হ্যারি আর শাঙ্কো ক্লান্তিতে বিছানায় বসেই শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস বসল। শুয়ে পড়োনা। ওর কানে পাখির ডাক ভেসে এলো। বাইরে ভোর হল বোধ হয়। সূর্য উঠতে দেরি নেই। তখনই ফ্রান্সিস মৃদু গোঙানির শব্দ শুনল। কে গোঙাচ্ছে? ফ্রান্সিস তাকাল সেইদিকে। দেখল একটা লোক। এখানকার লোকেদের মতো ঢোলা হাতা জোব্বামতো পরা। বিছানার বাইরে পাথরের দেওয়াল পিঠ দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে আছে। হাত দুটো ঝুলে পড়েছে। মাথা বুকের ওপর ঝুঁকে পড়েছে। একটু থেমে আবার গোঙাতে লাগল লোকটা।
ফ্রান্সিসের কেমন কৌতূহল হল। ভাবল কে লোকটা? এরকম গোঙাচ্ছে কেন? কে মেরেছে ওকে? ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে ঘাসের বিছানা থেকে নেমে লোকটার পাশে গিয়ে পাথরের দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসল। দেখল লোকটার গায়ে জামা বলে কিছু নেই। লোকটা গোঙানি থামিয়ে মুখ তুলে ফ্রান্সিসকে দেখল। ফ্রান্সিস দেখল লোকটার মুখ কঁচাপাকা দাড়ি-গোঁফ। মাথায় উড়ো-উড়ো কঁচাপাকা চুল। লোকটা এবার মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, নতুন আমদানি। আরবি ভাষা। ফ্রান্সিস বুঝল না। স্পেনীয় ভাষায় বলল, আমি আরবি ভাষা জানি না।
লোকটা এবার স্পেনীয় ভাষায় বলল, অল্পস্বল্প জানি।
ফ্রান্সিস বলল, তুমি গোঙাচ্ছ। তোমার কি শরীর খারাপ?
চাবুকের ঘা খেয়ে কি লোকের শরীর ভালো হয়? লোকটা বলল।
তো তো বটেই।ফ্রান্সিস বলল, কিন্তু তুমি তো ওই ঘাসের বিছানায় গিয়ে শুতেপারো।
লোকটা দেওয়াল থেকে আস্তে আস্তে পিঠটা তুলে বলল, আমার পিঠটা দ্যাখো। মশালের আলোয় লোকটার পিঠের অবস্থা দেখে ফ্রান্সিস চমকে উঠল। সারা পিঠে চাবুক মারার দাগ। দু-এক জায়গায় চাবুক কেটে বসে গেছে। রক্ত জমে আছে।
ফ্রান্সিস বুঝল পিঠে এরকম ঘা আর দাগ নিয়ে ঘাসের বিছনায় শোয়া অসম্ভব। ফ্রান্সিস বলল, তোমাকে কে এরকম নির্দয়ভাবে চাবুক মেরেছে! কেনই বা মেরেছে?
সে অনেক কথা? লোকটা আস্তে আস্তে বলল।
তোমার নাম কী? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
আমার নাম জিতা। লোকটা বলল।
এবার সব খুলে বলো তো। ফ্রান্সিস বলল।
কী হবে এসব শুনে! তুমিও তো আমার মতোই বন্দি। জিতা বলল।
আমি তোমাকে এই বন্দিজীবন থেকে মুক্তি দেব। ফ্রান্সিস বলল।
জিতা চমকে উঠে ফ্রান্সিসের মুখের দিকে ভালো করে তাকাল। বলল মিনের এই কয়েদঘর থেকে পালানো অসম্ভব!
ঠিক আছে, সেটা পরে ভাবা যাবে। ফ্রান্সিস বলল।
একটু থেমে বলল, এই মিন কে? আমাকে সব বলো। তোমার কোনও ভয় নেই। জিতা বলতে শুরু করল, প্রায় দুশো বছর আগের কথা। এই মেঘারিব-এ রাজত্ব করতেন এক বার্বার জাতির রানি তুহিনা। এক আরব দলনেতা বেনি এই দেশ আক্রমণ করল। একটু থেমে জিতা বলল, এবার আমাদের কথা বলি। আমরা জিতা পরিবার বংশানুক্রমে বৈদ্য চিকিৎসক। আর এক চিকিৎসক পরিবার এই সিউতাতে আছে। বেন্দিতো পরিবার। রানি তুহিনা যুদ্ধে ভীষণ আহত হলেন। সৈন্যরা তাকে নিয়ে যায় অয়েস পাহাড়ে রানির দুর্গে। সেই দুর্গে রানির চিকিৎসার জন্যে আমাদের পূর্বপুরুষ জিতাকে নিয়ে যাওয়া হয়। অন্য চিকিৎসক বেন্দ্ৰিতো পরিবারের পূর্বপুরুষকেও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। দু’জন বৈদ্যই রানির চিকিৎসা করেছিল। কিন্তু রানির তখন শেষ অবস্থা। মৃত্যুর আগে রানি তুহিনা সবাইকে ঘরের বাইরে যেতে বললেন। সবাই বেরিয়ে গেল। তখন রানি অতি কষ্টে গলা থেকে দুটো রত্নহার খুললেন। একটা দিলেন আমাদের পূর্বপুরুষকে, অন্যটা দিলেন বেন্দিরে পূর্বপুরুষকে। দুটো রত্নহারই দেখতে একরকম, শুধু একটা রত্নহারে লকেট আছে। সেটা আমাদের পূর্বপুরুষকে দিয়ে রানি অতিকষ্টে বলেছিলেন, চিহ্ন দিলাম, বুদ্ধি খাটান, অলঙ্কার অমূল্য।
বেন্দিতো পরিবারের পূর্বপুরুষকে কিছু বলার আগেই রানি তুহিনার মৃত্যু হয়। জিতা থামল তারপর বলল, সেই থেকে আমাদের পরিবারের সঙ্গে বেন্দিতো পরিবারেরে শত্রুতা। ওদের রত্নহারে লকেটটা ছিল না। তারপর বাবার, মুর, আরবীয় অনেকেই এখানে রাজত্ব করে গেছে। কেউ রানি তুহিনার অলঙ্কারের গোপন ভাণ্ডার উদ্ধারের চেষ্টা করেনি। এখন আরবি দলনেতা মিনকে আমাদের চিরশত্রু বেন্দিতো পরিবারের লোকেরা বুঝিয়েছে যে, রানি তুহিনার দেওয়া লকেটসহ রত্নহার আমাদের কাছে আছে। লকেটে গুপ্ত অলঙ্কার ভাণ্ডারের চিহ্ন আছে, যা দেখে সেই ভাণ্ডার উদ্ধার করা যাবে। জিতা থামল। একটু হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, এতসব তোমাকে বলে কী হবে?
ঠিক আছে। অনুমান থেকে আমি বলছি–ওই লকেটসহ রত্নহার কোথায়, মিন তোমার কাছ থেকে সব জানতে চেয়ে চাবুক মারছে। ফ্রান্সিস বলল। ঠিক তাই। মিন আমার বাবা-মা’র ওপরেও অত্যাচার করেছে। আমি কিছুতেই সেই লকেটসহ রত্নহার দেব না। জিতা থামল।
ফ্রান্সিস বলল, আমার শুধু একটাই প্রশ্ন, লকেটসহ রত্নহারটা এখন কোথায় আছে? সেটা জেনে তোমার কী লাভ? জিতা বলল।
ফ্রান্সিস হেসে বলল, আমি অনেক গুপ্তধন উদ্ধার করেছি। সব জানলে এটাও উদ্ধার করতে পারব।
জিতা কথাটা শুনে আগ্রহের সঙ্গে বলে উঠল, তুমি পারবে?
আগে সব জানি, শুনি, তারপর বলতে পারব। ফ্রান্সিস বলল।
জিতা একবার চারদিকে তাকিয়ে নিল। তখন সকাল হয়েছে। আগে যারা বন্দি ছিল তারা অনেকেই উঠে বসেছে। কেউ কেউ ওপরে দু’হাত উঠিয়ে হাই তুলছে। জিতা ফিসফিস করে বলল, রত্নহারটা আমার কোমরের ফোট্টিতে সেলাই করে রেখেছি।
