মারিয়া কাঠের গ্লাসে জল নিয়ে এলো। ছেঁড়া কাপড়টা জলে ভিজিয়ে যুবকটির কপালে চেপে দিতে লাগল। ফ্রান্সিস উঠল। চলে এলো নিজেদের জায়গায়। জিতাকে বলল অসুস্থ যুবকটির কথা। জিতা মন দিয়ে শুনল। তারপর বলল–যদি কালকেও জ্বর না সারে তবে জানবে যুবকটির বাঁচার আশা নেই।
পরদিনও যুবকটির জ্বর ছাড়ল না। মারিয়া কিছুক্ষণ পরপরই জলপট্টি দিতে লাগল। কিন্তু জ্বর কমার নাম নেই। সেই সঙ্গে যুবকটি সারা শরীর মোচড়াতে লাগল আর কিছুক্ষণ পরপরই প্রলাপ বকতে লাগল।
মারিয়া যুবকটির কষ্ট দেখতে পারছিল না। ও ফ্রান্সিসের কাছে এলো। বলল– তোমরা থাকতে যুবকটি বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে?ফ্রান্সিস বলল–মারিয়া সেনাপতির চাবুকের মার খেয়েই যুবকটি অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সেই সেনাপতিকে ডেকে আনিয়ে অনায়াসে হত্যা করা যায়। কিন্তু তাহলে আমাকেও মরতে হবে। কাজেই সেটা করা যাবে না। সেনাপতিকে ডাকিয়ে আনতে পারি। সে কী বলবে তাও আমি জানি। সে বলবে কয়েদঘর থেকে পালাতে গেলে এই যুবকটির মতোই অবস্থা হবে আমাদের।
যাক গে–আমি সেনাপতিকে খবর পাঠাচ্ছি।
ফ্রান্সিস উঠে দরজার কাছে গেল। একজন প্রহরীকে ডাকল। বলল–ভাই সেনাপতিকে খবর দাও। উনি যেন এখানে একবার আসেন। একজন বাবার যুবকের শরীরের অবস্থা খুব খারাপ।
–কার কথা বলছো? প্রহরটি বলল।
–যে যুবকটিকে সেনাপতি চাবুক মেরেছে তার শরীর খুব খারাপ ফ্রান্সিস বলল।
খুব ভালো হয়েছে–পালাতে গিয়েছিল কেন? প্রহরী বলল।
ফ্রান্সিসের রাগে মাথায় রক্ত উঠে গেল। তবুফ্রান্সিসশান্তস্বরে বলল–ভাইযুবকটি খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সেনাপতিকে খবর দাও।
–পারবো না। প্রহরীটি মাথা ঝাঁকিয়ে বলে উঠল। ফ্রান্সিস পরপর তিনজন প্রহরীকে একই অনুরোধ করল চতুর্থ প্রহরীটিকেও একই অনুরোধ করল। চতুর্থ প্রহরীটি বলল সেনাপতিকে ডেকে নিয়ে এসে কিছুই হবে না। উনি বলবেন–যা করেছি ঠিক করেছি। মরলে আমি কী করবো? সেনাপতিকে ডেকে কোনো লাভ নেই।
–লাভ লোকসানটা আমরা বুঝবো তুমি খবর দিয়ে আসতে বলল। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ–যাচ্ছি। প্রহরীটি বলল।
প্রহরী বারান্দা থেকে মাঠে নামল। তারপর চলল সেনাপতির বাড়ির দিকে।
ফ্রান্সিস বাকিতিনজন প্রহরীর দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে শান্তস্বরে বলল তোমাদের ভাই বলে একটা অনুরোধ করেছিলাম। তোমরা শুনলে না। অনুরোধ রাখলে না। তোমাদের তিনজনকে হত্যা করা আমার কাছে কিছুই না। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে তাহলে আমার বন্ধুদের বিপদ বাড়বে। কারণ তাহলে আমাকেও মরতে হবে। কিন্তু আমি এখন মরতে রাজি নই। আমাকে এখন বেঁচে থাকতেই হবে।
কিছুক্ষণ পরে সেনাপতি এলো। সেনাপতির মুখ দেখেই ফ্রান্সিস বুঝল সেনাপতি ক্রুদ্ধ। কয়েদঘরের দরজা খোলা হল। সেনাপতি ঘরে ঢুকল। চারদিকে বন্দীদের দিকে তাকিয়ে বলল কী হয়েছে? কী বলতে চাও তোমরা? সবাই শুয়ে বসেছিল। কেউ কোনো কথা বলল না। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বলল–মাননীয় সেনাপতি মহাশয় গত পরশু যে দুজন বাবার বন্দীকে আপনি চাবুক মেরেছিলেন তাদের একজন গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বোধহয় বাঁচবে না। তার চিকিৎসার জন্যে আপনাকে অনুরোধ করছি।
-কই সেই বন্দী? সেনাপতি বলল।
ফ্রান্সিস ঘরের কোণার দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল–ঐ দিকে যান। দেখতে পাবেন।
সেনাপতি সেদিকে গেল। মারিয়া তখন যুবকটির কপালে জলপট্টি দিচ্ছিল। সেনাপতি অসুস্থ যুবকটিকে দেখল। নিচু হয়ে নির্জীব উবু হয়ে শুয়ে থাকা বাবার যুবকটির কপালে গায়ে হাত দিল। বুঝল–প্রচণ্ড জ্বর হয়েছে। গা পুড়ে যাচ্ছে। সেনাপতি মাথা তুলে বলল–কয়েদঘর থেকে পালাবার শাস্তি এটা। আমার কিছু করার নেই।
ফ্রান্সিস বলল–ঠিক আছে। শুধু ওর জন্যে একজন বৈদ্য পাঠান।
–না। সেনাপতি চেঁচিয়ে উঠল–এভাবেই মরুক। ফ্রান্সিস বসা অবস্থা থেকে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে হ্যারিও উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিসের হাত ধরল। গলা চড়িয়ে ডাকল–শাঙ্কো। শাঙ্কো ছুটে এলো। ফ্রান্সিসকে ধরল। ফ্রান্সিসের চোখে জল এলো। হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস-ক্রুদ্ধ হয়ো না। নিরস্ত্র আমরা বিপদ হতে পারে।
ফ্রান্সিস দাঁত চাপাস্বরে বলল–এই কয়েদঘর থেকে কোনোদিন মুক্তি পেলে তোমাকে আমি যখন যে অবস্থায় পাবো তোমাকে আমি হত্যা করবো। এই আমার প্রতিজ্ঞা।
সেনাপতি একবার ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। তারপর আস্তে আস্তে হেঁটে কয়েদঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ফ্রান্সিস চোখ মুছতে মুছতে বসে পড়ল। হ্যারি আর শাঙ্কো ফ্রান্সিসের পাশে বসল। কেউ কোনো কথা বলল না।
মারিয়ে ছুটে এলো। বলল–ফ্রান্সিস এখন কী করবে?–সবই তো শুনলে। যুবকটিকে বিনা চিকিৎসায় মরতে হবে। আমরা কিছুই করতে পারবো না।
মারিয়া বসে পড়ল। তারপর দু হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ফ্রান্সিসরা। কেউ কোনো কথা বলল না।
তখন গভীর রাত। যুবকটি শরীর এপাশ-ওপাশ করে মোচড়াচ্ছে। ফ্রান্সিস আর মারিয়া পাশে বসে আছে। মারিয়া যুবকটির কপালে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
হঠাৎ যুবকটি উঠে বসল। অস্ফুটস্বরে কী বলল। তারপর বিছানায় পড়ে গেল। শরীরের নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেল। যুবকটি মারা গেল। মারিয়া মৃত যুবকটির মুখের দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। ফ্রান্সিস শাঙ্কো হ্যারি মাথা নিচু করে রইল। ওদের চোখেও জল। আজ ওরা অক্ষম। যুবকটিকে বাঁচাতে পারল না।
