দুই বন্ধু উঠে এলো। গর্তটা ঘিরে দাঁড়াল সবাই। জিতা মৃদুস্বরে বাইবেল থেকে গরগর করে মুখস্থ বলে গেল। কবরে মাটি ফেলা শুরু হল। ফ্রান্সিসরা আগে একমুঠো করে মাটি কবরে ফেলল। তারপর সবাই মাটি ফেলল। এবার বেলচা দিয়ে মাটি ফেলতে লাগল।
কিছুক্ষণের মধ্যে কবরের গর্ত মাটিতে ঢেকে গেল। বিস্কো একটা লম্বা গাছের ডাল ভেঙ্গে নিয়ে এলো। ডালটা ভেঙ্গে দু’টুকরো করল। বুনো লতাও সঙ্গে এনেছিল। বুনো লতা দিয়ে ক্রশের মতো দুটো ডালকে বাঁধল। তারপর কবরের ওপর চেপে বসিয়ে দিল।
সর্দারের গলা শোনা গেল–ফিরে চলো কয়েদখানায়। সবাই ফিরে চলল।
যখন ঘাসে-ঢাকা প্রান্তরে এলো তখন সূর্য উঠছে। ওরা প্রান্তর পার হতে হতেই সূর্য। উঠল। ভোরের সূর্যালোক চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। বনের পাখির ডাকাডাকি এখান থেকেও কানে আসছে। ফ্রান্সিস মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকাল। ঝকঝকে নীল আকাশ। সাদা হালকা মেঘ উড়ছে। ওর মনে হল পৃথিবী কত সুন্দর! এরমধ্যে মানুষের মৃত্যুর কথা ভাবতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু মনে পড়ল কিছুক্ষণ আগে এক মৃতদেহ কবর দিয়ে এলাম। মানুষের হাতে মানুষের মৃত্যু। আরবী শাসক মিন কী নিষ্ঠুর। তারই হাতে চাবুকের ঘা খেয়ে একজন তরতাজা যুবক মারা গেল। কথাটা ভাবতেই ফ্রান্সিসের চোখে জল এলো। ফ্রান্সিস হাতের উল্টেপিঠে চোখ মুছে নিল।
কয়েদঘরে ফিরে এলো ফ্রান্সিসরা।
দেখল হাঁটুতে মুখ গুঁজে অন্য যুবকটি কাঁদছে। এই যুবকটিকেও চাবুক মারা হয়েছিল। কিন্তু ওর সামান্য জ্বর হয়েছিল। জ্বর কমেও গিয়েছিল। মৃত বন্ধুর জন্যে ও মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে কাঁদতে লাগল।
ফ্রান্সিস ওর পাশে বসল। যুবকটির কাঁধে হাত রেখে মৃদুস্বরে বলল– কেঁদো না– তোমার বন্ধুর মৃত্যুর জন্যে যে দায়ী সেই শাসক মিনকে হত্যা করার সংকল্প নাও। কেঁদো না। মনকে শক্ত করো। প্রতিজ্ঞায় অবিচল থাকো। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। হ্যারি মারিয়ার কাছে গিয়ে বসল।
সকালের খাবার খেয়ে ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। একটাই চিন্তা কী করে জাহাজের বন্ধুদের কাছে খবর পাঠানো যায় যে মিনের কয়েদখানায় তারা বন্দী। ফ্লেজারভাই বা কী করে ওদের খোঁজ পাবে! কিভাবে ওদের মুক্ত করতে পারবে?
শাসক মিন কথা রাখল না। মারিয়াকে জাহাজে নিয়ে রাখল না। এই কয়েদঘরেই মারিয়াকে থাকতে হচ্ছে। ভালো করে খাওয়া নেই ঘুম নেই–এত কষ্ট মারিয়া সহ্য করতে পারছিল না। কিন্তু এই নিয়ে মারিয়া ফ্রান্সিসকেকিছুই বলল না। ফ্রান্সিস প্রতিদিনই দেখছে মারিয়ার মুখ শুকনো। চোখের নীচে কালি। মাথার চুলে জট পাকিয়ে গেছে। সবই বুঝতে পারছে ফ্রান্সিস কিন্তু উপায় নেই। সবই সহ্য করতে হবে।
ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। শেষ চেষ্টা। দেখা যাক শাসক মিন মারিয়াকে ওদের জাহাজে রাখার ব্যবস্থা করে কিনা।
ফ্রান্সিস দরজার কাছে গেল। লোহর দরজা ধরে ঝাঁকুনি দিল। এক প্রহরী এগিয়ে এলো। বলল–কী হয়েছে।
–শাসক মিনকে এখানে আসতে বলো। ফ্রান্সিস বলল।
শাসক মিন তোমার চাকর না। প্রহরীটি বলল।
–আমাদের মুক্তি দাও তোমাদের শাসক মিনকে আমার চাকর বানিয়ে ছাড়বো। যাও তো–তুমি গিয়ে বলল যে ভাইকিং সর্দার কিছু বলতে চাইছে।
আমি বলতে যাবো না। প্রহরীটি মুখ ঘুরিয়ে বলল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে লোহার দরজা ঝাঁকাতে লাগল। ভাইকিং বন্ধুরাও এগিয়ে এলো। একসঙ্গে কয়েকজন ফ্রান্সিসের সঙ্গে মিলে দরজা ঝাঁকাতে লাগল। সবাই দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। চলল দরজা ঝাঁকানো।
ফ্রান্সিস গলা চাড়িয়ে বলল–তুমি যদি শাসক মিনকে খবর না দাও তবে আমরা সারারাত ধরে দরজা ঝকাবো। প্রহরীটি ছুটোছুটি করতে লাগল। বুঝে উঠতে পারল না কী করবে? অন্য প্রহরীদের এক অবস্থা। জোর ঝঝন্ শব্দে ওরা দিশেহারা।
তখন একজন প্রহরী উঁচু গলায় বলল–আমরা শাসক মিনকে খবর দিচ্ছি তোমরা শব্দ থামাও। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল ঝাঁকুনি বন্ধ করো। প্রচণ্ড একঘেয়ে শব্দ বন্ধ হল।
সেই প্রহরীটি চলে গেল।
ঘণ্টাখানেক পরে শাসক মিন এলো। কয়েদঘরের দরজার কাছে এসে বলল– তোমরা কী আরম্ভ করেছে।
–এটা করলাম বলেই একজন পহারাদার আপনাকে ডেকে আনতে রাজি হল।
–কী বলতে চাও বলো। মিন বলল।
–আপনি আমাদের দেশের রাজকুমারীকে আমাদের জাহাজে রাখবেন বলেছিলেন। ফ্রান্সিস বলল।
কতজনকে কত কথাই তো বলি। সবসময় কি সেসব কথা মনে থাকে মিন বলল।
আপনি রাজী না হলে আমরা আবার দরজা ঝাঁকানো শুরু করবো, শাঙ্কো বলল।
দাঁড়াও দাঁড়াও। মিন বেশ ঘাবড়ে গেল।
–তাহলে বলুন। হ্যারি বলল।
–বেশ তো রাজকুমারী কখন যেতে চান বলুন আমি প্রহরী সঙ্গে দিয়ে পাঠাচ্ছি। মিন বলল।
রাজকুমারী দ্রুত উঠে দাঁড়ান। চড়া গলায় বলল–আপনার মতো নৃশংস নির্দয় মানুষের কাছে আমি কক্ষণো অনুরোধ জানাবো না। জাহাজের যুগের জীবন আমি চাই না।
–মারিয়া কী বলছো তুমি? এখানে থাকলে তুমি অসুস্থ হয়ে পড়বে।ফ্রান্সিস বলল।
–অসুখ হলে মরে যাবো তাও ভালো এই খুনীর কাছে কিছু চাইব না। একটু পরে বলল–ফ্রান্সিস আজকে আমি তোমার কথাও শুনবো না। মারিয়া বলল।
মারিয়া শান্ত হও–সবদিক ভেবে দেখো। ফ্রান্সিস বলল।
–না আমি জাহাজে যাবো না। এখানেই থাকবো। মারিয়া বলল। মিন অল্প হাসল। বলল–দেখছো তো রাজকুমারী নিজেই যেতে চাইছে না। আমার আর কিছু করার নেই।
