ফ্লেজার আর ভেন দরজার কাছে এলো। বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল–ভাইসব আমরা আজ সকলেই বিপদগ্রস্ত। হতাশ হয়ো না। মিছিমিছি তোমাদের রক্তপাত মৃত্যু আমি চাই না। আমার ওপরে ভরসা রাখো। সময়মতো সব হবে। সব বিপদ-আপদ কাটিয়ে আমরা দেশের দিকে জাহাজ ভাসাবো। ঈশ্বর আমদের সহায় হোন। ফ্লেজারের কথামতো এক প্রহরী ওদের দুজনের জন্যে দুটো তলোয়ার এনে দিল।
ততক্ষণে এক পাহারদার দরজা খুলে দিয়েছে। ফ্লেজার আর ভেন কয়েদঘর থেকে বেরিয়ে এলো। সামনের ঘাসে ঢাকা প্রান্তর পার হয়ে চলল থর্ন বনভূমির দিকে।
দুজনে থর্ন বনভূমিতে ঢুকল। বেশ ঘন গাছপালা। পথ বলে তো কিছু নেই। গাছগাছালির জটলার মধ্যে দিয়ে ওরা চলল। মাঝে মাঝে বুনো লতায় পা আটকে যাচ্ছে। তলোয়ারের কোপে লতাগাছ কেটে ফেলে দুজনে চলল।
গাছের মোটা গুঁড়ি লতাগাছ এসব নজরে রেখে ওদের যেতে হচ্ছে। বেশ অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে সাবধানে পা রেখে রেখে যেতে হচ্ছে ওদের। বনে লতাগাছে পা জড়িয়ে যেতে পারে। ভীষণ পেছল গাছের গুঁড়িতে পা পিছলে পড়ে যেতে পারে। হঠাৎ সেই বনভূমি অনেক পাতলা হয়ে এলো। ছাড়া ছাড়া গাছপালা। এখানে অন্ধকারও অনেকটা কেটে গেছে। অনেকটা অস্পষ্ট গাছপালা। গাছের মোটা মোটা গুঁড়ি আর দেখা যাচ্ছে না। গাছের গুঁড়িগুলো আর বড়ো নয়। সাধারণ উচ্চতার গাছ সব।
গাছের গুঁড়িগুলো আর বড়ো নয়।
ছাড়া ছাড়া গাছের বনটা পার হতে দুজনে আর দেরি করতে চাইল না। বনের মধ্যে যতটা দ্রুত খাওয়া যায় সেইভাবে চলল। গাছপালার মধ্যে দিয়ে ছোটা সহজ নয়। ওদের দেরি হতে লাগল। ফ্লেজার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছুটতে গেল। ভেন বাধা দিচ্ছিল। বলছিল–ফ্লেজার অত দ্রুত ছুটো না। এতে আমরা পথ ভুলতে পারি। একবার এখানে পথ ভুল হলে আমাদের ভোগান্তির একশেষ হবে। কাজেই দেখে শুনে চলো। দেরি হোক ক্ষতি নেই। লক্ষ্য করতে হবে ঠিক উত্তরমুখো যাচ্ছি কিনা।
–কিন্তু এই ঝোপ জঙ্গলের মধ্যে দিক হারানো অসম্ভব কিছু না।
–ভেন আমি জাহাজ চালাই। দিক ঠিক রাখা আমার পক্ষে সহজসাধ্য। ফ্লেজার বলল।
–সে তোমার সমুদ্রের বুকে। এখানে বন গাছপালা ওপরে ভালো করে আকাশ দেখা যাচ্ছে না। এসব দিকভ্রান্তি ঘটাতে পারে। ভেন বলল।
–হুঁ। সেটা একটা সমস্যা বটে। যাকগে–অনেকটা এলাম কিন্তু এখনও বন শেষ হল না। ফ্লেজার বলল।
–আমাদের দিক ভুল হল না তো? ফ্লেজার বলল।
–কিছুই বুঝতে পারছি না। তবে থর্ন বনটা কি এদিকেও বিস্তৃত? ভেন বলল।
–অসম্ভব নয়। হয়তো আমরা এখনও থর্ন বনের মাঝামাঝি এসেছি। আগে যেতে হবে। ভেন বলল।
দাঁড়াও দাঁড়াও। ফ্লেজার বলল। তারপর দাঁড়িয়ে পড়ল। সামনের দিকে আঙুল তুলল।
দুজনেই দেখল একটা টিলামতো। ওখানেও টিলার চারপাশে গাছগাছালি। বনের মতোই জায়গাটা। ফ্লেজার বলল–ঐ টিলাটার চারপাশেই বন। তবে কি এটাই শাসক মিনের রাজ্য?
–ওখানে পৌঁছে সেটা দেখতে হবে। ভেন বলল।
কিন্তু ওখানে গিয়ে সেটা কীভাবে জানবো?তবে একটা বাঁচোয়া আমাদের পরনে এদেশীয় পোশাক। প্রথমেই আমাদের বিদেশি বলে মনে হবে না। ফ্লেজার বলল।
দুজনেই এবার গতি কমাল। বন শেষ। দুজনেই দাঁড়িয়ে পড়ল। গাছের আড়ালে। সামনেই দেখা গেল একটা মাঠমতো। সেখানে সশস্ত্র সৈন্যরা কুচকাওয়াজ করছে।
–এরাই কি শাসক মিনের সৈন্য? এটাই কি তাহলে শাসক মিনের রাজত্ব?
–ভেন মাথা নাড়তে নাড়তে বললউঁহু শাসক মিনের যোদ্ধারা এত কম হতে পারে না।
কিন্তু শাসক মিনের কত সৈন তা তো আমরা জানি না। তবে মাঠের ডানদিকে দেখা যাচ্ছে দুটো সৈন্যাবাস। সুতরাং ধরেই নিতে হয় শাসক মিনের সৈনসংখ্যা কম। ফ্লেজার বলল।
–এখন কী করবে? ভেন বলল।
–খবর জোগাড় করা কবে নাগাদ শাসক মিন রানি ঈশিকার রাজ্য আক্রমণ করবে। সৈন্যসংখ্যা কত–এসব খবর জোগাড় করতে হবে। ফ্লেজার বলল।
–চলোঐ টিলার নীচে নিম্মই বসতি আছে। ওখানেই শাসক মিনের রাজবাড়িও হয়ত রয়েছে। ভেন বলল।
–এটা ভাবছো কী করে? ভেন বলল।
খুব সহজে। এখানে শুধু সেনাপতি আর যোদ্ধাদের থাকার জায়গা। ফ্লেজার বলল।
–চলো-সব আগে দেখি। ভেন বলল।
দুজনে গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো। গাছ বুনো ঝোঁপের আড়ালে আড়ালে চলল সৈন্যাবাসের বাড়ি ছাড়িয়ে পেছনে টিলাটার দিকে।
দুজনে কিছুটা এগিয়ে দেখল একটা রাস্তামত। সোজা চলে গেছে টিলাটার দিকে।
এবার হল সমস্যা। রাস্তায় নামলেই এখানকার লোকজনেরা ওদের দুজনকে দেখতে পাবে। বলা যায় না কেউ কেউ হয়তো ওদের দুজনকে বিদেশি বলে ধরে নিতে পারবে। সৈন্যদের খবর দেবে। আবার বন্দীদশা।
ফ্লেজার ভাবল এসব সমস্যা তো থাকবেই। এসব ব্যাপার ঘটবেই। সেটা না ঘটিয়ে কী করে খবর সংগ্রহ করা যায় তার চেষ্টা করতে হবে।
এখন এই দিনের বেলা না বেরুনোই ভালো। ভেন বলল।
কিন্তু এখন তো খাবার ব্যবস্থা করতে হয়।না খেয়ে কতক্ষণ থাকা যায়? ফ্লেজার বলল।
–ঠিকআছে–ভেন বলল–আমি খাবার জোগাড়ে যাচ্ছি তুমি এই গাছের আড়াল থেকে বেরিও না।
কিন্তু তুমি আবার বিপদে পড়বে না তো? ফ্লেজার বলল।
–আরে আমার মতো বুড়ো হাবড়াকে কেউ কিছু বলবে না। তোমাদের পক্ষে যাওয়াই বিপদ। তো ফ্লেজার কিছু অর্থ তো দিতে হবে। ফ্লেজার কোমরের ফেট্টি থেকে একটা স্বর্ণমুদ্রা বের করল। বলল-এটা দেবেআর বলবে যে আমরা কয়েকদিন এখানে খাবো। প্রয়োজনে থাকবোও।
