খাওয়া সেরে ফ্রান্সিস ওই ঘরের মেঝেতেই শুয়ে পড়ল। চোখ বুজে ভাবতে লাগল এই দুর্গে কোথায় রানি তুহিনা তার অলঙ্কারের পেটিকা গোপনে লুকিয়ে রেখেছেন? মৃত্যুশয্যায় তিনি জিতার পূর্বপুরুষকেলকেটসহ রত্নহার দিয়েছিলেন। রানি নাকি রত্নহার দিয়ে বলেছিলেন, চিহ্ন দিলাম, বুদ্ধি খাটাস-অলঙ্কার–অমূল্য। ফ্রান্সিস ভাবল, রানির অলঙ্কারের পেটিকা নিশ্চয়ই এই দুর্গে কোথাও গোপনে রাখা হয়েছে।
ফ্রান্সিসের একটু তন্দ্রমতো এসেছিল। তন্দ্রা ভেঙ্গে গেল।ফ্রান্সিস উঠে বসল। তারপর কুডুলটা নিয়ে এলো যেখানে লম্বা গাছের ডাল দুটো রাখা হয়েছে সেখানে। লম্বা ডাল দুটো পাশাপাশি রাখল। এবার দুটো ডাল কেটে ছোটো ছোটো ফালি করল। তারপর ফালিগুলো লম্বা ডাল দুটোয় রেখে রেখে বুনো লতা দিয়ে বাঁধতে লাগল। শাঙ্কো, হ্যারি ফ্রান্সিসের কাছে এলো। হ্যারি বলল, মই বানাচ্ছ?
হ্যাঁ, তোমরাও হাত লাগাও। হ্যারিকে বলল। তিনজনে মিলে অল্পক্ষণের মধ্যেই একটা লম্বা মই বানিয়ে ফেলল।
ফ্রান্সিস এই ঘরটার চারদিকে তাকাল। আশ্চর্য! এই ঘরের কোনও দেওয়ালেই তিন পাপড়ির ফুল খোদাই করা নেই। ফ্রান্সিস মই কাঁধে নিল। কুড়ুলটা শাঙ্কো হাতে নিল। ফ্রান্সিস বলল, না,শাঙ্কো, তুমি বিশ্রাম করো। বেসি হাঁটাহাঁটি করলে আবার রক্ত পড়া শুরু হতে পারে। বরং হ্যারি আসুক।
ফ্রান্সিস মই কাঁধে চলল। পেছনে হ্যারি মশাল আর কুড়ুল হাতে চলল। একটা ঘরে ঢুকল। দেখল, পাথরের দেওয়ালে তিন পাপড়ির ফুল খোদাই করা ফ্রান্সিস সেই দেওয়ালে মই পাতল। তারপরে হ্যারির হাত থেকে কুড়ুলটা নিয়ে মই বেয়ে বেয়ে ফুলটার কাছে। চলে এলো। তিন পাপড়ির ফুলটা ভালোভাবে দেখল। বুঝল, আলাদা কোনও পাথরের পাটায় ফুলের নকশা কুঁদে তুলে এখানে বসানো হয়নি। পাথরের একবোখেবড়ো দেওয়ালেই কুঁদে নকশাটা তোলা হয়েছে।
এবার ফ্রান্সিস ফুলের নকশার ওপর কুড়ুল চালাল। বেশ কয়েকবার কুড়ুলের ঘা মারল নকশাটার ওপর। নাঃ, ফাঁপা শব্দ হচ্ছে না। বোঝা গেল, ফুলের নকশাটা কঠিন পাথরের দেওয়ালে কুঁদে কুঁদে তোলা হয়েছে। ফ্রান্সিসের কুড়ুলের ঘা খেয়ে নকাশার দুটো পপড়ি ভেঙে গেছে। ফ্রান্সিস ভাবল, নাঃ এখানে কঠিন পাথরের মধ্যে কোনও খোঁদল নেই। কাজেই এখানে রানি তুহিনার গুপ্ত সম্পদ নেই।
মই থেকে নেমে ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল, ভেবেছিলাম তিন ফুলের নকশা যেখানে খোদাই, রানি তুহিনার অলঙ্কারের পেটিকা সেখানে রাখা হয়েছে। দেখছিঅনুমান ভুল।
তা হলে অন্য ফুলের নকশা দেখে লাভ কী? হ্যারি বলল।
ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল, না, না, প্রত্যেকটি তিন ফুলের নকশায় ঘা মেরে দেখতে হবে। দু’জনে চলল অন্য ঘরে। ভাবে সবক’টা ঘরে যেখানে তিন ফুলের নকশা পেটিকার কুড়ুলের ঘা মেরে ফুলের নকশা। খোদাই করা আছে, সব কটাতেই কুড়ুলের ঘা মেরে ফ্রান্সিস বুঝল, কোনওটার পেছনের ফাপা খোঁদল নেই। কাজেই রানি তুহিনার অলঙ্কার পেটিকা ওসব জায়গায় নেই।
দু’জনে রানির শয়নকক্ষে ফিরে এলো। জিতা আর শাঙ্কো তখন বসে আছে। শাঙ্কো বলল, ফ্রান্সিস, কিছু হদিস করতে পারলে?
নাঃ। তবে সারা দুৰ্গটাই ভালোভাবে ঘুরে ঘুরে দেখতে হবে কোথায় খোদাই করা তিন ফুলের নকশা আছে! ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস মই, কুড়ুল রেখে মেঝেয় শুয়ে পড়ল। ক্লান্ত হ্যারি ওর পাশে বসল। ফ্রান্সিস চোখ বুজে ভাবতে লাগল রানি তুহিনা মৃত্যুর সময় বলেছিলেন, চিহ্ন দিলাম, বুদ্ধি খাটাস। চিহ্ন বলতে তো লকেটের চার পাপড়ির ফুলের নকশাটাই বোঝাচ্ছে। কিন্তু চিহ্ন হিসেবে পেলাম তিন পাপড়ির ফুলের নকশা। পাথুরে দেওয়াল কুঁদে তোলা ওই নকশাগুলোয় কুড়ুলের ঘা মেরে দেখেছি ওগুলোর পেছনে ফাপা কিছু নেই। অলঙ্কারের পেটিকা তো ওসব ফাঁপা জায়গায় থাকারই সম্ভাবনা বেশি।
জিতা হঠাৎ ধড়মড় করে উঠে বসল। ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল,কী হল জিতা? জিতা আস্তে আস্তে বলল, গুহাপথে এই দুর্গে কারা ঢুকেছে?
বলো কী! হ্যারি বলে উঠল।
হ্যাঁ, এই দুর্গে তো আমি অনেকদিন এসেছি, থেকেছি। রানি তুহিনার গুপ্ত অলঙ্কারের, ভাণ্ডারের খোঁজ করেছি। এই গুহার দুর্গে কোনও জায়গায় একটুশব্দ হলেই তো প্রতিধ্বনি হয় সারা দুর্গের পাথরের দেওয়ালে দেওয়ালে।
তুমি কি তেমন শব্দ পেয়েছ? ফ্রান্সিস বলল।
হ্যাঁ, তোমরাও কান পাতো, প্রতিধ্বনির শব্দ শুনতে পারবে। জিতা বলল।
ফ্রান্সিসরা কান পাতল। খুব ক্ষীণ শব্দ শুনল। পায়ে চলার শব্দ। ফ্রান্সিস বলল, শব্দ শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু কে বা কারা এখানে ঢুকল?
খুবই সহজ। জিতা বলল, যার কবজা থেকে তোমরা বুদ্ধি খাঁটিয়ে পালিয়েছ।
তার মানে মিন। হ্যারি বলল।
হ্যাঁ, ওর সৈন্যরাই আমাদের পিছু ধাওয়া করেছিল। জিতা বলল।
ফ্রান্সিস দ্রুত উঠে দাঁড়াল। বলল, আমাদের পালাতে হবে।
জিতা মাথা এপাশ-ওপাশ করে বলল, পালানোর কোনও উপায় নেই। এই দুর্গ। থেকে ঢোকার আর বেরনোর গুহাপথ একটাই। অন্য কোনও পথ নেই।
তা হলে তো আমাদের এখানেই অপেক্ষা করতে হয়। ফ্রান্সিস বলল।
ঠিক আছে। আমরা অপেক্ষা করব। হ্যারি বলল।
শাঙ্কো বলল, আচ্ছা জিতা, এখানে আত্মগোপন করে থাকা যায় এমন কোনও জায়গা নেই।জিতা মাথা নেড়ে বলল, না,সব ঘরের সঙ্গে গুহাপথের যোগ আছে।
