ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। দরজার কাছে এলো। একজন প্রহরীর দিকে তাকিয়ে বলল–শুনে যাও। প্রহরীটি এগিয়ে এলো। বলল, কী ব্যাপার?
–একজন বার্বার বন্দী মারা গেছে। তাকে কবর দেবার ব্যবস্থা করো। ফ্রান্সিস বলল।
–তাহলে তো সেনাপতিকে খবরটা জানাতে হয়। প্রহরীটি বলল।– যাও। জানিয়ে এসো। ফ্রান্সিস বলল।
প্রহরীটি চলে গেল। ফ্রান্সিস ফিরে এসে বসল। ফ্রান্সিসরা কেউ কোনো কথা বলছে না। চুপ করে আছে।
কিছু পরে ফ্রান্সিস বলল–হ্যারি। হ্যারি ওর দিকে তাকাল। ফ্রান্সিস বলল–একটা সম্ভাবনার কথা ভাবছি। যদি সেনাপতি মৃতদহ কবর দেবার দায়িত্ব আমাদের দেয় তাহলে আমরা বাইরে যেতে পারবো। সুযোগ বুঝে পালাতেও পারবো।
–কিন্তু রাজকুমারীকে রেখে আমরা কী করে পালাবো? হ্যারি বলল।
হা–এই একটা ভুল আমরা করেছি। মারিয়াকে আমাদের জাহাজে গিয়ে রাখতে মিনকে বলেছিলাম। পরে ঐ ব্যাপারে আর চেষ্টা করিনি। ঐ ভুলের খেসারত দিতে হচ্ছে।
প্রহরীটি ফিরে গেল। দরজার কাছে এসে বলল–সেনাপতি বললেন–কয়েদী মারা গেলে অন্য কয়েদীর দল মৃতদেহ কবর দেবে। তোমাদের মধ্যেই সাতজনকে ছাড়া হবে। তারাই ঐ থর্ন বনে গিয়ে মৃতদেহ কবর দেবে। তোমাদের মধ্যে সাতজন এগিয়ে এসো। ফ্রান্সিস যা ভেবেছিল তাই হল। ফ্রান্সিস শেষ চেষ্টা করল। প্রহরীকে বলল আমাদের রাজকুমারীও আমাদের সঙ্গে যাবে।
–না! রাজকুমারীকে ছাড়া চলবে না। রাজকুমারী পালিয়ে গেলে আমাদের গান যাবে। তাছাড়া রাজকুমারী এখানে বন্দী আছে বলেই তোমরা আমাদের কজার আছে।
হ্যারি বলল–একটা কফিন তো লাগবে। একজন পাদ্রীকেও তো চাই।–তোমরা কয়েকজন এসো। কফিন আনতে হবে। পাদ্রী ফাদ্রী এই রাতে আর পাওয়া যাবে না। জিতা ঘুমোয়নি। প্রহরীর কথাটা ওর কানে গেল। জিতা গলা চড়িয়ে বলল–ফ্রান্সিস পাদ্রীর কাজ আমিই করবো। পাদ্রীরা বাইবেলের যে জায়গাটা বলে সেই জায়গাটা আমার মুখস্থ। বাইবেলও লাগবে না।
ফ্রান্সিস শাঙ্কোরা এখন কয়েদঘর থেকে বেরোচ্ছে তখন কয়েকজন বাবার বন্দী এগিয়ে এলো। বলল–আপনারা আমাদের বন্ধুর জন্যে যা করেছেন তা তো আমরা দেখেছি। আপনারা বিশ্রাম করুন। আমরা যাচ্ছি।
কথাটা প্রহরীর কানে গেল। প্রহরীটি বলল না। তোমাদের ছাড়া যাবে না। তোমরা যাবে না। বাবার সৈন্যটি বলল–আমরা আমাদের বন্ধুকে কবরও দিতে পারবো না?
–না। এই ভাইকিংরা সব করবে। ফ্রান্সিস বার্বারদের দিকে তাকিয়ে বলল—
–তোমরা নাই বা যেতে পারলে। আমরা সব করবো। তোমাদের চিন্তার কিছু নেই।
প্রহরীর শুনে শুনে সাতজন ভাইকিংকে কয়েদঘর থেকে বেরোতে দিল। ফ্রান্সিস প্রহরীদের বলল–আর একজনকে যেতে হবে। পাদ্রীর কাজ করবে।
–বেশ। যে পাদ্রীর কাজ করবে তাকে ডাকো। প্রহরীটি বলল।
–জিতা। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে ডাকল। জিতা কয়েদঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
–জিতা তুমিও চলো। পাদ্রীর কাজ করবে। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে চলো। সর্দারটি বলল।
তিনজন প্রহরীও খোলা তলোয়ার হাতে ওদের সামনে যেতে লাগল। এক সর্দার গোছের প্রহরী বলল–প্রথমে আমরা কফিন আনবো। এত লোকের দরকার নেই। কয়েকজন ভাইকিং কয়েদঘরে সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল।
বাকিরা চাঁদের আলোয় প্রান্তরের ওপর দিয়ে চলল। দু’জন সৈন্য দুটো মশাল নিয়েছে। শুধু তাদের হাতেই তলোয়ার নেই। প্রাসাদের এক কোণায় একটা ঘর তালাবদ্ধ। সর্দারটি কোমরের বন্ধনি থেকে চাবি বের করল। দরজা খোলা হল।
ঘরটার ভেতরে ঢুকল সবাই। মশালের আলোয় দেখা গেল অনেক কফিন ছিটিয়ে ছড়িয়ে রাখা। সৈন্যরা কফিনগুলো থেকে একটা কফিন বের করল। কফিনের কাঠ কি ভেঙ্গে গেছে। আবার খোঁজ শুরু হল। ফ্রান্সিসরাও হাত লাগাল। একটা মোটামুটি ভালো কফিন পাওয়া গেল। শাঙ্কো খুঁজে বের করল সেটা।
কফিনটা নিয়ে বাইরে এলো সবাই। ঘরটার তালা ঝুলল। সবাই ফিরে চলল কয়েদঘরের দিকে।
প্রান্তর পার হয়ে সকলে কয়েদঘরের সামনে এলো। কয়েদঘরের সামনে এসে সর্দার বলল–কফিন বারান্দায় রাখো। মড়া বের করে কফিন রাখো। ফ্রান্সিসরা কয়েকজন যুবকটির মৃতদেহ কয়েদঘর থেকে নিয়ে এলো। কফিনে শুইয়ে দিল।
সর্দারটি জোর গলাই বলল–কফিন থর্ন বনের দিকে নিয়ে চলো।
ফ্রান্সিসরা কফিন কাঁধে নিল। চলল বনের দিকে। তখনই দুটো বেলচা নিয়ে একজন সৈন্য ছুটে এলো। হাঁপাচ্ছে তখন।
সকলে কিছুপরে বনভূমির কাছে পৌঁছল। সর্দার বলল–বনে ঢোক। সবাই কফিনটা নিয়ে বনের মধ্যে ঢুকল।
গাছ-গাছালির মধ্যে দিয়ে কফিন কাঁধে নিয়ে চলল সবাই। অন্ধকার খুব একটা বেশি নয়। ছাড়া ছাড়া গাছ-গাছালি বলে কোথাও কোথাও মাটিতে গাছের গায় চাঁদের ভাঙ্গা আলো পড়েছে।
কিছুদূর গিয়ে সর্দার বলল–থামো। সেখানেই দাঁড়াল সবাই। এদিক ওদিক দেখে নিয়ে সর্দার একটা বুনো গাছের তলায় দাঁড়াল। গলা চড়িয়ে বলল–এখানে কবর খোঁড়।
ফ্রান্সিস সৈন্যের হাত থেকে বেলচাটা নিল। এগিয়ে গিয়ে গাছটার কাছে মাটিতে বেলচা চেপে ঢোকাল। আর এক ভাইকিংবন্ধু অন্য বেলচাটা নিল। মাটি খুঁড়তে লাগল।
বেশ কিছুক্ষণ খোঁড়া চলল। শাঙ্কো বিস্কোও হাত লাগাল।
একটা বড়ো গর্ত হল। ফ্রান্সিসরা কয়েকজন মিলে কফিনটা গর্তের কাছে নিয়ে এলো। দু’জন ভাইকিং গর্তটায় নামল। ওপর থেকে ফ্রান্সিসরা কফিনটা আস্তে আস্তে ধরে ধরে গর্তটায় নামাল। দুই বন্ধু নিচ থেকে ধরে ধরে কফিনটা গর্তের মধ্যে নামাল।
