এবার ফ্রান্সিস, হ্যারি আর শাঙ্কো ছুটে বাইরের বারান্দায় এলো। তারপর বারান্দা থেকে লাফিয়ে নেমে ছুটল পেছনের বনজঙ্গলের দিকে। ঠিক তখনই কয়েদঘরের পেছন থেকে ছুটে এলো দু’জন সৈন্য। একজনের হাতে খোলা তলোয়ার, অন্যজনের হাতে বর্শা। চাঁদের আলোয় সবই দেখা যাচ্ছে। বনের প্রথম গাছটার কাছাকাছি ফ্রান্সিসরা ছুটে এসেছে তখন। পেছনের সৈন্যটি বর্শা ছুঁড়ে মারল। বর্শাটা শাঙ্কোর বাঁ পায়ের হাঁটুতে লেগে পড়ে গেল। শাঙ্কো থমকে দাঁড়াল। দেখল হাঁটুর কাছে বেশ কিছু জায়গা কেটে গেছে। রক্ত পড়ছে। ফ্রান্সিস ছুটে এসে শাঙ্কোকে ধরল। শাঙ্কো খোঁড়াতে খোঁড়াতে বনের দিকে ছুটল। তলোয়ার হাতে সৈন্যটি ফ্রান্সিসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস দ্রুত সরে গেল। সৈন্যটা উবু হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। হাত থেকে তলোয়ার ছিটকে গেল। ফ্রান্সিস দ্রুত হাতে তলোয়ারটা তুলে নিল। সৈন্য দু’জনের সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য তৈরি হল। তখনই শাঙ্কো বলে উঠল, ফ্রান্সিস, আরও সৈন্য আসছে, পালাও।
ফ্রান্সিস চাঁদের আলোয় দেখল–খোলা তলোয়ার হাতে চার-পাঁচজন সৈন্য ঘাসের প্রান্তর দিয়ে ছুটে আসছে।
ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে পিছু ফিরল। তলোয়ার ফেলে দিয়ে শাঙ্কোর কাঁধে হাত দিয়ে নিয়ে চলল।জিতাও সুস্থ নয়। দু’জনকে প্রায় নিজের গায়ের সঙ্গে জড়িয়ে নিয়ে ফ্রান্সিস চলল। বনের মধ্যে ঢুকে পড়ল।
গভীর বন নয়। ছাড়া ছাড়া গাছপালা, ঝোপঝাড়, লতাপাতা। ফ্রান্সিস অনেক কষ্টে দু’জনকে ধরে ধরে নিয়ে ছুটতে লাগল। পেছনে সৈন্যদের হইহল্লা শোনা যাচ্ছে। সৈন্যদের সঙ্গে দূরত্ব কমে আসছে।
ফ্রান্সিস বুঝল, এই গতিতে ছুটলে সৈন্যরা কিছুক্ষণের মধ্যে ওদের ধরে ফেলবে। দৌড়োতেও অসুবিধা হচ্ছে। পায়ের গোড়ালি পচা পাতার স্কুপে ডুবে যাচ্ছে। ছাড়া ছাড়া গাছপালা। চাঁদের আলো পড়ছে এখানে-ওখানে। ফ্রান্সিস চারদিকে তাকাতে তাকাতে ছুটছে। পেছনে সৈন্যদের হইহল্লা কানে আসছে।
হঠাই ফ্রান্সিস দেখল ডানধারে কিছুদূরে একটা পাথরের টিলা। টিলার পেছনে আত্মগোপন করা যাবে। ফ্রান্সিস সেদিকেই ছুটল। টিলা ঘুরে ওপাশে গিয়ে দেখল, টিলায় একটা গুহামতো। গুহার মুখের কাছে এসে দেখল, গুহাটা খুব বড়ো নয়। তবে ওরা চারজন পরপর ঢুকে বসতে পারবে। ফ্রান্সিস তখন ভীষণ হাঁফাচ্ছে। হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, ছুটে পালাতে গেলে আমরা অল্পক্ষণের মধ্যেই ধরা পড়ে যাব। এই গুহায় আশ্রয় নিতে হবে। সাবধানে লুকিয়ে থাকতে হবে।
ফ্রান্সিস প্রথমে জিতাকে ধরে ধরে গুহায় ঢোকাল। জিতা তখন মুখ হাঁ করে শ্বাস নিচ্ছে। শাঙ্কো হাঁফাচ্ছে। ও নিজে নিজেই খোঁড়াতে খোঁড়াতে গুহায় ঢুকল। হ্যারিও ঢুকল। এবার ফ্রান্সিস ঢোকার আগে কান পাতল। সৈন্যদের হাঁকডাক খুব কাছেই শোনা যাচ্ছে। ফ্রান্সিস দাঁড়িয়েই রইল। শুনল সৈন্যদের চিৎকার। হাঁকডাক ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছে। ফ্রান্সিস স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।
ফ্রান্সিস গুহায় ঢুকে শুয়ে পড়ল। হ্যারি আর জিতা আগেই শুয়ে পড়েছে। শাঙ্কো বসে হাঁটুর কাটা জায়গাটা দেখছে। তখনও রক্ত পড়ছে।
জিতা চোখ বুজে টানা টানা সুরে বলল, তোমার কাটার ওষুধ–আমার পিঠের ঘা… সব চিকিৎসার ওষুধ… আমি জোগাড় করে… আনব… আমাকে একটু… বিশ্রাম করতে দাও।
পুব আকাশে লালচে রং ছড়ানো। একটু পরেই সূর্য উঠল। বনের গাছগাছলিতে নরম রোদ ছড়াল। পাখির ডাক শোনা গেল। গুহার মুখেও রোদ পড়ল। গুহাটার ধুলোটে মেঝেয় ফ্রান্সিসরা তখনও ঘুমোচ্ছে।
সকাল হল। পাখির ডাকাডাকিতে প্রথমে ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙ্গে গেল। ও উঠে বসল। শাঙ্কোও উঠল। পায়ের দিকে তাকাল। কাটা জায়গাটা থেকে আর রক্ত পড়ছে না। যে রক্ত পড়েছিল সেটাই জমে কালচে হয়ে আছে। জিতাও উঠে বসল। বলল, তোমরা অপেক্ষা করো। আমি ওষুধ, খাবার নিয়ে আসছি।
ফ্রান্সিস বলল, আমি সঙ্গে যাব?
না, না, এখন আমার শরীর অনেকটা ভালো লাগছে।
জিতা বলল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে গুহার মুখ থেকে আস্তে আস্তে নেমে এলো। বনের গাছগাছালির নীচে দিয়ে জিতা চলে গেল। ফ্রান্সিস, শাঙ্কো আর হ্যারি অপেক্ষা করলে লাগাল।
বেলা বাড়ল। জিতা ফিরে এলো। ওর কোমরে লতাপাতা জড়িয়ে বাঁধা। হাতে একটা তরমুজ।
গুহায় এসে জিতা বলল, এই বনের বাঁদিকে বালি এলাকা। স্থানীয় লোকরা সেখানে তরমুজের চাষ করে। একটা পাকা দেখে তরমুজ নিয়ে এলাম। আগে সবাই তরমুজ খেয়ে নাও।
শাঙ্কো জামার নীচে হাত ঢুকিয়ে ওর ছোরাটা বের করল। তরমুজ কেটে সবাইকে ভাগ করে দিল। ওরা তরমুজ খেতে লাগল। খওয়ার পালা চুকল। জিতা কোমরে জড়ানো লতাপাতা আস্তে আস্তে খুলল। তারপর শাঙ্কোকে তিনটে পাতা দিল। বলল, মুখে ভরে দাঁত দিয়ে চিবিয়ে ছিবড়ে করো। একটু তেতো লাগবে। শাঙ্কো পাতা তিনটে মুখে পুরল। দাঁত দিয়ে চিবোল। সত্যিই তেতো। চিবনো পাতার ছিবড়ে বের করল। জিতা সেটা নিয়ে শাঙ্কোর হাঁটুর কাটা জায়গাটায় আস্তে আস্তে টিপে টিপে লাগিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে কাটা জায়গাটায় যন্ত্রণা শুরু হল। শাঙ্কো মুখে শব্দ করল, উঃ।
একটু পরেই আরাম লাগবে। জিতা বলল। তারপর দুটো পাতা শাঙ্কোর কাটা জায়গায় আস্তে চেপে ধরে লতা দিয়ে বেঁধে দিল। একটু পরে সত্যিই শাঙ্কোর যন্ত্রণা কমে গেল। এবার জিতাও কয়েকটা পাতা চিবোল। বের করে ফ্রান্সিসকে দিল। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে সেই ছিবড়ে জিতার পিঠে চাবুকে কাটা জায়গাটা বসিয়ে দিল।
