হ্যারি বলল, ফ্রান্সিস একটা কথা ভেবেছ?।
যদি মিন তার সৈন্যদের নিয়ে আসে, আর যদি আমাদের হত্যা করতে আসে, তা হলে নিরস্ত্র আমাদের মৃত্যু ছাড়া গতি নেই।
তা ঠিক, ফ্রান্সিস বলল, তবে মিনের সামনে লোভনীয় প্রস্তাব দেব। তখন মিন আমাদের একেবারে মেরে ফেলবে না। এখন দেখা যাক, কে বা কারা আসছে।
চারজনেই কান পাতল। এবার কয়েকজন লোকের পায়ের শব্দ শোনা গেল। পদধ্বনি এগিয়ে আসতে লাগল। গুহাপথের পাথুরে দেওয়ালে মশালের আলো পড়ল। সেই আলো এগিয়ে আসতে লাগল। রানি তুহিনার শয়নকক্ষের সামনে এসে দাঁড়াল মিন। সঙ্গে দশ-পনেরোজন সৈন্য। মিনের ঘর্মাক্ত মুখে মশালের আলো কাঁপছে।
ফ্রান্সিস উচ্চকণ্ঠে বলে উঠল, আমরা নিরস্ত্র। আপনি ইচ্ছে করলেই আমাদের হত্যা করতে পারেন। আমরা বাধা দেওয়ার বিন্দুমাত্র চেষ্টাও করতে পারব না।
মিন একটু হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, তোমরা কয়েদঘর থেকে পালালে কেন?
নিজেদের জীবন রক্ষা করতে। ফ্রান্সিস বলল।
এখনই তোমাদের জীবন শেষ করে দিতে পারি, তা জানো? মিন বলল।
সে কথা তো আগেই বললাম। ফ্রান্সিস বলল।
না, তোমাদের হত্যা করব না। তোমাদের বাঁচিয়ে রাখব। ক্রীতদাস কেনাবেচার ব্যবসায়ীরা আসে। তাদের হাতে তুলে দেব। ভালো দাম পাওয়া যাবে। মিন বলল।
ফ্রান্সিস বলল, রানি তুহিনার যে রত্নহার আপনি পেয়েছেন তার লকেটে রানি যে নকশা মিনে করিয়েছেন সেটার সমাধান করতে পারলেই রানির অলঙ্কার ভাণ্ডার উদ্ধার করা যাবে।
এ-কথা আমার দুই পণ্ডিতও বলেছে। মিন বলল।
তারা কি সমাধান করতে পেরেছেন। ফ্রান্সিস বলল।
না, তবে সমাধান করতে পারবে। মিন বলল।
তা হলে তো ভালোই। তবে আমাদের যদি বন্দি না করেন তবে আমরা রানির গুপ্তভাণ্ডার উদ্ধারের চেষ্টাকরতে পারি। ফ্রান্সিস বলল।
কোনও প্রয়োজন নেই। আমার পণ্ডিতেরাই পারবে। পণ্ডিতরা পঞ্চশজন সৈন্য নিয়ে রানি তুহিনার ভগ্ন প্রাসাদের পাথর সরাচ্ছে। দিনকয়েক লাগবে সব ধ্বসংস্তূপ সরাতে। তারপর পণ্ডিতরা ওখানে রানির ভাঙ্গা,সভাঘরে রানির অন্তঃপুরে ঘরগুলোয় অনুসন্ধান চালাবে। মনে হয় রানির গুপ্তভাণ্ডার ওরা সন্ধান করতে পারবে। মিন বলল। তারপর সর্দারের দিকে তাকিয়ে বলল, এই সবকটাকে নিয়ে চল, কয়েদঘরে আটকে রাখবি।
সর্দার এগিয়ে এলো। সৈন্যদের আঙুল তুলে ইঙ্গিত করল। সৈন্যরা ফ্রান্সিসদের ঘিরে দাঁড়াল। সর্দার বলল, সবাইকে নিয়ে চল।
ফ্রান্সিসরা চলা শুরু করল। ফ্রান্সিস বলল, হ্যারি, মিন আমার প্রস্তাবে সাড়া দিল না। পণ্ডিতদের ওপরেই ওর বিশ্বাস বেশি। পণ্ডিতেরা ভাঙ্গা প্রাসাদে কিছুই পাবে না।
এখন কী করবে?
বন্দিদশা মেনে নেব। আমার বন্ধুরা তো মুক্ত রয়েছে। ওদের কাছে আমাদের বন্দিদশার কথাটা পৌঁছে দিতে হবে। ওরাই যা করার করবে। ফ্রান্সিস বলল।
তা হলে তো মিনের সৈন্যদের সঙ্গে লড়াইয়ে নামতে হবে। হ্যারি বলল।
প্রয়োজনে লড়াই তো হবেই। তবে মিনের সৈন্যদের মাথায় থাকবে শিরস্ত্রাণ বুকে বর্ম। আমার বন্ধুদের সেসব থাকবে না। তাই লড়াইটা যদি হয় তা হলে আমাদের পক্ষে কঠিনই হবে। ফ্রান্সিস বলল।
গুহাপথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সবাই বাইরে এসে দাঁড়াল।
তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। মিনের ঘোড়া দাঁড়িয়েছিল। মিন সর্দারকে ডেকে কিছু বলল। তারপর ঘোড়ায় চড়ে ছোটাল সিউতার দিকে।
এবার সৈন্যরা ফ্রান্সিসদের চারদিক ঘিরে নিয়ে চলল। ছাড়া ছাড়া গাছের বনের মধ্যে দিয়ে সবাই চলল। হেঁটে যেতে সবচেয়ে কষ্ট হতে লাগল শাঙ্কোর। তখনও ওর পায়ের ঘা শুকোয়নি। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হচ্ছে ওকে।
ফ্রান্সিস সর্দারের কাছে এলো। সর্দার কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফ্রান্সিস ওর খাপ থেকে এক হঁচকা টানে তলোয়ারটা খুলে আনল। অমনই দু’তিনজন সৈন্য তলোয়ার খুলে ছুটে এলো। ফ্রান্সিস বাঁ হাতটা তুলে ওদের শান্ত থাকতে বলল। একটা লম্বা ডালওয়ালা গাছের কাছে গেল। তলোয়ারের এক কোপে একটা লম্বা ডাল কাটল। ডালটার পাতা হেঁটে শাঙ্কোকে দিল। শাঙ্কো ভর দেওয়ার মতো ডালটা পেয়ে খুশি হল। ডালে ভর দিয়ে হাঁটতে ওর কষ্ট কম হল। ফ্রান্সিস তলোয়ারটা সর্দারকে ফিরিয়ে দিল।
বন পার হওয়ার আগেই সন্ধে নামল। অন্ধকারে চলল ওরা। একটু পরেই গাছের ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো পড়ল ঘাসে ঢাকা মাটিতে।
বন শেষ হল। চাঁদের আলোয় দেখা গেল সিউতার বাড়িঘর। সর্দার ফ্রান্সিসদের নিয়ে এলো কয়েদঘরের সামনে। পাহারাদার ঢং ঢ্যাং শব্দ তুলে লোহার দরজা খুলল। ফ্রান্সিসদের প্রায় ধাক্কা দিয়ে ঘরে ঢুকিয়ে দিল। গাছের ডালে ভর দিয়ে চলা শাঙ্কো সেই ধাক্কায় প্রায় ছিটকে পড়ল মেঝেয় ওপর। সঙ্গে সঙ্গে ফ্রান্সিস পেছন ফিরে সৈন্যদের একজনকে জামা ধরে টেনে এনে ঘরে ঢোকাল। তখনও দরজা বন্ধ হয়নি। তিন-চারজন সৈন্য সঙ্গে সঙ্গে কোমর থেকে তলোয়ার খুলে ফ্রান্সিসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত হল। হ্যারি দু’হাত তুলে চেঁচিয়ে উঠল, ফ্রান্সিস, শান্ত হও। ফ্রান্সিস এক মুহূর্ত ভাবল। তারপরে সৈন্যটির জামা ছেড়ে দিল। ততক্ষণে শাঙ্কো উঠে দাঁড়িয়েছে। ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে ধরে ধরে ঘাসের বিছানায় বসিয়ে দিল। পাহারাদাররা ঠং শব্দ করে দরজা বন্ধ করল। তালা লাগল।
