ভেন চলে গেল। রাস্তায় লোকজন বেশি নেই। ভেন হেঁটে চলল। দেখল যত ঘরবাড়ি সব এদিকেই। এখন থেকে সৈন্যাবাস বেশি দূরে নয়।
যেতে যেতে দুএকজনকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিল সরাইখানা কোথায়।
ভেন একটা সরাইখানার সামনে এলো। সরাইখানার মালিককে বলল–আমি আর আমার এক বন্ধু খাবো। কিন্তু বন্ধুটি অসুস্থ। আসতে পারবে না। আমি এখান থেকে নিয়েই যাবো। বন্ধুটির জন্যে খাবার নিয়ে যাবো। দিতে পারবেন?
–কেন নয়। পাতাটাতা দিয়ে বেঁধে দেব। সরাইখানার মালিক বলল।
–তাহলে তো খুব ভালো হয়। ভেন বলল।
ভেন এসে টানা তক্তাটায় বসল। একটু পরেই সরাইখানাওয়ালা কাজের ছেলেটিকে বলল ভেনকে খাবার দেবার জন্যে।
একটু পরেই ছেলেটি কাটা রুটি মাংস সবজি দিয়ে গেল। ভেন বুঝল,বড়ো খিদে পেয়েছে। চেখে খাওয়ার ধৈর্য নেই। হাপুস হুপুস খেতে লাগল।
কিছুক্ষণ খাওয়ার পর ভেন বলল–আপনার দোকানে থাকার ব্যবস্থা আছে তো?
–হ্যাঁ হ্যাঁ। পাতবার তুলোর গদীমতো বালিশ সব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। আপনি থাকবেন? সরাইখানার মালিক বলল।
–সেটা এখনও ঠিক করি নি। রাতে খেতে এসে বলবো। ভেন বলল।
খেতে খেতে ভেন বলল–আচ্ছা–এটা তো আরবী শাসক মিনের রাজ্য?
–না–না। মালিক বলল।
–বলেন কি। ভেন হাঁ করে সরাইওয়ালের দিকে তাকিয়ে রইল।
সারাইওয়ালা বলতে লাগল শাসক মিনের রাজত্ব হল উত্তর দিকে। এখানকার শাসক ওয়াজির্মো। ভেন আর কোনো কথা বলল না। বুঝল–সব কষ্টই বৃথা গেল। আবর যেতে হবে শাসক মিনের রাজত্বে। বোঝা যাচ্ছে থর্ন বনের উত্তর দিকে মিনের রাজত্ব। এটা থর্ন বনের পূর্বদিক। ভেন বলল–রাজা ওয়াজির্মোর রাজবাড়িটা কোথায়?
–কাছেই। এই টিলাটার নীচে। মালিক বলল।
শাসক ওয়াজির্মো কেমল লোক? সরাইওয়ালা ভেনের কাছে এলো। গলা নামিয়ে বলল রাস্তার গুণ্ডা রাজা হয়েছে। কে জানে কত মানুষ হত্যা করে ওয়াজির্মো রাজা হয়েছে। সাধারণ মানুষ শাসক ওয়াজির্মোর ওপর খুব রেগে আছে। কিন্তু কী করবে? ক্ষমতা তো শাসক ওয়াজির্মোর হাতে।
ও
তখনই রাস্তা দিয়ে ওয়াজির্মোর সৈন্যরা কুচকাওয়াজ করে গেল।
–এখানে যুদ্ধের আয়োজন চলছে। ভেন বলল।
-হ্যাঁ। রানি ঈশিকার রাজ্য ওয়াজির্মো দখল করতে যুদ্ধের আয়োজন করছে। মালিক বলল।
–যা দেখলাম–শাসক ওয়াজির্মোর সৈন্যসংখ্যা খুবই কম।
–কিন্তু উপায় নেই। শাসক ওয়াজির্মো প্রত্যেক দিন সকালে বিকেলে সৈন্যদের কুচকাওয়াজ দেখে। প্রজাদের সামনে বক্তৃতা দেয়। প্রজাদের উৎসাহিত করে রানি ঈশিকার বিরুদ্ধেলড়াই করবার জন্যে। মালিক বলল।
-প্রজাসাধারণ কি উৎসাহিত হয়েছে? ভেন বলল।
–না–না। কিন্তু উপায় নেই। সেনাপতিটি রাজ্যের সর্বত্র নজর রাখছে কতকগুলি বিশেষ সৈন্যদের সাহায্যে। যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলে অনেকে মারা গেছে। যেমন রাজা ওয়াজির্মো তেমনি তার সেনাপতি। দুজনের মধ্যে যেন প্রতিযোগিতা চলে কে কত হিংস্র তার প্রমাণ দেওয়ার। কিন্তু শাসক ওয়াজির্মোকে চটাতে কেউ সাহস পায় না। মন্ত্রীও বৃদ্ধ। চুপ করে থাকে। মালিক বলল।
বিকেলে রাজবাড়িটা দেখবো। ভেন বলল।
–দেখলে অবাক হবেন– এই তল্লাটে এত বড়ো প্রাসাদ নেই। এত অর্থব্যয়ে কোনো রাজা বা রানি অট্টালিকা করতে পারে নি। ঐ প্রাসাদের অর্থ আমরাই দিয়েছি। মলিক বলল।
তাহলে আপনাদের খুব সাবধানে চলাফেরা করতে হয়। ভেন বলল।
–সে তো বটেই। মালিক বলল।
ভেন উঠে দাঁড়াল। মালিক পাতায় জড়ানো খাবার ভেনকে দিল।
খাবার নিয়ে ভেন বলল–চলি ভাই। আমি আর আমার বন্ধু সন্ধেবেলা আসবো।
ভেন আস্তে আস্তে হেঁটে সেই গাছটার কাছে এলো। ফ্লেজার গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো। খাবার নিয়ে ঘাসে ঢাকা মাটিতে বসল। খেতে লাগল। ভেন চুপ করে বসে রইল। ক্ষুধার্ত মানুষটা খেয়ে তৃপ্তি হোক। ভেন কোনো কথা বলল না। খেতে খেতে ফ্লেজার বলল-কী খবর এনেছো বলো।
-বলছি তুমি খেয়ে নাও। ভেন বলল।
ফ্লেজারের খাওয়া শেষ হল। ভেন ওর পাশে বসল।
জল তো খাওয়া হল না। ভেন বলল।
পরে খাবো। তুমি কী খবর আনলে বলো।
–ফ্লেজার আমরা ভুল করে অন্য এক দেশে এসেছি। ভেন বলল।
তার মানে? ফ্লেজার ভেন-এর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল।
–আমরা শাসক ওয়াজির্মোর রাজত্বে এসেছি–পথ ভুলে। ভেন বলল।
বলো কি! তাহলে বনভূমিতেই আমরা পথহারিয়েছিলাম। ফ্লেজার বলল।
বনের মধ্যে পথ কোথায়? আমরা দিভ্রান্ত হয়েছিলাম। ভেন বলল।
–তাহলে এখন কী করবো? ফ্লেজার বলল।
এবার ভেন আস্তে আস্তে বেশ কিছুক্ষণ সরাইওয়ালার কাছে যা-যা শুনেছিল সে সব বলল। সব শুনে ফ্লেজার বলল–তাহলে এখানে থেকে কী হবে?
–হবে। আমি সরাইওয়ালাকে বলে খাবার ব্যবস্থা করেছি। সন্ধে হলে সেখানে যাবো। ভেন বলল।
–কিন্তু এখানে থাকতে চাইছেন কেন? ফ্লেজার বলল।
–দেখো ফ্লেজার–আমরা রানিকে বলেছি আমরা গুপ্তচর হয়ে শাসক মিনের রাজ্যে যাবো–যুদ্ধের গোপন খবর নিয়ে আসবো। তার সঙ্গে এই শাসক ওয়াজিমোর যুদ্ধপ্রস্তুতির খবরও নিয়ে গিয়ে জানাবো। আমার মনে হয় রানি এই শাসক ওয়াজির্মো যে তার রাজ্য আক্রমণ করবে এই সংবাদটা জানে না। এখন এইখানে থেকে আমরা যুদ্ধের ব্যাপারে কিছু গোপন খবর সংগ্রহ করবো। তারপর ফিরে গিয়ে রানি ঈশিকাকে জানাবো। দুটো রাজ্যের দুটো সংবাদ রানিকে জানাতে পারলে রানি নিশ্চয়ই খুশি হয়ে আমাদের মুক্তি দেবে। অন্য কোনোভাবে মুক্তি পাবো না। ভেন বলল।
