে এলো। বলল–আপনাদের কথা বলেছি।ইগর আসছে এখানে কথাবার্তা বলবেন।
কিছুপরে ইগর এসে ফ্লেজারদের বিছানার সামনেদাঁড়াল। বেশভারী গলায় বলল– কী ব্যাপার বলুন তো?
একটা বিশেষ জরুরি কথা আছে। আপনি বসুন। ভেন বলল।
বসলে কাঠের পাটাতন ভেঙে যাবে। দাঁড়িয়েই কথা বলবো। ইগর বলল।
–আমি আগেই বলেছি আমার বন্ধুদের বাঁচাবার জন্যেই একটি প্রস্তাব আপনার কাছে রাখবো। ফ্লেজার বলল।
–ঠিক আছে বলুন। ইগর বলল।
ফ্লেজার বলতে লাগল–আমরা ভাইকিং বিদেশি। আমরা একটা জাহাজে চড়ে দেশ দ্বীপ ঘুরে ঘুরে বেড়াই। গুপ্তধনের খবর পেলে আমরা খুঁজে বের করি। যার বা যাদের সেটা প্রাপ্য তাদের নিয়ে আমরা জাহাজ ভাসাই। অন্য দেশে অন্য দ্বীপে যাই।
-বলেন কি! গুপ্তধন আবিষ্কার করেন তার ভাগও নেন না–এ কখনও হয় নাকি। আপনারা তো বোকা। ইগর বলল।
হ্যাঁ লোকে তাই ভাবে। যাকগে–এখানে আমরা জাহাজে চলে এসেছি। অনেকদিন আগে এখানকার এক রাজা ওবিজ্ঞে সাত হাত লম্বা একটা খাঁটি সোনর তরবারি তৈরি করিয়েছিলেন। তিনি মৃত্যুর আগে কাউকে বলে যান নি সেই সোনার তরবারি তিনি কোথায় রেখে গেছেন। ফ্লেজার বলল।
–বলুন। ইগর বলল।
–একটা নকশা আমরা পেয়েছিলাম। হঠাৎই। সেটা দেখে দেখে আমরা গুপ্ত তরবারির হদিশ পাবো বলে আশা করছি। এখন আমার বন্ধুরা রাজা মিনের কয়েদঘরে বন্দী রানি ঈশিকা আমাদের বন্ধুদের কারারুদ্ধ করেছে।
–হু। বলে যান। ইগর বলল।
–এখন রানি ঈশিকা আমাকে আর এই বন্ধুকে একটি শর্তে মুক্তি দিয়েছে। শর্তটি হল–শাসক মিন-এর যুদ্ধ পরিকল্পনার ব্যবস্থা জেনে রানিকে বলতে হবে। অর্থাৎ গুপ্তচরের নীচ কাজ।
-তারপর? ইগর বলল।
–আমরা দুজনে বেরিয়েছিলাম শাসক মিনের দেশে যাবো বলে। কিন্তু আমরা পথ ভুলে এই দেশে চলে এসেছি। ফ্লেজার বলল।
–এখন কী করতে চান? ইগর বলল।
আপনাদের শাসক ওয়াজির্মোর রানি ইশিকার সঙ্গে যুদ্ধের তোড়জোড় শুরু করেছেন। আপনি কি এটা জানেন? ফ্লেজার বলল।
–নিশ্চই জানি। প্রহরী হলেও আমাদের যুদ্ধ করতে হয়। যাকগে–এখন আপনার আমারা সঙ্গে কী কথা বলতে চান? ইগর বলল।
–দুভাবে আপনি আমাদের সাহায্য করতে পারেন। এক–আপনার প্রহরীর পোশাকটা আমাকে ধার দিতে পারেন–একরাতের জন্যে। দুই–আপনি নিজে কাজটা করতে পারেন।
–ঠিক বুঝলাম না। ইগর বলল।
–আপনার পোশাক পরে আমি শাসক ওয়াজির্মোর গোপন আলোচনা শুনতে পারে। অন্যপথ–আপনি নিজে শাসক ওয়াজির্মোর যুদ্ধ পরিকল্পনা শুনতে পাবেন পরে আমাদের সেটা জানাতে পারেন। দুটি দেশের যুদ্ধে পরিকল্পনা জানতে পারলে রানি ঈশিকা খুশি হয়ে আমাদের মুক্তি দেবে। ফ্লেজার বলল।
–সেটা হতে পারে। যাহোক আমার কাছে আপনারা কী চান? ইগর বলল।
–একটু আগেই তো বললাম আপনি আমাদের কীভাবে সাহায্য করতে পারেন। ফ্লেজার বলল।
পোশাক পরে কাজ করার বিপদ অনেক। আমিও জড়িয়ে যাবো। মনে হয় মন্ত্রণাকক্ষের কথাবার্তা সিদ্ধান্ত সবই আমি আড়াল থেকে শুনে জানতে পারি। পরে আপনাদের বলতেও পারি। ইগর বলল।
–দেখুন-গুপ্তচরবৃত্তি অত্যন্ত নিম্নস্তরের কাজ। এটা আমরা জানি। কিন্তু আমি আর আমাদের বন্ধুদের চিরজীবন কাটবে কয়েদঘরে এটা ভাবলে আমি কষ্টে চোখের জল ফেলি। ফ্লেজার বলল।
–হুঁ। ব্যাপারটা খুবই দুঃখের বেদনার। ইগর বলল।
–আরো একটা সম্ভাবনার কথা বলি। রানি ঈশিকা আমাদের বলেছে যে কিছুদিনের মধ্যে ওখানকার সমুদ্রতীরে ক্রীতদাস কেনাবেচার হাট বসবে। আমরা যদি শাসক মিনের যুদ্ধের পরিকল্পনা ঐ হাটবসার আগে রানিকে বলতে না পারি তবে আমাদের ক্রীতদাসের হাটে বিক্রি করে দেবে। শাসক মিন আর রানি ঈশিকার দয়ামায়া বলে কিছু নেই। এই মৃত্যু আর ক্রীতদাস হওয়া থেকে আপনিই আমাদের রক্ষা করতে পারেন। ফ্লেজার বলল।কিন্তু কোনোদিন শাসক ওয়াজির্মো এসব নিয়ে কথা বলবেন তাতো আগে থেকে জানতে পারবো না। ইগর বলল।
