সবাই দাঁড়িয়ে পড়ল।
সর্দার একটা ঘরের দরজার কাছে গেল। বাড়িটার সদর দরজা একটু দূরে। সদর দরজার দুপাশে পরপর ঘর। সর্দার দরজার কাছে গিয়ে কী বলল। দুজন পাহারাদারের একজন কোমর থেকে চাবির গোছ বের করল। একটা বড়ো ঘরের দরজার তালা খুলল।শক্ত কাঠের দরজাটা খুলে ধরল। সর্দার ফ্লেজারদের তাকিয়ে বলল–সবাই এই ঘরে ঢোকো। ফ্লেজাররা একে একে ঘরে ঢুকল। ঘরটা বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। পাথুরে দেয়ালের মধ্যে গর্ত। তাতে দুপাশে দুটো মশাল জ্বলছে। মেঝেয় শুকনো ঘাসের বিছানা। দড়ি দিয়ে বিছানাটা শক্ত করে বাঁধা। তার ওপর একটা মোটা কাপড় পাতা।
সদার বলল–এই বাড়িটা হচ্ছে রানি ঈশিকার প্রাসাদের লাগোয়া কয়েদঘর। আরামেই থাকবে। সর্দার হো হো করে হেসে উঠল। ফ্লেজার হাসির মানেটা ঠিক বুঝল না।
ঘরে ঢুকে ভাইকিংরা কেউ কেউ শুয়ে পড়ল কেউ কেউ বসল। শুধু ফ্লেজার বসল না। ঘরটার পায়চারি করতে লাগল।
কিছু পরে ফ্লেজার ভেনের দিকে তাকিয়ে বলল–ভেন এখন কী করবো বলো।
–কিছু তো করার দেখছিনা। বন্দীদশা মেনে নিতেই হবে। তাছাড়া আমরা নিরস্ত্র। আমাদের তলোয়ার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। লড়াই করার প্রশ্নই নেই। ভেন বলল।
–এখন রানি ঈশিকা কী বলে সেটাই শোনার। কালকে আমাদের রানির দরবারে নিয়ে যাবে মনে হয়। রানির কথা থেকেই বুঝতে পারবো আমাদের মুক্তির ব্যাপারে সে কী ভাবছে। ফ্লেজার বলল।
তাহলে রানি যদি বলে আমাদের বন্দী হয়েই থাকতে হবে? পেড্রো বলল।
–তাহলে বন্দীই থাকতে হবে। ফ্লেজার বলল।
–একটা কথা ভাববার–ভেন বলল–আমাদের বন্দী করে রেখে রানির কী লাভ?
–রানির কথা থেকেই সেটা বোঝা যাবে। ফ্লেজার বলল। তারপর বিছানায় বসল।
বাইরে প্রাসাদ সংলগ্ন বাগান থেকে পাখির ডাক কিচিরমিচির ভেসে এলো। ভাইকিংদের কারো কারো ঘুম ভেঙ্গে গেল। ফ্লেজারের ঘুম ভেঙ্গে গেছে আগেই। চোখ ঝুঁজে সমস্যার কথাটাই ভাবছে। ফ্রান্সিস নেই হ্যারি নেই শাঙ্কো বিস্কো কেউ নেই। অন্তত ফ্রান্সিস থাকলে সমস্যার সমাধান ভাবতে পারতো। আজকে ওরা একেবারে অসহায়। না, ফ্লেজার মাথায় ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে বসল। ফ্রান্সিসরা বেঁচে থাকলে কোথায় আছে অথবা ওদের হত্যা করা হয়েছে কিনা এসব জানতে পারলেও মনে জোর পাওয়া যেতো। কিন্তু ফ্রান্সিসদের সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। একেবারে অন্ধকার। ফ্লেজার এসব সাত-পাঁচ ভাবতে লাগল।
শব্দ করে কাঠের বড়ো দরজাটা খুলে গেল। প্রহরীরা সকলের খাবার নিয়ে ঢুকল।
ফ্লেজার খুব মনোযোগ দিয়ে প্রহরীরা কিভাবে খাবার দিচ্ছে অন্য অন্য প্রহরীরা তখন কী করছে দেখতে লাগল। দেখল প্রহরীরা যখন খাবার দিচ্ছে অপেক্ষা করছে ওদের খাওয়া হয়ে যাওয়া পর্যন্ত, প্রহরী দুজন চুপ করে ঘরের কোণায় দাঁড়িয়ে ফ্লেজারদের খাওয়া দেখছে। বাইরের চারজন প্রহরী দরজা থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে গল্পগুজব করছে। ফ্লেজারদের দিকে নজর নেই। ফ্লেজার সমস্ত ব্যাপারটা দেখতে লাগল খেতে খেতে ভাবতেও লাগল–কিভাবে কখন পালাতে হবে। ভেবে দেখল খাওয়ার সময়ই পালাতে হবে। এবার কী ভাবে পালাবে সেটা ভাবতে লাগল।
ফ্লেজারদের খাওয়া হয়ে গেল। প্রহরীরা গামলা কাঠের বড়ো রেকাবি কাঠের বড়ো হাতা এসব জিনিস নিয়ে চলে গেল। দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
একটু বেলা হল। কয়েদঘরের দরজা খুলে গেল। সেনাপতি ঢুকল। মাথায় উষ্ণীব। গলা পর্যন্ত জুলপি। ইয়া বড়ো গোঁফ। বুকে বর্ম।
ঘরে ঢুকেই বাজখাঁই গলায় বলে উঠল–এখানে ভাইকিং দেশের লোক কারা?
–আমরা। ফ্লেজার উঠে দাঁড়াল। সঙ্গে ভাইকিং বন্ধুরাও উঠে দাঁড়াল।
–বাঃ তোমরা তো বেশ তাগড়াই জোয়ান। রানি ঈশিকা এরকম জোয়ানই তো চান। সেনাপতি বলল।
–আমাদের মতো জোয়ান চান কেন? ভেন বলল।
–আছে–আছে কারণ আছে। পরে বুঝবে। যাক গে– তোমরা দু’তিনজন বাইরে এসো। রানি ঈশিকার দরবারে যেতে হবে। সর্দার বলল।
-কেন যেতে হবে? ফ্লেজার বলল।
–তোমাদের বিচার হবে। সেনাপতি হা হা করে হেসে উঠল।
-ঠিক আছে। চলুন। ফ্লেজার বলল। তারপর ভেনকে ডেকে বলল–চলো তুমি আর আমি যাবো।
সেনাপতি কয়েদঘর থেকে বেরিয়ে বাইরের মাঠে এল। পেছনে ফ্লেজার আর ভেন। চলল দুজনে। প্রাসাদের শেষের দিকে রানি ঈশিকার দরবার কক্ষ। সেনাপতি ফ্রেজারদের সেই ঘরে ঢুকতে ইঙ্গিত করল। ফ্লেজার আর ভেন সেই ঘরে ঢুকল। দুইদিকে কয়েকটা জানালা থাকা সত্ত্বেও ঘরের ভেতরের অন্ধকার ভাবটা সম্পূর্ণ কাটে নি।
ফ্লেজার দেখল রানি ঈশিকা একটা পাথরের সিংহাসনে বসে আছে। আসলে গভীর নীল রঙের গদি আঁটা। ডানদিকে মন্ত্রী বসে আছে। রানির বয়েস হয়েছে। মুখে বলি রেখা। একটা বড়ো মুক্তো বসানো মুকুট মাথায়। মুকুটে মণিমাণিক্য বসানো। মীনে করা। ঢোলা হাতা পোশাক সোনারুপোর কাজ করা। হাতে একটা দণ্ড। তাতেও মণি মাণিক্যের কাজ।
ফ্লেজাররা যখন পৌঁছল তখন রানির দরবারে একটা বিচার চলছিল। রানি একটু মাথা নুইয়ে অভিযোগকারী ও অভিযুক্তের বক্তব্য গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনল। সব শুনে রায়দান করল। অভিযোগকারী মাথা নুইয়ে রানিকে সম্মান জানিয়ে চলে গেল। অভিযুক্তের দুহাত ধরে দুজন সৈন্য নিয়ে গেল।
এবার সেনাপতি রানির সিংহাসনের দিকে এগিয়ে গেল। মাথা একটু নুইয়ে সম্মান জানিয়ে বলল–মাননীয় রানি–আমার একটা অভিযোগ ছিল।
