দুটো মশাল জ্বলছে, তবু ঘরের এদিকে-ওদিকে অন্ধকার কাটেনি। এমনই অন্ধকার কোণ থেকে একজন লোক ফ্রান্সিসের দিকে আসতে লাগল। ফ্রান্সিস বিছানায় বসতে যাবে, তখনই লোকটা ডাকল, ফ্রান্সিস।
ফ্রান্সিস মুখ ফেরাতেই দেখল, বিস্কো সামনে দাঁড়িয়ে। ফ্রান্সিস অবাক। সে বলে, উঠল, বিস্কো, তোমরা বন্দি হলে কী করে?
সব বলছি, তার আগে এদিকে এসো। রাজকুমারী মারিয়া ভীষণ মুষড়ে পড়েছেন। বিস্কো বলল। তারপরে ঘরের ডানদিকে চলল। ততক্ষণে হারি আর শাঙ্কো উঠে দাঁড়িয়েছে। সবাই চলল বিস্কোর পেছনে পেছনে। দেওয়ালের কাছে গিয়ে দেখল, পাথরের দেওয়ালে ঠেস দিয়ে মারিয়া চোখ বুজে বসে আছে। মারিয়ার কাছে পাঁচজন বন্ধু বসে আছে। মারিয়ার চোখমুখ শুকনো।মাথার চুলও উসকোখুসকো। মারিয়া বেশ রোগা হয়ে গেছে। ফ্রান্সিসের মন কেঁদে উঠল। ও দ্রুত বসে মারিয়ার ডান হাতটা ধরল। না, গা গরম নয়। ফ্রান্সিস আস্তে ডাকল, মারিয়া।
মারিয়া চোখ মেলে তাকাল। ফ্রান্সিসকে দেখে মারিয়ার ভয়ার্ত স্বরে বলে উঠল, তোমরাও বন্দি হলে?
হ্যাঁ, পালিয়েছিলাম কিন্তু পরে ধরা পড়েছি। ওসব পরে শুনবে। তোমার শরীর ভালো তো?
মারিয়া হেসে বলল, তুমি এসেছ। এবার আমি একেবারে ভালো হয়ে যাব।
ফ্রান্সিস বিস্কোর দিকে তাকাল। বলল, তোমরা ধরা পড়লে কী করে?
বিস্কো বলল, প্রায় তিনদিন হতে চলল তোমরা ফিরে এলে না। তখন রাজকুমারী বললেন, চলো, আমরা কয়েকজন গিয়ে গোপনে ফ্রান্সিসদের খোঁজ করি। আমরা পাঁচজন আর একটা নৌকোয় চড়ে সমুদ্রতীরে এলাম। দেখলাম তোমাদের নৌকোটা মাটিতে তোলা আছে। বুঝলাম তোমরা এখানেই নেমেছিল। রাজকুমারী মানা করেছিলেন তাই আমরা তলোয়ার নিইনি। বিস্কো থামল। তারপর বলতে লাগল, বন্দরের কাছাকাছি একটা বাড়ির সামনে এলাম। ডাকাডাকি করলাম। একজন বৃদ্ধ বেরিয়ে এলো। বৃদ্ধের কাছেই জালালাম, এটা আলজিরিয়া আর এই বন্দর-শহরটির নাম সিউতা। বৃদ্ধের কাছে জানতে চাইলাম এখানে সে কয়েকজন বিদেশিকে দেখেছে কিনা। বৃদ্ধটি বলতে পারল না। অগত্যা আমরা খুঁজতে লাগলাম কয়েদঘরটা কোথায়? আমরা ঝোপজঙ্গ লের আড়ালে আড়ালে এখানে এলাম। এই বাড়িটা দেখে বুঝলাম, এটাই কয়েদঘর। বিস্কো থামল। তারপর বলতে লাগল, একটা ঝোঁপের আড়ালে সবাইকে রেখে আমি, একা এই কয়েদঘরের পেছনে এলাম। আমাদের দেশীয় ভাষায় চিৎকার করে বললাম, ফ্রান্সিস তোমরা কি বন্দি? তখন বেশ রাত। আমরা কথা বলা বেশ জোরেই শোনাল। কিন্তু তোমাদের কোনও উত্তর পেলাম না। ওখান থেকে পালিয়ে আসতে গিয়ে পারলাম না। আমরা পাঁচজন ধরা পড়ে গেলাম। বিস্কো চুপ করল।
ফ্রান্সিস বলল, তোমাদের এভাবে আসা উচিত হয়নি। মারিয়াকে বলল, তুমি এত ব্যস্ত হয়ে পড়লে কেন। নিজেই চলে এলে। যাকগে, কালকে মিনকে বলে তোমার জাহাজে থাকার ব্যবস্থা করব। তবে মনে হয় না মিন রাজি হবে। ততক্ষণে হ্যারি আর শাঙ্কোও সেখানে এসে বসে পড়েছে। হ্যারি বন্ধুদের কাছে বলতে লাগল কী ঘটেছে। এখানে।
তখন রাত হয়েছে। ঢটাং শব্দে দরজা খুলল। পাহারাদাররা খাবার নিয়ে এলো। ফ্রান্সিসরা নিঃশব্দে খেয়ে নিল।
পরদিন সকালে ফ্রান্সিস পাহারদারকে বলল, সর্দারের সঙ্গে কথা আছে। সর্দারকে নিয়ে এসো।
একটু পরেই সর্দার এলো। ফ্রান্সিস মারিয়াকে দেখিয়ে বলল, ইনি আমাদের দেশের রাজকুমারী। এখানাকার এই কষ্টকর জীবন উনি সহ্য করতে পারবেন না। রাজকুমারীকে আমাদের জাহাজে বন্দি করে রাখো।
ঠিক আছে, এসব শাসক মিনকে বলবে। তিনি যা চাইবেন তাই হবে। সর্দার কথাটা বলে চলে গেল।
তিনদিন কেটে গেল। কয়েদর পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থায় কড়াকড়ি হল। আটজন প্রহরী রাখা হল। ফ্রান্সিস কিছুটা হতাশই হল। এত কড়া পাহারা এড়িয়ে পালানো অসম্ভব মনে হল। শুধু ফ্রান্সিস একা হলে হয়তো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পালানো যেত। কিন্তু মারিয়া হ্যারিদের নিয়ে পালাতে গেল কেউ বাঁচবে না। এসব ভেবে ফ্রান্সিস খুব চিন্তায় পড়ল। ঘাসের বিছানায় শুয়ে ফ্রান্সিস এরকম সাত-পাঁচ ভাবছিল। হ্যারি কাছে এসে বসল। বলল, ফ্রান্সিস, কী করবে এখন?
কিছুই করার নেই। এই কয়েদঘর থেকে সবাইকেনিয়ে পালানো অসম্ভব। ফ্রান্সিস বলল।
হু, যেরকম পাহারা বসিয়েছে। হ্যারি বলল।
একমাত্র আশা, জাহাজ থেকে আমরা ফিরছি না দেখে বন্ধুরা যদি আসে। বন্ধুরা এলেও এই শিরস্ত্রাণ বর্মপরা সশস্ত্র সৈন্যদের সঙ্গে লড়াই করে কি আমাদের বন্ধুরা পারবে? ফ্রান্সিস বলল।
একথা সত্যি। কিছু বন্ধুর মৃত্যু হবেই। সৈন্যরা সুশিক্ষিত, সশস্ত্র। তুলনায় আমাদের বন্ধুদের একমাত্র অস্ত্র তলোয়ার। শাঙ্কো থাকলে তবু তিরধনুক কাজে লাগাতে পারত। হ্যারি বলল।
মারিয়া পাশেই বসেছিল। বলল, জাহাজের বন্ধুরা নিশ্চয়ই একটাই চিন্তা করবে মুক্তি হবে কী করে?
ফ্রান্সিসদের আরবী শাসকমিনের কয়েদখানায় একঘেয়ে দিন কাটাতে লাগল। ফ্রান্সিস প্রায় সারাদিনই ঘাসের বিছানায় শুয়ে থাকে। কত পরিকল্পনা করে পালানোর জন্যে। কিন্তু হিসেব করতে গিয়ে বোঝে সেসব পরিকল্পনা কার্যকরী হবে না। আরো বিপদ হয়েছে যে ফ্রান্সিসরা একবার পালিয়েছিল। কাজেই মিন কড়া পাহারার ব্যবস্থা করেছে। কয়েদঘরের সামনে সারা দিনরাত চারজন করে প্রহরী মোতায়েন থাকে। তাদের হাতে থাকে খোলা তরবারি। রাতে বাড়তি আরো দু’জন সশস্ত্র সৈন্য কয়েদঘরের সামনের মাঠে ঘুরে বেড়ায়।
