চারজন চুপচাপ গুহার মুখে বসে রইল।
এক সময় ফ্রান্সিস বলল, জিতা, অরেস পাহাড়ের দুর্গটা কতদূর?
জিতা বলল, আমরা সেই দুর্গের কাছাকাছি চলে এসেছি।
ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বলল, তা হলে দুর্গেই আমরা আশ্রয় নেব। আমার স্থির বিশ্বাস, রানি তুহিনার ধনরত্নের ভাণ্ডার ওই দুর্গেই কোথাও আছে।
বেশ চলো। জিতা উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস,শাঙ্কোও উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে ধরে ধরে গুহা থেকে মাটিতে নামিয়ে আনল। জিতা উত্তরমুখো হাঁটতে লাগল। পেছনে ফ্রান্সিস, শাঙ্কো আর হ্যারি চলল।
দুপুর নাগাদ ফ্রান্সিসরা অরেস পাহাড়ের নীচে এসে দাঁড়াল। পাহাড়টা খুব উঁচু নয়। জিতা কয়েকটা এবড়োখেবড়ো পাথরের ধাপমতো পার হয়ে একটা গুহার সামনে এলো। ফ্রান্সিস, হ্যারি আর শাঙ্কোও এসে দাঁড়াল। কিন্তু গুহার মুখটা গোল নয়, চৌকোণা মতো। জিতা তার মধ্যে ঢুকল। পেছনে পেছনে ফ্রান্সিসরাও ঢুকল। কিছুদূর এগোতেই অন্ধকার হয়ে গেল চারদিক। যেতে যেতে জিতা বলল, পরে মশাল আনতে হবে। এবার তোমরা একটুক্ষণ দাঁড়াও। অন্ধকারটা চোখে সয়ে আসতে দাও। তারপরে অস্পষ্ট হলেও সব দেখতে পাবে।
ফ্রান্সিসরা অন্ধকারে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। সত্যি, তারপরে ওরা দু’পাশের এবড়োখেবড়ো পাথরের দেওয়াল আবছা আবছা দেখতে পেল। জিতা বলল, এবার এগিয়ে চলো। কিছুটা এগোতেই দেখল ডাইনে-বাঁয়ে দুটো ঘরের মতো, চৌকোণো নয়, গোল। বাঁদিকের ঘরমতো জায়গায় জিতা ঢুকল। পেছনে ফ্রান্সিসরা। জিতা পেছন ফিরে বলল, দ্যাখো, গোলমতো দরজার ওপরে দেওয়ালে তিন পাপড়ির ফুল। ফ্রান্সিসও ফিরে তাকাল। আবছা দেখল, তিন পাপড়ির ফুল পাথরে কুঁদে তোলা। হুবহু লকেটের ফুলের মতো। শুধু একটা পাপড়ি নেই।
ওখানে থেকে বেরিয়ে এসে জিতা আবার গুহাপথে চলল। আবার ডাইনে-বাঁয়ে ঘরের মতো। সেই ঘরের মতো জায়গাটায় দরজার মাথায় দেখা গেল, সেই তিন পাপড়ির ফুল। এখানে গুহাপথ দু’পাশে চলে গেছে। সেইদিকে তাকিয়ে হ্যারি বলল, আশ্চর্য! প্রকৃতি নিজেই একটা দুর্গ তৈরি করেছে।
ওরা এখানে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। অসুস্থ জিতা, শাঙ্কো ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সুস্থ হ্যারি আর ফ্রান্সিসও ক্লান্ত তখন। ফ্রান্সিস বলল, জিতা, মেঝেয় ধুলো পাথরকুচি নেই এমন একটা জায়গায় নিয়ে চলো।
তিন পাপড়ির ফুল খোদাই করা অন্য ঘরগুলো দেখবে না? জিতা বলল।
সেসব পরে হবে। এখন আমরা সবাই ক্লান্ত। খাদ্য চাই, বিশ্রাম চাই। ফ্রান্সিস বলল।
তা হলে রানি তুহিনার শয়নকক্ষে চলো। জিতা বলল।
জিতা ডানদিকের গুহাপথ দিয়ে চলল। পেছন পেছন ফ্রান্সিসরাও চলল। কিছুদূর গিয়ে বাঁদিকে একটা ঘরের মতো দেখল। সেটায় ঢুকল সবাই। এই ঘরমতো জায়গায় মেঝেটা অনেকটা পরিষ্কার, মসৃণও। ফ্রান্সিস পাথরের মেঝেয় বসে পড়ল। জিতা আর শাঙ্কো মেঝেতেই শুয়ে পড়ল। হ্যারিও ক্লান্তিতে বসে পড়ল। জিতা টেনে টেনে বলল, লোকে বলে–এটা নাকি রানি তুহিনারশয়নকক্ষ ছিল। এই কক্ষেইনাকি রানি তুহিনার মৃত্যু হয়েছিল।অন্ধকারেইফ্রান্সিস ঘরটা ভালো করে দেখল।বু ঝল, মশাল বা মোমবাতি না হলে ঘরটা ভালোভাবে দেখা যাবে না।
বেশ কিছুক্ষণ সবাই শুয়ে-বসে বিশ্রাম করল। একসময় জিতা উঠে দাঁড়াল। বলল, এখন তোমরা কী করবে?
ফ্রান্সিস বলল, আমরা এখন দুর্গের মতো জায়গাটাতেই থাকব। বাইরে থাকলে মিনের সৈন্যদের নজরে পড়ে যেতে পারি। তা ছাড়া রানি তুহিনার গুপ্ত ভাণ্ডার তো এখানেই রয়েছে। তা তো খুঁজে বের করতে হবে। কাজেই কয়েকদিনের খাবারদাবার, জল, মশাল, চকমকি পাথর এসব তো লাগবে। দুটো কুড়ুলও আনতে হবে।
ঠিক বলেছ, জিতা বলল, কিন্তু এসব কিনতে তো মুদ্রা লাগবে। শাঙ্কো উঠে বসল। কোমরের ফেট্টিতে গোঁজা দুটো স্বর্ণমুদ্রা ফ্রান্সিসের দিকে এগিয়ে ধরল। মুদ্রা দুটো নিয়ে ফ্রান্সিস বলল, সাবাস শাঙ্কো।
ফ্রান্সিস আর জিতা ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। চলল গুহাপথ ধরে।
কাটা পায়ের যন্ত্রণা, ব্যথা নিয়ে শাঙ্কো শুয়ে রইল।হ্যারিশরীরের দিক থেকে বরাবরই দুর্বলক্লান্তিতে উত্তরদিকের দেওয়ালটায় ঠেস দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে রইল। এই দেওয়ালটা এবড়োখেবড়ো নয়। বেশ মসৃণ।
প্রায় তিন ঘণ্টা পরে ফ্রান্সিস আর জিতা ফিরে এলো। প্রয়োজনীয় সবই নিয়ে এসেছে ওরা। জিতা লতাপাতা এনেছিল। পাতা দাঁত দিয়ে চিবিয়ে ছিবড়ে করে শাঙ্কোর কাটা জায়গায় আর নিজের পিঠে লাগল। তারপর তিনটে পাথর পেতে উনুন করল। বয়ে আনা কাঠকুটো উনুনে ঢোকাল। চকমকি পাথর ঠুকে আগুন জ্বালাল। রান্না শুরু করল। পাথরের দেওয়ালের খাঁজে রাখা ছিল একটা নেভানো মশাল।
ফ্রান্সিস মশালটা নিয়ে উনুনের আগুন থেকে মশালটা জ্বেলে নিল। হ্যারিকে বলল, চলো কয়েকটা গাছের ডাল কেটে আনি। ফ্রান্সিস মশালটা হ্যারির হাতে দিল। নিজে কুডুলটা নিল।
গুহাপথ দিয়ে হেঁটে দু’জনে মুখের কাছে এলো। বাইরে তখন দুপুর। গুহামুখে পাথরের খাঁজে মশালটা গুঁজে রেখে দু’জনে বনের মধ্যে ঢুকল।
খুঁজে খুঁজে কয়েকটা লম্বা ডাল ফ্রান্সিস কুড়ুল দিয়ে কাটল। তারপর মোটা শুকনো আর কঁচা লতাগাছদড়ির মতো পাকিয়ে নিল। দু’জনে ডালগুলো লতাগাছ নিয়ে গুহার মুখে ফিরে এলো।
মাটিতে ঝরে পড়া কিছু গোল বড়ো পাতাও নিল হ্যারি। গুহামুখে এসে মশালটা নিল। তারপর সে গুহাপথ দিয়ে চলল। রানির শয়নকক্ষে এসে দেখল–মশাল জ্বলছে। রান্না হয়ে গেছে। হ্যারি যে শুকনো গোল গোল পাতাগুলো এনেছিল সেসব পেতে দিল। আরও কিছুপাতা রেখে দিল। সকলেইক্ষুধার্ত তখন।পাতায় দেওয়া হল আটার মোটা মোটা পোড়া রুটি আর বুনো আলু আর সেদ্ধকরা শাকসবৃজি। সকলেই পেটপুরে তাই খেল।
