–বলুন। রানি বলল।
ফ্লেজারকে দেখিয়ে বলল–এরা জাহাজে চড়ে আপনার রাজত্ব এসেছে। এরা জাতিতে ভাইকিং। বিদেশি। ওদের থর্ন বনভূমিতে ধরা হয়েছে। ওরা বলছে বন্ধুদের খুঁজতে এখানে এসেছে। কিন্তু আমার মনে হয় এরা শাসক মিনের গুপ্তচর। আমাদের যুদ্ধ প্রস্তুতির খবরাখবর নিতে এসেছে। এখন আপনার বিচার।
রানি ফ্লেজার আর ভেন-এর দিকে তাকাল। বলল
–তোমরা জাহাজে চড়ে দেশে দেশে দ্বীপেদ্বীপে ঘুরে বেড়াই। এ ছাড়া যদি কোথাও গুপ্ত ধনভাণ্ডারের বা খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছুর সন্ধান পাই তাহলে বুদ্ধি খাঁটিয়ে সেইসব আমরা উদ্ধার করি। এর বদলে আমরা একটা স্বর্ণমুদ্রাও নিই না।
বলো কি। অবশ্য তোমরা চুরি করলে কে আর ধরতে যাচ্ছে।
–আমরা চোর নই। ফ্লেজার বলল।
–তাহলে জলদস্যু। রানি বলল।
না–আমরা তাও নই। আপনাদের সন্দেহ হলে আমাদের জাহাজে তল্লাসী করুন। শুধু খাদ্যসংগ্রহের জন্যে আমরা কিছু স্বর্ণমুদ্রা রেখেছি। বাঁচতে তো হবে। ফ্লেজার বলল।
–কিন্তু সেনাপতি যে বললেন তোমরা শাসক মিনের গুপ্তচর–তার কী হবে? রানি বলল।
-মিছে বদনাম দেওয়া হচ্ছে। আমরা গুপ্তচরগিরি করতে যাব কেন? এই দেশ এখানকার জনসাধারণ তাদের সঙ্গে আমাদের কী সম্পর্ক। আজ এখানে আছি। কাল জাহাজ চালিয়ে চলে যাবো অন্য দেশে। রুপনি বা শাসক মিনের সঙ্গে আমাদের স্বার্থ জড়িত নয় তবে কেন আমরা গুপ্তচরবৃত্তি করতে যাবো। ফ্লেজার বলল।
যাক গে–তোমরা কতজন বন্দী হয়ে আছো? রানি বলল।
–সাতজন। ফ্লেজার বলল।
–সবাই কি তোমার বয়সী। রানি বলল।
–হ্যাঁ, শুধু এই ভেনআমাদের বৈদ্য–এর বয়স বেশি। আর কী জানতে চান। বলুন? ফ্লেজার বলল।
দাঁড়াও দাঁড়াও–রানি বলল। শোনো আমার এখন খুব অর্থাভাব চলছে। মাথায় লড়াইয়ের চিন্তা তরা জন্যেও আমার খরচ টানতে হচ্ছে। পেরে উঠছি না। সেইজন্যেই ভেবেছি কিছুদিনের মধ্যেই সমুদ্রতীরে ক্রীতদাস বেচাকেনার হাট বসবে। তোমাদের মতো জোয়ানদের বিক্রী করতে পারলে ভালো দাম পাবো। আমার অর্থাভাব মিটবে।
ফ্লেজার চমকে উঠল। এই কথাটা ও একবারও ভাবে নি।ও ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ল। ও জানে, বলে লাভ নেই। রানি এখন অর্থ কিভাবে পাওয়া যাবে সেই চিন্তায় বিভোর। তবু ফ্লেজার বলল–দেখুন–শাসক মিন আর আপনাদের সম্পর্ক খুব খারাপ। কিছুদিনের মধ্যেই লড়াই হবে। এদিকে ক্রীতদাসের হাট বসবে সমুদ্রতীরে। হয় আপনার রাজত্বে নয় তো মিনের রাজত্বে। কিন্তু আপনারা তো পরস্পরের শত্রু। ক্রীতদাসের হাঁটে অন্যদের নিয়ে যাবেন কী করে?
এতক্ষণে রানি হাসল। বলল-ক্রীতদাসের হাট মাত্র তিনদিন চলে। সে সময় আমরা আমাদের বিবাদ ভুলে থাকি। আমরা আর ধারেকাছের দেশগুলো থেকেও রাজারা হাটে আসে। ক্রীতদাস কেনা বেচা চলে। একটা দিন কারোর সঙ্গে কারোর শত্রুতা করতে নেই।
–বাঃ–ফ্রেজার হেসে বলে উঠল–তিনদিনের জন্যে আপনারা শত্রুতা ভুলে যান। বরাবরের জন্যে শক্রতা ভুলতে পারেন না কেন?
সেটা সম্ভব নয়। আমাদের মধ্যে লড়াই লাগবেই। মিনও যুদ্ধ চায়, আমিও যুদ্ধচাই। রানি বলল।
–আমাদের মুক্তি দিলে আপনাকে আমরা অর্থ দেব। ফ্লেজার বলল।
রানি হেসে উঠলেন–তোমরা তো গরিব ভিখিরি। তোমরা অর্থ দেবে কোত্থেকে।
–আমাদের একবার চেষ্টা করতে দিন। ফ্লেজার বলল।
–না–না। তোমাদের মুক্তি দিলে আমার সব পরিকল্পনাই মার খাবে। আমার অর্থ সমস্যাও মিটবে না। আসলে ক্রীতদাসের হাট যখন বসে আমরা কয়েকঘরে আটক থাকা সব বন্দীকেই ক্রীতদাসের হাটে বিক্রি করে দিই। এই নিয়ম বাবর চলে আসছে। রানি বলল।
–এই নিয়মটা ভালো কি মন্দ–তা বোধহয় কোনোদিন ভেবে দেখেন নি। ভেন বলল।
না না–এতে ভাববার কী আছে। নিয়মটা চলে আসছে–চলে আসছে। রানি বলল।
–আপনি একজন নারী। নারী হয়ে এরকম একটা অমানুষিক কাজ করেন কী করে। আপনার কি বিবেক বলে কিছু নেই। ভেন বলল।
রানি ঈশিকা জোরে হেসে উঠল। বলল– ক্রীতদাস না থাকলে কি চলে। চাষাবাদ বাগান করা সেসবের দেখাশুনোক্রীতদাসের। এতসব কাজ ক্রীতদাসরা ছাড়া কারা করবে।
–তাহলে আপনি স্থির করে ফেলেছেন –আমাদের ক্রীতদাসের হাটে বিক্রী করবেন। ফ্লেজার বলল।
–হ্যাঁ। কাজেই তোমাদের মুক্তি নেই। রানি বলল।
–বেশ। ফ্লেজার বলল। সেনাপতির পেছনে পেছনে ফ্লেজাররা দরবার কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসছে তখনই একজন সৈন্য এসে সেনাপতিকে কী বলল। সেনাপতি ফ্লেজারদের দিকে তাকিয়ে বলল-রানি তোমাদের ডেকেছেন। দরবারে চলো।
ভেন ও ফ্লেজাররা আবার দরবারে কক্ষে ফিরে এল। রানির সামনে এসে দাঁড়াতে রানি বলল–তোমাদের নাম কী?
–আমি ফ্লেজার, আমার সঙ্গী ভেন। ফ্লেজার বলল। রানি বলল–তোমাদের মুক্তির উপায় আছে। ফ্লেজার কথাটার অর্থ ঠিক বুঝতে পারল না।
–শোনোতোমরা যদি শাসক মিনের রাজত্বে গিয়ে ওদের যুদ্ধের পরিকল্পনা কী সেটা জেনে আসতে পারো তাহলে তোমাদের মুক্তি দেওয়া হবে। ফ্লেজার চুপ করে রইল। দ্রুত ভাবতে লাগল–কী করবো? গুপ্তচরবৃত্তি অত্যন্ত গর্হিত কাজ নিচু কাজ। এটা করা যাবে না।
কী হল? রানি বলল।
–একটু ভাবতে সময় দিন। ফ্লেজার বলল।
—বেশ ভাবো। রানি বলল।
ফ্লেজার কিছুক্ষণ ভাবল। ভেবে দেখল–শাসক মিনের রাজত্বে আমাদের যেতেই হবে। ফ্রান্সিসরা নিশ্চয়ই ওখানে বন্দী হয়ে আছে। বন্দী না হলেও ওরা কোথায় কিভাবে আছে সেটা জানা যাবে। সেটা জানালেই পরে কী করবো তা স্থির করা যাবো। কিন্তু কয়েদঘরে পড়ে থাকলে কিছুই জানা যাবে না। ক্রীতদাসের হাটে বিক্রি হয়ে যেতে হবে।
