তীরের কাছে এসে ফ্রান্সিস দেখল, বন্দর, জাহাজ বেশ দূরে। কুয়াশার আস্তরণের মধ্যে দিয়ে অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
নৌকো তীরে লাগল। তিনজনে নৌকো থেকে নামল। তীরে এদিকটা ঢালু। তিনজনে ঠেলে নৌকোর অর্ধেকটা তীরে তুলে রাখল, যাতে ভেসে না যায়। ঢালু তীর দিয়ে ওরা উঠে এলো। দেখল, বিস্তৃত প্রান্তর। এদিকে বাড়িঘর নেই। বাড়িঘর সব বন্দরের দিকে। প্রান্তরের শেষে ঝোপজঙ্গল।ফ্রান্সিস বলল, চলো, ওই বন্দরের দিকে ওই বাড়িঘরের দিকে।
তিনজনে চলল। ঘাসে ঢাকা প্রন্তরে ফুটফুটে জ্যোৎস্না। হেঁটে চলল ওরা। বনজঙ্গলের কাছাকাছি আসতেই শুনল, অস্ত্রের ঝনঝন শব্দ। বনজঙ্গলের মধ্য থেকে চারজন সৈন্য খোলা তলোয়ার হাতে দ্রুত পায়ে ফ্রান্সিসদের সামনে এসে দাঁড়াল। জ্যোৎস্নায় দেখা গেল, ওদের মাথায় শিরস্ত্রাণ, গায়ে বর্ম, হাতে খোলা তলোয়ার। ফ্রান্সিস বুঝল, এরা আরবি সৈন্য। ফ্রান্সিসরা কিছু বোঝার আগেই সৈন্য চারজন ফ্রান্সিসদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস আর হ্যারি দ্রুত হাতে তলোয়ার খুলল। সৈন্যদের প্রথম আক্রমণটা ঠেকাল।
এবার শুরু হল তলোয়ারের লড়াই। শাঙ্কো তার আগেই কয়েক পা পেছনে সরে এলো।
ফ্রান্সিস তলোয়ার চালাতে চালাতে বলল, শাঙ্কো, মেরো না,আহত করো। শাঙ্কো ততক্ষণে ধনুকে তিরে পরিয়েছে। হ্যারির সঙ্গে লড়াই করছে যে সৈন্যটা, শাঙ্কো তাকেই নিশানা করল। হ্যারির শরীর দুর্বল।ও বেশিক্ষণ লড়তে পারবে না। শাঙ্কো তির ছুড়ল। সৈন্যটার ডান হাতে তিরটা বিধে গেল। তলোয়ারফেলে সৈন্যটি মাটিতে বসে পড়ল। ফ্রান্সিস তখন তিনজন সৈন্যের সঙ্গে লড়াই করছে। ফ্রান্সিসদের মাথায় শিরস্ত্রাণ নেই, গায়ে বর্মও নেই। শুধু মনের জোরে ফ্রান্সিস লড়াই করতে লাগল। ততক্ষণে শাঙ্কো আরও একটা তির ছুঁড়ছে। তিরটা লাগল যুদ্ধরত এক সৈন্যের পায়ে। সৈন্যটি মাটির ওপর বসে পড়ল। বাকি দু’জনের একজনকে ফ্রান্সিস এবার ঘায়েল করল। তলোয়ারের কোপে তারা হাত কেটে গেল। রক্ত পড়তে লাগল। তখন দু’জন সৈন্য গলা ছেড়ে চিৎকার করে কী বলে উঠল। আরবি ভাষা। ফ্রান্সিসরা কিছুই বুঝল না।
ফ্রান্সিস দেখল, বনজঙ্গলের দিক থেকে প্রায় পনেরো-বিশজন সৈন্য ছুটে আসছে। ফ্রান্সিস লড়াই থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। হাঁফাতে লাগল। সৈন্যটিও আর ফ্রান্সিসকে আক্রমণ করল না। মুখ হাঁ করে শ্বাস নিতে লাগল।
সেই সৈন্যরা ছুটে এসে ফ্রান্সিসদের ঘিরে দাঁড়াল। তাদের মধ্যে একজন সর্দার গোছের সৈন্য ফ্রান্সিসদের কাছে এসে বলল, তোমরা কারা? ফ্রান্সিসরা কিছুই বুঝল না।
হ্যারি স্পেনীয় ভাষায় বলল, স্পেনীয় ভাষায় বলুন।
সেই সৈন্যটি এবার ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্পেনীয় ভাষায় বলল, তোমাদের পরিচয় কী? তোমরা কেখেকে এসেছ?।
হ্যারি বলল, আমরা ভাইকিং। অনেক দূরে আমাদের দেশ।
সে তো তোমাদের দেখে, পোশাক দেশে বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু তোমরা আমাদের সৈন্যদের মারলে কেন?
ফ্রান্সিস বলল, আপনার সৈন্যরা এসেই আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। আত্মরক্ষার জন্যেই আমাদের লড়তে হয়েছে। নইলে এখানে তাদের মৃতদেহ পড়ে থাকত।
তোমাদের বার্বারদের গুপ্তচর ভেবেই আমাদের সৈন্যরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সর্দারটি বলল।
বাবার কারা আমরা জানি না। হ্যারি বলল।
যাকগে, সর্দারটি বলল, আমাদের তিনজন সৈন্যকে তোমরা আহত করেছ। তোমাদের বন্দী করা হল।
আমরা আক্রান্ত হয়েই আক্রমণ করেছি। হ্যারি বলল।
এসব কালকে আমাদের শন্ত মিনকে বোলো। তিনি বিচার করে যা হুকুম দেবেন তাই আমাদের মানতে হবে। সর্দরটি বলল। তারপর হাত তুলে বন্দরের দিকটা দেখিয়ে বলল, চলো সব। ফ্রান্সিসদের নিয়ে সব সৈন্য চলল।
যেতে যেতে হ্যারি সেই সর্দারকে জিজ্ঞেস করল, এটা কি কোনও দ্বীপ না দেশ।
সর্দার বলল, দ্বীপ নয়, এটা উত্তর আফ্রিকা। আমাদের ভাষায় নাম আলমেঘারি। বার্বাররা এই দেশকে আলজিরিয়া বলে।
এই বন্দর শহরের নাম কী? শাঙ্কো বলল।
সিউতা, সর্দারটি বলল।
সিউতার পথে নামল সবাই। চলল পুবমুখো।দুপাশে বাড়িঘরদোরে কোথাও আলো নেই। সবাই ঘুমিয়ে। অন্ধকার পথে ওরা চলল।
একটা লম্বাটে পাথরে তৈরি ঘরের সামনে এসে সর্দার দাঁড়াল। ফ্রান্সিস দেখেই বুঝল এই ঘরটাই কয়েদঘর। ঘরটার লোহার দরজার দু’পাশে মশাল জ্বলছে। সেই আলোয় দেখা গেল দু’জন পাহারাদার সৈন্য খোলা তলোয়ার হাতে পাহারা দিচ্ছে। সর্দারটি এগিয়ে গেল। পাহারাদারদের কী বলল। একজন পাহারাদার কোমরে ঝোলানো চাবির থোকা থেকে একটা চাবি বের করল। তালা খুলল। ঢঢং-ঢন শব্দ তুলে লোহার দরজাটা খুলে দিল। সর্দারটি ফ্রান্সিসদের ঘরে ঢোকার ইঙ্গিত করল।ওর মাথা নিচু করে কয়েদঘরে ঢুকল। আবার শব্দ তুলে লোহার দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। ভেতরে দুটো মশাল জ্বলছে। সেই আলোতে ফ্রান্সিস দেখল ঘরটা লম্বামতো। কয়েদঘরে যেমন হয় এই ঘরটাও তেমনই। ছাদটা কাঠ আর শুকনো লম্বা লম্বা ঘাসে তৈরি। অনেক ওপরে দুটো জানলা। জানলায় শিক বলে কিছু নেই। খোদল বললেই হয়। মেঝেয় দড়িদড়া দিয়ে শুকনো ঘাস বেঁধে বিছানা করা। তাতে একপাশে আট-দশজন লোক শুয়ে ঘুমোচ্ছে। দরজা খোলার শব্দে দু-একজনের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। তারা ফ্রান্সিসদের দেখতে লাগল। ফ্রান্সিস দেখল, আগের বন্দিদের হাত বাঁধা নয়। ও নিশ্চিন্ত হল যে, ওদেরও হাত বাঁধা হবে না।
