শাঙ্কো উঠে এলো। মিনারের মুখে বসল। ফ্রান্সিস বলল কষ্টিপাথর ভেঙেছে। এখন বাকি দুটো পাথর সহজেই বের করা যাবে।
এবার ফ্রান্সিস দড়ি ধরে ঝুলে কষ্টিপাথরটায় কটা কুড়ুলের ঘা মারতেই কষ্টিপাথর ভেঙে পড়ে গেল। ফ্রান্সিস তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকাল। দেখল একটা দড়ি। দড়িটা রুপোর সুতোর কাজ করা। ফ্রান্সিস দড়িটা ধরে টানল। কিন্তু দড়িটা বেরিয়ে এলো না। ওটার পরেই শ্বেতপাথরের পাটা। ফ্রান্সিস সেটায় কুড়লের ঘা মারতে লাগল। শ্বেতপাথরটা মাঝামাঝি ভেঙে পড়ে গেল। দেখা গেল একটা বড়ো চামড়ার থলির মুখ।
ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলল–সম্রাট মাতিসের গুপ্ত কোষাগার আমাদের সামনে। ফ্রান্সিসের কাথাটা টাওয়ারের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হল। নীচে দাঁড়ানো লোকেদের কানেও গেল রাজাও শুনলেন। মারিয়া রাজার পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিল। মারিয়া হেসে দুহাত তুলে বলে উঠল–ফ্রান্সিস। ফ্রান্সিস শ্বেতপাথরের বাকি অংশটা ভেঙে ফেলল। বডোক্লান্ত লাগছে। ফ্রান্সিস বলল–শাঙ্কো হলদেটে পাথরটা ভাঙো। ফ্রান্সিস মিনারের মুখটায় উঠে বসল। শাঙ্কো দড়ি ধরল। পা দিয়ে দড়িটা জড়িয়ে হলদেটে পাথরটায় কুড়লের ঘা মারতে লাগল। সেটাও ভেঙে গেল। দেখা গেল একটা সুদৃশ্য চামড়ার বড়ো থলি। মুখটা দড়ি দিয়ে বাঁধা। ফ্রান্সিস থলেটা ধরে জোরে হাঁচকা টান দিল। হলদেটে পাথরের বাকিটা ভেঙে পড়ে গেল। শাঙ্কো বলে উঠল–সাবাস ফ্রান্সিস। দুজনে ধ্বনি তুলল–ও-হো-হো। নীচে মারিয়াও ধ্বনি তুলল- ও-হো-হো।
ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো টাওয়ারের মাথায় বসল। ফ্রান্সিস থলেটার দড়ি আলগা করে হাত ঢোকাল। একমুঠো তুলে আনল মণিমুক্তো হীরের টুকরো। বিকেলের নিস্তেজ আলোতে সব ঝিকিয়ে উঠল।
ফ্রন্সিস সব থলেতে রেখে দিল। বলল–শাঙ্কো চলো নামি।
দুজনে দড়ি ধরে ধরে নেমে এলো।
চামড়ার থলেহাতে ফ্রন্সিস নেমে আসতেই হ্যারি হাসতে হাসতে ছুটে এসে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল। হ্যারি আর শাঙ্কো ধ্বনি তুলল–ও-হো-হো।
ফ্রান্সিস রাজা ফার্নান্দোর দিকে এগিয়ে গেল। থলিটা রাজকে দিল। রাজা মুখ বাঁধা দড়িটা খুলে থলিটার মুখ খুলল। ভেতরে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনলেন একমুঠো মণিমাণিক্য। সেগুলো রোদ লেগে ঝিকঝিক করতে লাগল।
রাজা এবার ফ্রন্সিসকে বললেন–তোমরাই সম্রাট মাতিসের রাজকোষ উদ্ধার করেছে। বল–তোমরা কী চাও?
ফ্রান্সিস হেসে বলল–মান্যবর রাজা–আমরা কিছুই চাইনা। শুধু বলি–আপনার প্রজাদের কল্যাণে এই ধনসম্পদ ব্যয় করুন। এটাই আমাদের অনুরোধ।
ফ্রান্সিসরা রাজা ফার্নান্দোর কাছ থেকে বিদায় নিল। চলল হুয়েনভা বন্দরের দিকে যেখানে ওদের বন্ধুরা আর ওদের জাহাজ আছে।
রত্নহার উদ্ধারে ফ্রান্সিস
ফ্রান্সিসদের জাহাজ চলেছে ওদের দেশের দিকে। ফ্রান্সিসের ভাইকিং বন্ধুরা খুব খুশি। আকাশে মেঘ নেই। জোর বাতাস বইছে। ভাইকিংরা সব পাল খুলে দিয়েছে। বেগবান বাতাসে পালগুলো যেন বেলুনের মতো ফুলে উঠেছে। খুব দ্রুত গতিতে জাহাজ ঢেউ ভেঙ্গে চলেছে। এখন আর দাঁড় বাইতে হচ্ছে না। ভাইকিংরা জাহাজের এখানে-ওখানে দল বেঁধে বসেছে। ছক্কা-পাঞ্জা খেলছে। গল্পগুজব করছে। বেশিরভাগই দেশের কথা। দেশের আত্মীয়স্বজন অবাক হয়ে শুনবে ওদের এই অভিযানের বিচিত্র কাহিনী। এসব নিয়েই কথা হচ্ছে।
তখন বিকেল হয়েছে। সূর্য অস্ত যায়নি। পশ্চিম আকাশে তখন সূর্য অনেকটাই ঢলে পড়েছে। হঠাৎই মাস্তুলের মাথা থেকে নজরদার পেড্রোর চিৎকার করে বলা কথাটা শোনা গেল। ভাইসব, সাবধান। ঝড় আসছে। পেড্রো দড়িদড়া ধরে দ্রুত মাস্তুল বেয়ে নামতে লাগল। বিস্কো ছুটল ফ্রান্সিসকে খবর দিতে।
একটু পরেই ফ্রান্সিস ডেক এ উঠে এলো। পেড্রো ফ্রন্সিসের কাছে এলো। পেড্রো তখনও হাঁফাচ্ছে। হাঁফাতেহাঁফাতে বলল, ফ্রান্সিস, ঝড় আসছে। ওপর থেকে দেখলাম দক্ষিণ দিকে কালো মেঘ জমেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝড় উঠবে।
পেড্রো জাহাজের অভিজ্ঞ নজরদার। ওর অনুমান ঠিকই হবে। ঝড় আসার আর একটা লক্ষণও দেখা গেল। বাতাস পড়ে গেছে। পালগুলো নেতিয়ে পড়েছে।
ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল, ভাইসব, ঝড় আসছে। ডেক-এ এসে নিজের জায়গা নাও। পাল নামিয়ে ফেলো। ঝড়ের মোকাবিলা করতে সবাই তৈরি হও।
ভাইকিংরা ডেক-এ কিছুটা অন্তর অন্তর পালের খুঁটির দড়িদড়া ধরল। ঝড়ের সময় দাঁড় বেয়ে কোনও লাভ নেই। তাই দাঁড় ঘরে কেউ গেল না। ডেক-এ তৈরি হয়ে দাঁড়াল।
ফ্রান্সিস জাহাজ চালক ফ্লেজারের কাছে এলো। বলল, ঝড়ের মেঘ উঠেছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝড় আসবে তুমি তৈরি তো?
ফ্লেজার বলল, হুইল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আমি দিকে ঠিক রাখতে চেষ্টা করব। ঝড়ের ধাক্কায় জানি না কতটা সফল হব।
ফ্রান্সিস বলল, এটা ভূমধ্যসাগর এলাকা। এখানে কয়েকবার ঝড়ের মুখে পড়েছি। দেখেছি এখানে প্রচণ্ড ঝড় হয় না। তবু তৈরি হও। দিক ঠিক রাখো।
দু’জনে যখন কথা বলছে তখনই হঠাৎ বাতাস বইতে শুরু করল। গুমোট ভাবটা আর রইল না। বাতাসের জোর বাড়তে লাগল। ঘন কালো মেঘ দক্ষিণের আকাশ থেকে মধ্য আকাশের দিকে উঠে আসতে লাগল। পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢাকা পড়ে গেল। অন্ধকার নেমে এলো। কালো মেঘের মধ্যে শুরু হল আঁকাবাঁকা বিদ্যুৎ ঝলসে ওঠা। সেই সঙ্গে বাজ পড়ার প্রচণ্ড শব্দ। সমুদ্রের জলে বড়ো বড়ো ঢেউ তুলে ঝড় ছুটে এলো। ঝাঁপিয়ে পড়ল ফ্রান্সিসদের জাহাজের ওপর। ঝড়ের ধাক্কায় ফ্রান্সিসদের জাহাজ বেগে দুলতে লাগল। ঝোড়ো বাতাসে জলের ঢেউ ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল ডেক-এ। ভাইকিংরা দড়িদড়া টেনে ধরে জাহাজকে সোজা রাখার চেষ্টা করতে লাগল। অল্প অল্প বৃষ্টির পর এখন শুরু হল মুষলধারে বৃষ্টি পড়া। জাহাজ কখনও ঢেউয়ের মাথায় উঠে পড়তে লাগল। তারপরেই দুই ঢেউয়ের মধ্যে নীচে নেমে আসতে লাগল। জাহাজের এই ওঠাপড়ার সঙ্গে ভাইকিংবা জাহাজকে সোজা রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল।
