মিন চলে গেল। ফ্রান্সিস মাথা নিচু করে চুপ করে বসে রইল। মারিয়া এসে ওর পাশে বসল। ফ্রান্সিসের কাঁধে হাত রাখল। মৃদুস্বরে বলল-তুমি আমার ওপর রাগ করেছো–তাই না। ফ্রান্সিস হেসে মুখ তুলল। বলল–পাগল–আমি তোমার ওপর রাগ করতে পারি? আমি তোমার শরীরের কথা ভেবেই এই প্রস্তাব করেছিলাম।
একটু চুপ করে থেকে ফ্রান্সিস বলল–এখন মহা সমস্যায় পড়লাম। এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে পালাবার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু কী করে পালাতে পারবো বুঝতে পারছি না। ততদিনে তুমি যদি অসুস্থ হয়ে পড়ো তাহলে বিপদ বাড়বে। তুই তোমাকে জাহাজে রাখার ব্যবস্থা করতে চাইছিলাম। আর একটা উদ্দেশ্যে ছিল তুমি জাহাজে গিয়ে থাকলে আমরা সহজেই পালাতে পারবো।–তাহলে মিনকে বলো– আমি আমাদের জাহাজে থাকতে রাজি হয়েছি। না–এই জঘন্য চরিত্রের নরপশুটাকে আর অনুরোধ করবো না। শুধু তুমি সুস্থ থাকলেই আমি পালাবার পরিকল্পনা বেশ চিন্তা করে করতে পারবো। ফ্রান্সিস বলল।
–তাই করো। মারিয়া বলল।
ওদিকে জাহাজের বন্ধুরা অস্থির হয়ে উঠেছে। কী করবে ওরা বুঝে উঠতে পারছে না। ফ্রান্সিস, হ্যারি, শাঙ্কো, বিস্কো কেউ নেই। এই অবস্থায় ফ্লেজার এগিয়ে এলো। পেড্রোকে বলল, যাও সকলকে ডেক-উঠে আসতে বলল। পেড্রোনীচে নেমে সবাইকে খবরটা দিল।
তখন একটু রাত হয়েছে সবাই এসে ডেকে জড়ো হল। ফ্লেজার সকলকে সম্বোধন করে বলল, ভাইসব আমাদের আজ দিশেহারা অবস্থা। বুঝে উঠতে পারছি না এখন আমরা কী করব! প্রথমে গেল ফ্রান্সিস। পরে বিস্কোরা। সাতদিন হতে চলল ওরা কেউ ফিরে এলো না। আমাদের কোনও খবরও পাঠাতে পারল না। এখন এই একটা সম্ভাবনার কথাই মনে আসছে। সেটা হল, তারা সবাই বন্দী হয়েছে। এটা কী দেশ বা দ্বীপ আমরা জানি না। এখানে কারা থাকে, তাদের রাজাই বা কে আমরা কিছুই জানি না। একটু থেমে ফ্লেজার বলতে লাগল, বলতে আমার মন ভেঙ্গে যাচ্ছে তবু বলি, তবে কি ফ্রান্সিসরা কেউ জীবিত নেই?
ভাইকিং বন্ধুদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হল। একজন ভাইকিং বলল, ফ্লেজার, এতটা আশঙ্কা করো না। ওরা নিশ্চয়ই বেঁচে আছে। হয়তো মুক্তো নয়-বন্দী।
বয়স্ক বৈদ্য ভেন বলল, আমরা এখনও বিনা কারণে কোনও লড়াইয়ে জড়িয়ে যাইনি। আজকে আমাদের লড়াইয়ে নামতে হবেই, যদিও জানি ফ্রান্সিসরা বন্দী হয়ে আছে।
এবার ফ্লেজার বলল, ভাইসব, আমাদের সামনে আজ দুটো কাজ আছে। এক, ফ্রান্সিসদের ফেরার আশা নেই দেখে আমরা জাহাজ চালিয়ে চলে যেতে পারি। দুই, তীরে নেমে ফ্রান্সিসদের খোঁজ করতে পারি। বলোতোমরা কী চাও?
সবাই প্রায় একসঙ্গে বলে উঠল, আমরা এখান থেকে নড়ব না। ভেন বলল– আমরা তীরে নামব। ফ্রান্সিসদের খোঁজ করব। খোঁজ করতে গিয়ে যদিলড়াইতে নামতে হয় আমরা লড়াইয়ে নামব।
ফ্লেজার বলল, আমিও ঠিক এটাই চাইছিলাম। আমরা যে ফ্রান্সিসদের পরম বন্ধু, এটা প্রমাণ করবার সময় এসেছে।
একজন ভাইকিং বলল একটা জিনিস আমরা দেখেছি যে, এই অঞ্চলের সৈন্যরা সুশিক্ষিত আর শিরস্ত্রাণে, বর্মে সশস্ত্র। এরকম সৈন্যদের সঙ্গে যদি আমাদের লড়তে হয় আমরা কি লড়তে পারব?
ফ্লেজার বলল, কথাটা ঠিক। তবে আমরা লড়ব বন্ধুদের বাঁচাবার জন্যে এখানেই আমরা মনের জোর বেশি পাব। দেখা যাক, যদি ওরকম এক অসম লড়াইয়ে লড়তে হয় লড়ব। একটু থেমে ফ্লেজার বলল, সবাই তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়া খেয়ে নাও।
রাত একটু গম্ভীর হলে আমরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তীরে নামব। ফ্রান্সিসদের মুক্ত করার জন্যে যা করার করব। সভা ভেঙ্গে গেল। কেউ কেউ কেবিনঘরে চলে গেল, কেউ কেউ ডেক-এ বসল। দু-চারজন ডেক-এ শুয়ে পড়ল।
রাতের খাওয়াদাওয়ার পর সকলেই তলোয়ার নিয়ে তৈরি হল। ডেক-এ উঠে এলো। ফ্লেজারও এলো। পেড্রোকে ডেকে বলল, সমুদ্রতীরে যাও। নৌকো দুটো নিয়ে এসো। পেড্রো রেলিং টপকে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারপর সাঁতার কেটে চলল তীরের দিকে।
আকাশে চাঁদ। চাঁদের আলো পড়েছে সমুদ্রের জলে, ঢেউয়ের মাথায়। চিকচিক করছে। কোথাও সাদাটে কুয়াশার জটলা। তার মধ্যে দিয়েই পেড্রো সাঁতরে চলল। জাহাজঘাটা অনেক দূরে। ওখান থেকে কারও নজরে পড়ার সম্ভাবনা নেই।
পেড্রো তীরের কাছে এলো। দেখল, ওদের দুটো নৌকোই তীরে ঠেলে তোলা আছে। পেড্রো তীরে উঠল। একটা নৌকোর দড়ি দিয়ে অন্য নৌকোটার সঙ্গে বাঁধল। তারপর ঠেলে দুটো নৌকো জলে নামলো। একটা নৌকোয় উঠল। দাঁড় নৌকোটার গলুইয়ে রাখা ছিল। দাঁড়টা তুলে নিল। দাঁড় বাইতে লাগল। দুটো নৌকোই চলল ভাইকিংদের জাহাজের দিকে। কুয়াশার মধ্যে দিয়ে নৌকো দুটো জোরেই চলল।
দাঁড় বেয়ে পেড্রো নৌকো দুটো জাহাজের গায়ে এসে লাগাল। দড়ির মই বেয়ে ডেক-এ উঠে এলো। তখন পেড্রো হাঁফাচ্ছে। ও নিজের কেবিনঘরের দিকে চলল। ভেজা পোশাক পালটাতে হবে।
রাত গম্ভীর হল। ফ্লেজার উঁচু গলায় বলল, এবার চলো ভাইকিংরা। দড়ির মই বেয়ে নৌকোয় নামতে লাগল। দুটো নৌকো ভরে গেল। নৌকো দুটো আস্তে আস্তে তীরের দিকে চলল।
তীরে এসে নৌকো লাগল। সবাই তীরে নামল। পেড্রো বলল, কেউ দাঁড়িয়ে থেকো না নজরে পড়ে যাবে। সবাই বসে পড়ো। সবাই বালি মেশানো মাটিতে বসে পড়ল।
পেড্রো আবার দুটো নৌকো চালিয়ে চলল জাহাজের দিকে। নৌকো দুটো জাহাজে লাগল। জাহাজ থেকে ফ্লেজার আর বাকি ভাইকিংরা নেমে এলো। নৌকো দুটো এবার চলল তীরের দিকে। নৌকো তীরে ভিড়ল। সবাই নেমে দাঁড়াল। পেড্রো ওদের বসে পড়তে বলল। ওরা বসে পড়ল। দুই বন্ধুকে ডেকে নিয়ে পেড্রো নৌকো দুটো ঠেলে মাটিতে তুলে রাখল।
