ফ্লেজার জাহাজঘাটের দিকে তাকাল। জাহাজঘাটা বেশ দূরে। ওদের যেতে হবে জাহাজঘাটার কাছে। দেখা যাচ্ছে ওদিকেই জনবসতি। এখানে দেখা যাচ্ছে বালিমাটি ঢাকা ঘাসের প্রান্তর। বেশ দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রান্তরে ফুটফুটে জোছনা। ফ্লেজার প্রান্তরের ওপর দিয়ে জনবসতি এলাকার দিকে চলল, পেছনে ভাইকিং বন্ধুরা। কেউ কোনো কথা বলছে না। যতটা সম্ভব নিঃশব্দে চলেছে সবাই।
বসতি এলকায় এলো ওরা। একটা পাথরের দেওয়ালওলা বাড়ির পেছনে এলো সবাই। ফ্লেজার বলল, এই বাড়ির পেছনে তোমরা অপেক্ষা করো। আমি খোঁজখবর নিয়ে আসছি।
সবাই সেখানে দাঁড়িয়ে পড়ল। ফ্লেজার সেই বাড়িটার সামনে এলো। দু’দিকে তাকিয়ে বুঝল, এটা সদর রাস্তা। জাহাজঘাটা থেকে এসে দূরে চলে গেছে।
ফ্লেজার বাড়িটার বারান্দায় উঠে দরজার কাছে এলো। দেখল দরজাটা হাঁ করে খোলা। ফ্লেজার বুঝল বাড়িটা পোড়ো বাড়ি। তবু দরজাটায় বার দুয়েক শব্দ করল। কারও সাড়াশব্দ নেই।
ফ্লেজার রাস্তায় নামল। জোছনায় যতদূর দেখা যাচ্ছে লোকজন নেই। ফ্লেজার আর একটা বাড়ির সামনে এলো। বারান্দা পার হয়ে দরজার সামনে এলো। দরজায় হাত দিয়ে শব্দ করল। কোনও সাড়াশব্দ নেই। আবার ধাক্কা দিল। ভেতর থেকে বুড়ির গলায় শোনা গেল, কে?
কথাটা আরবি ভাষায় বলা। ফ্লেজার আন্দাজে বুঝল। গলা নামিয়ে বলল, একটু আসুন। কথা আছে?
একটু পরে দরজাটা খুলে গেল। একজন বয়স্কা মহিলা এসে দাঁড়াল। ফ্লেজার বলল, আপনি স্পেনীয় ভাষা বোঝেন?
মহিলাটি মাথা কাত করে বললেন, অল্প, অল্প।
ফ্লেজার বলল, তাতেই হবে। থেমে বলল, এখানে কয়েদঘরটা কোথায়?
মহিলাটি হাত তুলে কিছুদূরে একটা ঝুপসি পাতার গাছ দেখিয়ে বললেন, ওই গাছ বাঁ দিকে একটু দূর কয়েদখানা। মহিলাটা দরজা বন্ধ করে দিলেন।
ফ্লেজার বন্ধুদের কাছে ফিরে এলো। বন্ধুদের বলল, বন্ধুদের বলল, কয়েদঘর কোথায় জেনেছি। আগে দেখতে হবে ফ্রান্সিসরা কয়েদখানায় বন্দি হয়ে আছে কিনা। যদি না থাকে তা হলে অন্য জায়গাগুলো দেখতে হবে।
বৃদ্ধ হদিশ বলে ঘরে ঢুকে গেল। ফ্লেজাররাও ঘুরে দাঁড়াল কয়েদঘরের দিকে যাবে বলে। হঠাৎ বৃদ্ধর বাড়ির দরজাটা কাঁচকোঁচ শব্দ তুলে খুলে গেল। আট-দশজন সশসস্ত্র সৈন্য বেরিয়ে এলো। বারান্দা থেকে লাফিয়ে রাস্তায় নামল। ফ্লেজারদের ঘিরে দাঁড়াল। ফ্লেজার অবাক। সৈন্যদের হাতে খোলা তলোয়ার। ফ্লেজার একবার পেছন ফিরে তাকাল। বন্ধুরাও অবাক। ফ্লেজার কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। আত্মরক্ষার জন্যে ফ্লেজার তরবারি কোষমুক্ত করল। বন্ধুরাও তরবারি খুলল। ভেন দুহাত তুলে বলে উঠল। ফ্লেজার ওর সংখ্যায় বেশি। লড়াইয়ে নামলে আমরা কেউ বাঁচতে পারবো না। মাথা ঠাণ্ডা করো। ওরা কী বলে শোনা যাক। ভেন-এর কথামতো বন্ধুরা তলোয়ার কোষবদ্ধ করল। এখন শুধু অপেক্ষা করা। সৈন্যরা ওদের নিয়ে কী করবে তাই দেখো।
সশস্ত্র সৈন্যদের দল থেকে একজন এগিয়ে এলো। তার মুখে চাপ দাড়ি গোঁফ। আদেশের স্বরে বলল-তলোয়ার ফেলে দাও। ফ্লেজাররা তলোয়ার খুলে রাস্তায় ফেলল। খোলা তলোয়ারের ডগাটা ভেন-এর বুকে ঠেকিয়ে দাড়ি গোঁফ বলল–এ্যাই বুড়ো তোরা কোত্থেকে এসেছিস্?
–আমরা ভাইকিংদের দেশ থেকে এসেছি। আমরা ভাইকিং। দেশ দ্বীপ ঘুরে বেড়াই। কোনো গুপ্তধনের সংবাদ পেলে সেই গুপ্তধন বুদ্ধি খাঁটিয়ে উদ্ধার করি।
তারপর সেই উদ্ধার করা গুপ্তধন নিয়ে পালিয়ে যা। সৈন্যটি বলল।
ভেন বলল-এই অভিযোগ অন্যায়। উদ্ধার করা গুপ্তধন সেই সেই দেশের রাজার হাতে তুলে দিয়েছি আমরা। একটা স্বর্ণমুদ্রাও আমরা নিই না।
রনি তুহিনার গুপ্তধন আছে এখানে। খুঁজবি নাকি? দাড়ি গোঁফওলা বলল।
এবার ফ্লেজার বলল–আমাদের দলনেতা কিছুদিন এখানকার শাসক মিনের কারাগারে হয়তো বন্দী। তাদের মুক্তি করতে পারলে এবং শাসক মিন যদি বলে তবে আমরা খুঁজবো।
–শাসক মিন কী করবে জানি না। আমরা কিন্তু মিনের সৈন্য নই। আমরা রানি ঈশিকার সৈন্য। মিনের সঙ্গে আমাদের শত্রুতা। লড়াই হবে দিন আট-দশ পরে। আমরা জাতিতে বাবার। শাসক মিন আরবীয়। লড়াই হবেই। যাক গেবনের বাইরে বেশিক্ষণ থাকা চলবে না। একটু গলা চড়িয়ে বলল–মিনের সৈন্যরা যেকোন মুহূর্তে চলে আসতে পারে। সবাই বনে ঢুকে পড়। তার আগে এই বিদেশি ভূতদের অস্ত্র কেড়ে নাও। দু’জন সৈন্য এসে ফ্লেজারদের পথের ওপর ফেলে দেওয়া তলোয়ারগুলি তুলে নিল।
ফ্রেজারদের নিয়ে দাড়ি গোঁফওয়ালা সর্দার বনের মধ্যে ঢুকে গেল। তারপর ফ্লেজারদের নিয়ে চলল।খুব একটা গভীর বন নয়। চাঁদের ভাঙ্গা আলো এখানে ওখানে পড়েছে।পথ বলে কিছু নেই। শুকনো ভাঙ্গা ডাল পাতায় শব্দ তুলে ফ্লেজাররা চলল।
বেশ কিছু পরে বনভূমি শেষ হল। ফ্লেজাররা দেখল একটা সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠ মতো। তারপরেই পাথরের বাড়িঘরদোর। ফ্লেজাররা মাঠ পার হয়ে বাড়ি ঘরের কাছে এলো। একটা পাথর বাঁধানো রাস্তায় এসে উঠলো। বাড়িঘরে আলো জ্বলছে না। নিস্তব্ধ চারদিক। পথ জনশূন্য। রাস্তা দিয়ে কিছুটা যেতেই একটা পাথরের লম্বাটে বাড়ি পড়ল। বাড়িটা অন্য সব বাড়ি থেকে অনেক বড়ো। বাড়িটার সামনে আসতে দাড়ি গোঁফওয়ালা সর্দার ডান হাতটা উঁচু করে বলল–থামো।
