ফ্রান্সিসদের সৌভাগ্য বলতে হবে। কিছুক্ষণ পরেই বৃষ্টি কমে এলো। তারপর থেমে গেল। বাতাসের বেগও কমতে লাগল। আকাশে ধোঁয়ার মতো কালো মেঘ উত্তরমুখো উড়ে যেতে লাগল। তারপরেই আকাশে আর মেঘ নেই। ফুলের মতো তারা ফুটতে লাগল। আধভাঙ্গা চাঁদ থেকে আলো সমুদ্রের জলে ছড়িয়ে পড়ল।
এতক্ষণ ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করে ভাইকিংরা অবসন্ন হল। সসপে ভেজা পোশাক গায়ে তারা ডেক-এ বসে রইল কয়েকজন। বাকিরা ডেক-এ শুয়ে রইল। জলে ভেজা পোশাক গায়ে ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে জাহাজ চালক ফ্লেজারের কাছে এলো। বলল, ফ্লেজার, আমাদের দিক ভুল হয়নি ত?
ঝোড়ো বাতাস আর ঢেউয়ের ধাক্কায় দিক ঠিক রাখতে পারিনি। একবার এদিকে আর একবার ওদিকে জাহাজটা যেন ছিটকে পড়েছে। দিকটিক সব গুলিয়ে গেছে। ফ্লেজার বলল।
তা হলে এখন কী করবে? ফ্রান্সিস বলল।
জাহাজ যে মুখো চলছে চলুক। দ্বীপ বা দেশ যাই তোক সেখানে পৌঁছতে হবে। তবেই দেখেশুনে দিক ঠিক করতে পারবে। ফ্লেজার বলল।
বেশ জাহাজ চলুক দেখা যাক কোনও দ্বীপ বা দেশে পৌঁছনো যায় কিনা। ফ্রান্সিস বলল। তারপর কেবিনঘরে যাবে বলে সিঁড়ির কাছে এসে দাঁড়াল।
হ্যারি এগিয়ে এলো। সঙ্গে আরও কয়েকজন ভাইকিং বন্ধু। হ্যারি বলল, এখন কী করবে?
ফ্লেজারের সঙ্গে যা কথা হল সেসব ফ্রান্সিস বলল। তারপর বলল, এখন আমাদের কিছুই করবার নেই। জাহাজ যেমন চলেছে চলুক।
সন্ধে হল। নজরদার পেড্রো মাস্তুলের মাথায় ওর বসার জায়গায় বসে আছে। চারদিকে নজর রাখছে কোনওদিকে ডাঙা দেখা যায় কিনা। আবার নজর রাখছে। জলদস্যুদের জাহাজ আসছে কিনা তার দিকেও।
রাত হল। চাঁদের আলো সমুদ্রে ছড়াল। সমুদ্র বেশ দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। সাদাটে কুয়াশা নেমে এলো। অবশ্য বেশি দূর পর্যন্ত দেখা যায় নি। কুয়াশার অস্পষ্টতার মধ্যে দিয়েও পেড্রোর নজরে পড়ল ডাঙা। ও চিৎকার করে বলে উঠল, ডাঙা, ডাঙা দেখা যাচ্ছে। কথাটা কানে যেতেই ডেক-এ ওপর যারা শুয়ে বসে ছিল তারা উঠে দাঁড়াল। জাহাজের রেলিঙের কাছে এসে দাঁড়াল। ডাঙা তখন অনেকটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।সমুদ্রের ধারে কোনও টিলা বা ছোটো পাহাড় নেই। সমতলভূমি সমুদ্র থেকে উঠে গেছে। দুটো জাহাজ নোঙর করে আছে দেখা গেল।
ততক্ষণে ফ্রান্সিস হ্যারি ডেক-এ উঠে এসেছে। সঙ্গে মারিয়া। হ্যারি জাহাজ দুটো দেখতে দেখতে বলল, একটা যুদ্ধজাহাজ, অন্যটা মালবাহী জাহাজ।
ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বলল, কী করবে এখন?
ফ্রান্সিস বলল, ফ্লেজারকে জাহাজ থামাতে বলো। একজন ভাইকিং-বন্ধু ফ্লেজারকে সে-কথা বলতে গেল।
ডেক-এ জড়ো হওয়া বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে ফ্রান্সিস বলল, ভাইসব, আমরা ওই জাহাজঘাটায় এখন জাহাজ ভেড়াব না। অচেনা অজানা জায়গা। সব আগে দেখেশুনে তারপর যা করবার করব। এখন জাহাজ এখানেই নোঙর করো। পরে ভাবব কী করা যায়।
ততক্ষণে জাহাজ থেমে গেছে। ঘরঘর শব্দে নোঙর ফেলা হল। থেমে থাকা জাহাজ ঢেউয়ের ধাক্কায় দোল খেতে লাগল। হ্যারি বলল, ডাঙায় জাহাজ না ভেড়ালেও কোথায় এলাম তা তো জানতে হবে।
ফ্রান্সিস বলল এজন্যেই রাত একটু বাড়লে তুমি, শাঙ্কো আর আমি আমাদের নৌকোয় চড়ে ওখানে যাব। লোকজনদের জিজ্ঞেস করে জানব, এই জায়গাটা কি কোনও দ্বীপ না দেশ। এটা জানতে পারলে আমাদের দেশ কতদূর সেটা বুঝতে পারব। এবার চলো রাতের খাওয়া খেয়ে নিই।
মারিয়া বলল, এখানে কারা থাকে, কী রকম মানুষ তারা, সেসব তো তোমরা কিছুই জানো না।
ফ্রান্সিস বলল, উপায় নেই, এই ঝুঁকিটুকু নিতেই হবে।
ফ্রান্সিসরা রাতের খাওয়া একটু আগেই খেয়ে নিল। ফ্রান্সিস হ্যারি আর শাঙ্কোকে বলল, তোমরা এখন শুয়ে বিশ্রাম করে নাও। আমি সময়মতো তোমাদের ডাকব।
রাত বাড়তে লাগল।তখন মধ্যরাত্রি। ফ্রান্সিস বিছানা ছেড়ে উঠল। কোমরের ফেট্টিটা ভালো করে বাঁধল। তলোয়ার ঝোলাল। মোমের আলোয় দেখল মারিয়া উঠে বসেছে। ফ্রান্সিস বলল, তুমি রাত জেগে না। ঘুমিয়ে পড়ো।
মারিয়া ম্লান হেসে বলল, তোমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশ বিভুইয়ে যাচ্ছে, আর আমি নিশ্চিতে ঘুমোবে, এটা কি হয়?
ফ্রান্সিস বলল,যাতে বিপদে না পড়ি তার জন্যে যথাসাধ্য চেষ্টা করব। তুমি এসব নিয়ে ভেবো না।
ফ্রান্সিস তৈরি হয়ে কেবিনঘর থেকে বেরিয়ে এলো। চলল হ্যারি আর শাঙ্কোকে ডাকতে। হ্যারি তলোয়ার নিল। শাঙ্কো নিল তীরধনুকী। তিনজনে জাহাজের ডেকে উঠে এল। সমুদ্রে থেকে একটা ঠাণ্ডা বাতাস ছুটে এসে ওদের গায়ে লাগল।
ফ্রান্সিসের শরীরটা একটু কেঁপে উঠল। অত রাতেও বেশ কয়েকজন ভাইকিং বন্ধু। ফ্রান্সিসদের দিকে এগিয়ে এলো হালের কাছে দড়ির মই বেয়ে হ্যারি আর শাঙ্কো ছোটো নৌকোটায় নেমে এলো। ফ্রান্সিস নামবার আগে বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল, কোনও ভয় নেই, আমরা নিরাপদেই ফিরে আসব। এখন থেকে ফ্লেজারের কথামতোই তোমরা চলবে।
ফ্রান্সিস নৌকোয় নেমে দাঁড় তুলে নিল। শাঙ্কো জাহাজে বাঁধা নৌকোর দড়িটা খুলে দিল। একটা পাক খেল নৌকোটা। ফ্রান্সিস ডাঙার দিকে লক্ষ্য রেখে দাঁড় বাইতে লাগল।
চাঁদের আলো বেশ। সমুদ্রে ঢেউয়ের মাথায় সেই আলো নাচছে। নৌকো চলেছে। তীরের দিকে। সমুদ্রে কখনও কুয়াশা জমছে, কখনও জোর হাওয়া কুয়াশা উড়িয়ে দিচ্ছে।
