ঠিক আছে। ফ্রান্সিস দেখল হ্যারি আরশাঙ্কোর ঘুম ভেঙেছে। দু’জনে বসে আছে। ফ্রান্সিস আঙুল নেড়ে ইশারায় ওদের কাছে আসতে ডাকল।
হ্যারি আর শাঙ্কো ফ্রান্সিসের কাছে এসে বসল। ফ্রান্সিস চাপা গলায় বলল, আমার পাশে যে লোকটাকে দেখছ তার নাম জিতা। ও কোমরের ফেট্টি থেকে একটা লকেটসহ রত্নহার খুলে দেখাবে। সবাই ওকে ঘিরে বোসো।
তিনজনই এবার জিতাকে ঘিরে বসল। এবার জিতা কী করছে কয়েদঘরের কেউ দেখতে পাবে না। জিতা একটু ইতস্তত করল। বলল, রত্নহারটা তোমাদের দেখালে আমার কোনও বিপদ হবে না তো?
ফ্রাসিস বলল, কথা দিচ্ছি তোমার কোনও বিপদ হলে আমরা তোমাকে রক্ষা করব। দেরিক কেরো না, বেলা বাড়ছে।
এবার জিতা কোমরের ফেট্টির মধ্যে আঙুল চেপে বলল, এখানটায় আছে। কিন্তু সেলাই করা। সুতো কাটতে হবে। শাঙ্কো জামার গলার দিকে দিয়ে হাত ঢুকিয়ে ওর ছোরাটা বের করল। সুতো কেটে রত্নহারটা বের করা হল। ফ্রান্সিস রত্নহারটা বাঁ হাতের তোলায় রাখল।
রত্নহারটা দেখতে দেখতে ফ্রান্সিস বলল, হ্যারি, এই লকেটের নকশাটা ভালো। করে দেখে রাখো।
হ্যারি বলল,মিনে করা চারটে ফুলের পাপড়ি।নীল মিনে করা। মাঝখানে রক্তপ্রবাল।
ঢং ঢং, দরজা খোলার শব্দ হল। ফ্রান্সিস দ্রুত রত্নহারটা জিতার হাতে দিয়ে বলল, কোমরে গুঁজে রাখো।
পাহারাদাররা সকালের খাবার নিয়ে ঢুকল। গোল করে কাটা রুটি আর নানা সবজির ঝোলমতো। ফ্রান্সিসরা যখন খাচ্ছে তখনই সেই দলের সর্দার ফ্রান্সিসদের দিকে এগিয়ে এলো। বলল, খাওয়ার পর তোমাদের শাসক মিনের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে। জিতা তুমিও যাবে।
খাওয়া শেষ হল। সর্দার ইঙ্গিতে ফ্রান্সিসদের উঠে আসতে বলল। ফ্রান্সিসরা সর্দারের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজা খোলা হল। ফ্রান্সিসরা সর্দারের পেছনে পেছনে কয়েদঘর থেকে বেরিয়ে এলো। চলল সর্দারের পেছনে পেছনে। তখনই ফ্রান্সিস দেখল কয়েদঘরের পেছনে একটু দূর থেকেই বনজঙ্গল শুরু হয়েছে। তাই ভোরে পাখির ডাক শুনেছিল।
একটু পরেই ফ্রান্সিসরা পাথর বাঁধানো একটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। সর্দার ভেতরে ঢুকতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিসরা ভেতরে ঢুকল। দেখল একটা বড়ো কালো এই পাথরের টেবিল। টেবিলের ওপাশে একটা বাঁকা পায়াওয়ালা চেয়ারে বসে আছে মধ্যবয়স্ক একজন লোক। তার থুতনিতে অল্প দাড়ি। মাথায় বিড়েমতো সাদা কাপড়ের ঢাকা। চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। ঘরটা অন্ধকর অন্ধকার। মশাল জ্বলছে।
ফ্রান্সিস এসব দেখছে, ততক্ষণে সর্দার ফ্রান্সিসদের সম্পর্ক যা জানে সব বলে চলেছে। সর্দার থামল। মিন দু-একবার মাথা নেড়ে ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে স্পেনীয় ভাষায় বলল, তোমাদের কয়েদঘরে থাকতে হবে। আমার লোক যাবে। তোমাদের জাহাজ খানাতল্লাশি করা হবে। দেখা হবে তোমরা জলদস্যু লুঠেরার দল কিনা।
ফ্রান্সিস বলে উঠল, আমরা জলদস্যু, লুঠেরা নই। আমরা ভাইকিং জাতি। যারা শৌর্যে-বীর্যে আমাদের সঙ্গে পেরে ওঠে না তারাই আমাদের বদনাম দেয়।
ঠিক আছে তোমাদের কথা বিবেচনা করা হবে। মিন বলল।
জিতা এতক্ষণে চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। এবার জিতার দিকে তাকিয়ে মিন বলল, জিতা আর কত চাবুকের ঘা খাবে। চাবুক খেতে খেতে তুমি তো মরেই যাবে। যদি বাঁচতে চাও তো বলো লকেট ঝোলানো সেই রানি তুহিনার রত্নহারটা কোথায়? জিতা কোনও কথা বলল না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। মিন দরজার কাছে দাঁড়ানো এক রক্ষীকে ইঙ্গিত করল। রক্ষী চাবুক হাতে এগিয়ে এলো। মিনের ইঙ্গিতে জিতার গায়ে চাবুকের ঘা মারল। জিতার সমস্ত শরীর কেঁপে উঠল। জিতার মুখ থেকে গোঙানির শব্দ বেরিয়ে এলো। ফ্রান্সিস দু’হাত তুলে বলল, শাসক মিন দয়া করে চাবুক মারা বন্ধ করুন। আমি জানি সেই রত্নহার কোথায় আছে। মিন বেশ চমকে উঠল। বলল, তুমি কি করে জানলে? কোথায় সেই রত্নহার?
আপনাকে দেব সেই রত্নহার। কিন্তু তার আগে কথা দিন রত্নহার পেলে আপনি জিতাকে মুক্তি দেবেন। ফ্রান্সিস বলল।
সেসব পরে। আগে তো হারটা পাই। মিন বলল।
বেশ, ফ্রান্সিস বলল। তারপর জিতার কাছে গিয়ে বলল, জিতা, রত্নহারটা বেরকরো।
না। তুমি বিশ্বাসঘাতক। জিতা চেঁচিয়ে বলল।
ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল, আমাকে এখন যা খুশি বলতে পারো। কিন্তু হারটা দিয়ে দাও।জিতা কোমরের ফেট্টি থেকে হারটা বের করে ফ্রান্সিসকে দিল। ফ্রান্সিস হারটা উঁচু করে হাত তুলে মিনকে দেখিয়ে বলল, এই নিন রত্নহার, লকেট ঝোলানো।
মিন টেবিলের ওপাশ থেকে ছুটে এসে হারটা নিল। হারটা দেখতে দেখতে হা হা করে হাসতে লাগল।
ফ্রান্সিস বলল, আপনি বলেছিলেন হারটা পেলে জিতাকে মুক্তি দেবেন।
তোমাদের কাউকে মুক্তি দেওয়া হবে না। আগে রানি তুহিনার গুপ্ত সম্পদ উদ্ধার করি–তারপর ভাবা যাবে। একটু থেমে ডাকল–এই সর্দার।সর্দার এগিয়ে এলো। মিন বলল, যা, এগুলোকে কয়েদঘরে ঢুকিয়ে দে। সর্দার এগিয়ে এসে ফ্রান্সিসদের ইঙ্গিত করল।ফ্রান্সিসদের নিয়ে সর্দার কয়েকজন সৈন্যের সঙ্গে চলল কয়েদঘরের দিকে।
দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর হ্যারি ফ্রান্সিসকে বলল, ফ্রান্সিস, রত্নহারটা মিনকে দিয়ে দেওয়া কি ঠিক হল?
উপায় কী বলো। আর দিনদুয়েক চাবুক খেলেই জিতা মারা যেত। ফ্রান্সিস বলল।
হ্যারি জিতার দিকে তাকাল। দেখল জিতা দেওয়ালে পিঠ দিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছে। মাথাটা বুকের ওপর ঝুঁকে পড়েছে।
