ফ্রান্সিসদের সঙ্গে আট-দশজন বাবার জাতির লোক বন্দী ছিল। সেদিন রাঁধুনিরা খাবার নিয়ে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে দুজন বাবার বন্দী দরজার ওফর ঝাঁপিয়ে পড়ল যাতে দরজা খোল অবস্থায় থাকে আর ওরা পালাতে পারে। কিন্তু প্রহরীরা খুবই তৎপরতার সঙ্গে লোহার দরজা বন্ধ করে দেয়। তাই বাবার বন্দী দু’জন পালাতে পারল না।
একজন প্রহরী চলে গেল। ফ্রান্সিস ভাবল হয়তো দু’জন বার্বারের কোনো শাস্তি হবে না। কিন্তু ফ্রান্সিস ভুল ভেবেছিল। কিছুক্ষণ পরে সেনাপতি এলো। হাতে চাবুক। প্রহরী দরজা খুলে দিল। সেনাপতি কয়েদঘরে ঢুকল। যে প্রহরীটি সেনাপতিকে খবর দিয়েছিল সে এগিয়ে গিয়ে সেই দু’জন বাবারকে দেখিয়ে দিল। সেনাপতি বার্বার দু’জনকে সামনে এগিয়ে আসতে বলল। বাবার দু’জন বুঝল কপালে দুঃখ আছে। দু’জন এগিয়ে গেল। সেনাপতি একটাকে সরিয়ে দিয়ে অন্যটার গায়ে চাবুক মারতে লাগল। বার্বারটি চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। সেনাপতির তখন চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে। হাঁফাচ্ছে তবু চাবুকের মার বন্ধ করল না। হাঁফাতে হাঁফাতে সেনাপতি পরেরটাকে ধরল। তারপর চাবুক মারতে লাগল। এই বার্বারটি কাঁদল না মুখ বন্ধ করে চাবুকের মার খেতে লাগল। একটুক্ষণ পরে পরিশ্রান্ত সেনাপতি থামল। চাবুকটা পাকাতে পাকাতে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল–আজকে এই পর্যন্ত। আবার পালাবার চেষ্টা করলে চাবুক মেরেনরকে পাঠাবো।
সেনাপতি এবার চারদিকে সব বন্দীদের দিকে তাকিয়ে বলল–পালাতে চেষ্টা করলে সবার কাঁপালেই চাবুকের মার জুটবে। সেনাপতি চাবুকটা একজন প্রহরীকে দিল। বলল– রেখে দে। তারপর চলে গেল।
পরদিন রাতে চাবুকের মার খাওয়া একজন বাবার বন্দীর প্রচণ্ড জ্বর এলো। ওর সঙ্গীদের একজন ফ্রান্সিসের কাছে এলো। বললো–আমাদের যে সঙ্গীটি চাবুকের মার খেয়েছে তার ভীষণ জ্বর এসেছে। একবার দেখে যান।- জ্বর আসাটা ভালো কথা নয়। কিন্তু আমি তো বৈদ্য নই। তবু চলো–দেখি।
ফ্রান্সিস অসুস্থ বন্দীটির কাছে এলো। কপালে গলায় হাত দিয়ে দেখল। বুঝল ভীষণ জ্বর এসেছে। ফ্রান্সিস কী বলবে কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। ভেন তো আমাদের সঙ্গে নেই। কে চিকিৎসা করবে এই বাবার বন্দীটির? ফ্রান্সিস ফিরে এসে নিজের জায়গায় বসল। জিতাকে মারিয়াকে ঐ অসুস্থ বাবার বন্দীটির কথা বলল। জিতা বলল–আমি এর ওষুধ জানি কিন্তু আমি তো বন্দী। মারিয়া মুখ নিচু করে ফ্রান্সিসের সব কথা শুনল। তারপর নিজের পোশাকের রুলের দিক থেকে আধহাত খানেক কাপড় ছিঁড়ল। উঠে দাঁড়িয়ে চলল যেখানে পীপের মধ্যে খাবার জল রাখা হয়েছে সেখানে। একটা কাঠের গ্লাস নিল। জল ঢেলে নিয়ে চলল সেই বন্দীটির দিকে।
মারিয়া বন্দীটির পাশে বসল কপালে হাত দিয়ে বুঝল ভীষণ গরম। জলের গ্লাশটা রাখল। তারপর ছেঁড়া কাপড়টা জলে ভিজিয়ে নিল। বন্দীটির কপালে জলে ভেজা ঘেঁড়া কাপড়টা আস্তে চেপে ধরে রইল। কিছুক্ষণ রেখে আবার তুলল। একটু পরে আবার ভেজা কাপড়টা কাঁপালে রাখল। মারিয়া প্রায় আধঘণ্টা ধরে এইভাবে জলপট্টি লাগল। পরে কপাল মুছে কপালে হাত রাখল। কপালের গরম ভাবটা অনেকটা কম লাগল। এই অসুস্থ বন্দীটির সঙ্গে আর একজনকে যে চাবুক মারা হয়েছিল সে কিন্তু চুপ করে অসুস্থ বন্ধুটির পাশে বসে। জ্বালা যন্ত্রণা মুখ বুজে সহ্য করতে লাগল। মারিয়া তাকে বলল–আপনার বন্ধুটির জ্বর বেশ কিছুটা কমেছে।
–কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ জানাবো-বার্বার যুবকটি বলল।
–সেসব পরে জানাবেন। এখন আপনার বন্ধুটি কিভাবে সুস্থ হবে সেই চেষ্টা করতে হবে। মারিয়া ফ্রান্সিসদের কাছে এসে বসল। ফ্রান্সিস বলল–ঐ বার্বার যুবকটি কেমন আছে?
–ভালোনা। প্রচণ্ড জ্বর ছিল। কপালে জলপট্টি দিয়ে কিছুটা জ্বর কমিয়েছি। আরও জলপট্টি দিতে হবে। মারিয়া বলল।
–তাই দিও। ফ্রান্সিস বলল।
রাতের খাওয়ার পর মারিয়া সেই অসুস্থ বাবার যুবকটির কাছে এলো। যুবকটির কপালে জলপট্টি দিতে লাগল।
একটু বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে মারিয়া সারারাত জলপট্টি দিল। ভোরের দিকে জ্বর কমল। কিন্তু জ্বর সেরে গেল না।
মারিয়া ফ্রান্সিসদের কাছে এলো। ফ্রান্সিস বলল
-কেমন আছে যুবকটি?
–জ্বর ছাড়েনি। তবে জ্বর কমেছে। মারিয়া বলল।
দুপুরবেলা যুবকটির জ্বর আবার বাড়ল। মারিয়া শুয়েছিল। সারারাত জেগে ছিল। একটু ঘুম ঘুম ভাব এসেছিল। সেই ভাবটা কেটে গেল একজন বাবার বন্দীর ডাকে। মারিয়া চোখ মেলে তাকাল। বাবার বন্দীটি বলল–আবার ওর জ্বর বেড়েছে। বন্ধুটি ভুল বকছে। আপনি যদি একবার আসেন।
ফ্রান্সিস উঠে বসল। বলল–মারিয়া–চলো–তোমরা সঙ্গে আমিও যাবো।
দুজনে অসুস্থ বন্দীটির কাছে এলো। বন্দীটি তখন প্রলাপ বকছে। বলছে–যে আমাকে চাবুক মেরেছে–কে সে? সেনাপতি আবার কে?মার মার সেনাপতিকে–আমি বাড়ি যাবো–কে ডাকছে? বাবা? আমি ভালো আছি–একটু জ্বর হয়েছে–সেরে যাবে। হা-পিঠে অসহ্য ব্যথা। মাঝে মাঝে সেই ব্যথা হাত পা বুকে ছড়িয়ে যাচ্ছে আমি বাড়ি যাবো।
ফ্রান্সিস মারিয়ার দিকে তাকাল। তারপর অসুস্থ যুবকটির কপালে হাত রাখল। গলায়। বুকে হাত বুলোল।মৃদুস্বরে বলল–শরীরটা আগুনের মতো গরম। তুমি এখানে থাকো। জলপট্টি দাও। জ্বরটা কমাও। নইলে–। ফ্রান্সিস আর কিছু বলল না।
