ফ্রান্সিস বলল, মিন রত্নহারটা পেয়েছে বটে, কিন্তু রত্নহারের লকেটে যে নকশাটা রয়েছে সেটা কোনওদিনই বুঝবে না। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল, আচ্ছা হ্যারি, লকেটটায় কী নকশাটা ছিল বলো তো!
হ্যারি বলল, একটা ফুল। চারটে পাপড়ি। মাঝখানে একটা রক্তপ্রবাল। ফুলগুলো নীল রঙের মিনে করা। পেছনটা সবুজ।
ঠিক বলেছ। ফ্রান্সিস বলল, এই চার পাপড়িওয়ালা ফুলটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। চলো তো জিতার কাছে বসি গে। দু’জনে জিতার কাছে এসে বসল।
ফ্রান্সিস জিতাকে একটু ধাক্কা দিয়ে ডাকল, জিতা। জিতা মুখ তুলে ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। ফ্রান্সিস বলল,আচ্ছা জিতা–ওই লকেটে ঝোলানো রত্নহারটা পুরুষানুক্রমে তোমাদের গয়নাগাঁটির সঙ্গেই ছিল। তোমদের পূর্বপুরুষ কেউ কি ওই লকেটের নকশাটা নিয়ে রানি তুহিনার গুপ্ত রত্নভাণ্ডার খোঁজেনি।
জিতা মাথা নাড়ল, না। তবে আমি প্রায় কুড়ি বছর ধরে ওই ফুলের নকশাটা নিয়ে ভেবেছি। কিন্তু কোনও কূলকিনারা পাইনি। বছর কয়েক আগে অরেস পাহাড়ের মধ্যে যে দুর্গ আছে সেখানে দেখলাম দেওয়াল কুঁদে আঁকা হয়েছে লকেটের ফুলের মতো ফুল।
বলো কী! ফ্রান্সিস চমকে সোজা হয়ে বসল।
হ্যাঁ, দেখেছি সেই ফুলের নকশা, জিতা বলল, কিন্তু সেই নকশায় ফুলের পাপড়ি তিনটে। কিন্তু লকেটে আছে চারটে পাপড়ি।ফ্রান্সিস চুপ করে একটুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, আচ্ছা তুমি বলেছিলে রানি তুহিনার মৃত্যু হয়েছিল ওই দুর্গে।
হ্যাঁ, পুরুষানুক্রমে আমরা এটাই শুনে এসেছি। জিতা বলল।
আচ্ছা, অরেস পাহাড়ের দুর্গ কোথায়? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
এই কয়েদঘরের পেছনে যে বনজঙ্গল শুরু হয়েছে সেই বনজঙ্গলের মাঝবরাবর রয়েছে সেই দুর্গ। শুনে আশ্চর্য হবে সেই দুর্গ মানুষের হাতে গড়া নয়, প্রকৃতির খেয়ালে তৈরি। দেখলে বুঝবে। জিতা বলল।
হ্যারি বলল, অবাক কাণ্ড।ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলল, ফুলের রহস্যের সমাধান আছে ওই দুর্গেই।
তা হলে তো ওই দুর্গে যেতে হবে। হ্যারি বলল।
হ্যাঁ এবার এখান থেকে পালানোর উপায়টা ভাবতেহবে। ফ্রান্সিস বলল। তারপর ফ্রান্সিস গিয়ে ঘাসের বিছানায় শুয়ে পড়ল। ঘুমিয়ে পড়ল না। দুচোখ বুজে পালানোর পরিকল্পনা ছকতে লাগল।
তখন রাতের খাওয়াদাওয়া হয়ে গেছে। পাহারাদাররা তখন ঢঢং ঢং শব্দ তুলে দরজা বন্ধ করে বারান্দায় পাহারা দিতে শুরু করেছে।
রাত বাড়তে লাগল। একসময়ে ফ্রান্সিস বিছানা থেকে উঠল। লোহার দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দেখল দু’জন পাহারাদার বারান্দায় বসে আছে। ভাল করে চারদিক দেখে বুঝল আজ পাহারাদার দু’জনই। দূরে মিনের বাড়ির সামনে কিছু সৈন্যের জটলা।
ফ্রান্সিস ফিরে এসে জিতার কাছে এলো। ঠেলে জিতার ঘুম ভাঙাল। জিতা বলে উঠল, কী ব্যাপার? ফ্রান্সিস মুখে আঙুল ছোঁয়াল। বলল, আস্তে। যা বলছি তাই করো।
ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বলল, আমার সঙ্গে এসো। ফ্রান্সিস চলল ঘরের কোণার দিকে, যেখানে বাবার বন্দিরা ঘুমিয়ে আছে সেইদিকে। সেখানে এসে জিতাকে বলল, ওদের ঘুম ভাঙাও। সাবধান, কেউ যেন চেঁচামেচি না করে। তারপর আমি যা বলব তুমি আরবি ভাষায় ওদের বুঝিয়ে বলবে।
দু’জন বার্বার বন্দিদের ঠেলেঠুলে ঘুম ভাঙ্গাতে লাগল। ফ্রান্সিস জিতাকে বলল, বলো যে, কেউ যেন চেঁচামেচি না করে।
যাদের ঘুম ভেঙে গেল, উঠেও বসল কেউ কেউ। জিতা ফিসফিস করে তাদের বলতে লাগল, সবাই চুপ করে থাকে। কেউ কোনও কথা বোলো না।
এবার ফ্রান্সিস বলল, খাবার জলের পিপেগুলোনাও। ওই পুব কোণা থেকে বিছানায় জল ছিটিয়ে দাও। জল একবারে বেশি ঢেলে দেবে না। আমি বিছানার পুব দিকটাতে মশাল ছুঁড়ে ফেলে আগুন লাগাব।
জিতা কথাগুলো আরবি ভাষায় ওদের বুঝিয়ে বলল।
ফ্রান্সিস সবশেষে বলল, দরজা যখন খোলা পাবে। তখন যে যেদিকে খুশি পালিয়ে যেও।
জিতা সব বুঝিয়ে বলল।
বার্বার বন্দিদের তখন ঘুম ভেঙে গেছে। ওরা সব শুনল। তারপর ফ্রান্সিসের নির্দেশমতো জলের পিপেগুলো ধরাধরি করে নিয়ে এলো। ঘরে বিছানায় জল ছিটোতে লাগল। সব জল ছেটানো হল ফ্রান্সিস যেখানে মশাল জ্বলছে সেখানে এলো। মশালটা পাথরের খাঁজ থেকে তুলে নিয়ে পূর্ব দিকের কোণে ছুঁড়ে দিল। ঘাসের বিছানায় আগুন লাগল। কিন্তু আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠল না। ঘাস ভেজা থাকায় আগুনের চেয়ে ধোঁয়াই হল বেশি। সেই ধোঁয়ায় কয়েদঘর ঢেকে গেল।
এবার ফ্রান্সিস বলে উঠল, সবাই চেঁচিয়ে বলো, আগুন, আগুন। জিতা ফ্রান্সিসের কথাটা বলল।
সবাই চিৎকার করে বলে উঠল, আগুন, আগুন।
পাহারাদার দু’জন ছুটে দরজার কাছে এলো। ওরা ধোঁয়া দেখল। তেমন আগুন দেখল না। ভালোভাবে দেখার জন্য একজন পাহারাদার অন্যজনকে বলল, চল তো দেখি কী ব্যাপার।
দু’জন তালা খুলে দরজা দিয়ে ঢু। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে ডাকল, শাঙ্কো।
শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে একজন পাহারাদারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। অন্যটির ওপর ফ্রান্সিস। পাহারাদার দু’জনেই ঘাসের বিছানার ওপর চিত হয়ে পড়ে গেল। হাতের তলোয়ার ছিটকে গেল। ওদিকে খোলা দরজা দিয়ে বার্বাররা পালাতে শুরু করল।
কয়েদঘরের চিৎকার চেঁচামেচি মিনের বাড়ির সামনে সৈন্যদের কানে গেল। তারা তলোয়ার উঁচিয়ে বর্শা তুলে এদিকে আসতে লাগল। বাবাররা তখন এদিকে-ওদিক দিয়ে পালাচ্ছে। সৈন্যরা তাদের পিছু ধাওয়া করল।
