মিস্ত্রি চলল টাওয়ারের কাছে অনেকটা উঁচু চেস্টাট গাছটার দিকে। ডাল কেটে এনে গুলতির মতো লাঠির মাথায় লাগিয়ে দিল।
এমন সময় দেখা গেল চারজন সৈন্য একটা দড়ির কুণ্ডুলি নিয়ে আসছে। সেটা জিরাল্ডা টাওয়ারের নীচে রাখা হল।
দুপুরের খাওয়া সেরে ফ্রান্সিসরা টাওয়ারে নীচে এলো। মারিয়াও অন্দরমহল থেকে এলো। ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে বলল–শোনো–আমি গাছটার মগ ডালে উঠি। তোমরা আমাকে লাঠিটা দেবে। লাঠিটার মাথায় গুলতি মতো জায়গায় দড়ির একটা মুখ আটকে দেবে। আর দড়ির মাথায় পাথরের ছোটো চাঙ বেঁধে দেবে। আমি গাছে উঠছি?
ফ্রান্সিস চেস্টনাট গাছের কাণ্ড ধরে ধরে উঠল। তারপর খুব সহজেই ডাল ধরে ধরে একেবারে মগডালে উঠে এলো। এবার নীচে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলল শাঙ্কো, দড়ির একটা মুখ দাও।
শাঙ্কো তৈরি ছিল। লাঠির মাথায় গুলতির মুখটাতে দড়ির একটা মুখ আটকাল। তারপর হ্যারি আর মারিয়ার সাহায্যে লাঠিটা গাছের মগডাল পর্যন্ত তুলল। ফ্রান্সিস হাত বাড়িয়ে লাটিঠা ধরল। দড়ি পরানো অবস্থায় ও লাঠিটা টাওয়ারের মাথার কাছে তুলল। তারপর একটা ঝাঁকুনি দিতেই লাঠির মাথা থেকে দড়িবাঁধা পাথরের চারটা টাওয়ারের মধ্যে পাথরের দেওয়ালে ঘা খেয়ে নীচে পড়ে গেল। টাওয়ারে গম্ভীর শব্দ উঠল। ঢং-ঢং।
ফ্রান্সিস চেস্টনাট গাছ থেকে নেমে এলো।টাওয়ারের মধ্যে ঢুকল।দড়ি বাঁধা পাথরটা পড়ে আছে। হ্যারিরা এগিয়ে এলো। হ্যারি হেসে বলে উঠল-সাবাস্ ফ্রান্সিস। মারিয়া হেসে বলল–তোমার মাথায় এতও আসে।
এবার ফ্রান্সিস দড়ির মুখ থেকে পাথরের চাঙরটা খুলে ফেলল। তারপর দড়িটা টানতে লাগল। একসময় টাওয়ারের মাথা থেকে চেস্টাট গাছ পর্যন্ত দড়িটা টানটান হয়ে গেল। ফ্রান্সিস দড়ি ধরে টান দিল বার কয়েক। দেখা গেল চেস্টনাট গাছের কাণ্ড বাঁধা দড়িটা টাওয়ারের মুখ দিয়ে নেমে বেশ শক্ত হল টান টান হয়ে আছে।
ফ্রান্সিস এবার দড়ি টেনে ধরে উঠতে লাগল। টাওয়ারের দেয়ালের গায়ে সারা জানালার মতো চৌকোণো ফোকর আছে মাঝে মাঝে। চৌকোণা ফোকর গরাদ নেই। ওগুলো থেকে কিছু আলো টাওয়ারের ভেতরে আসছে। তবু টাওয়ারের ভেতরের অন্ধকার কাটে নি।
ফ্রান্সিস উঠতে লাগল।
ওদিকে রোমান সম্রাট মাতিসের গুপ্ত কোষাগার একজন বিদেশি উদ্ধার করার চেষ্টা করছে–এই খবর রটে গেল। দলে দলে লোকজন এসে টাওয়ারের নীচে দাঁড়াল। ততক্ষণে রাজা ফার্নান্দোও এসেছেন। প্রাসাদ থেকে একটা আবলুস কাঠের আসন নিয়ে আসা হল। রাজা ফার্নান্দো বসলেন তাতে। দুজন অমাত্য রাজাসনের দুপাশে দাঁড়িয়ে রইল।
ফ্রান্সিস টাওয়ারে আস্তে আস্তে উঠে ওপরে উঠে পড়ল। টাওয়ারের মাথায় বসে দড়িটা ধরে থাকল। নীচের দর্শকরা মহা উৎসাহে হাততালি দিল। এবার আসল কাজ। ফ্রান্সিস টাওয়ারের মুখটায় উঠে দাঁড়াল। দেখল পাথরের গোল মুখটা। সিঁড়িগুলো ভেঙে ফেলেও কোষাগার পাওয়া যায় নি। তাহলে কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে। রাজকোষ? ফ্রান্সিস তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখতে লাগল গোল মুখটা। দেখল ওপরে একটা পাথরের ধাপ আছে। সম্রাট মাতিস এখানে কোথাও রাজকোষ লুকিয়ে রেখেছেন। এ সিঁড়িগুলো ভেঙে ফেলেও কোথাও রাজকোষ পাওয়া যায় নি। ফ্রান্সিস পাথরের ধাপটা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। অল্প আলোতেও ফ্রান্সিস হঠাৎ দেখল পাথরের ধাপটায় তিন রঙের তিনটি পাথরের পাটা কালো কাঞ্চিপাথর, শ্বেতপাথর আর হলদেটে রঙের পাথরের তিনটি পাটা। মিনারে যদি নকশা করার উদ্দেশ্য হত তাহলে বাইরের দিকে করা হত। ভেতরের নকশা কে দেখতে আসবে?
ফ্রান্সিস তিন রঙের পাথরের পাটায় হাত বুলোল। বুঝল এই পাথর তিনটি পরে গাঁথা হয়েছে। আগের তিনটি পাথর খুলে ফেলে সেখানে এই তিনরঙা পাথরের পাটা গেঁথে রাখা হয়েছে। জোড়ে মেলে নি। তাই তিনটি পাথরই একটু বেরিয়ে আছে। এই তিনটি পাথর খুলতে পারলে সম্রাটের গুপ্ত ধনভাণ্ডার দেখা যাবে। এখানে ছাড়া অন্য কোথাও গুপ্ত রাজকোষ রাখা হয়নি।
এবার তিনটি পাথর খুলে ফেলতে হবে। নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে রোমান সম্রাট মাতিসের গুপ্ত রাজকোষ। ফ্রান্সিস টাওয়ারের মাথায় বসল। কোনোরকম হাত বাড়িয়ে কষ্টিপাথরটা টানল। কয়েকবার হ্যাঁচকা টান দিতে পাথরটা একটু নড়ল। ওরকম শুধু টানাটানি করে ঐ তিনটি পাথর খুলে ফেলা যাবে না।
নীচের দিকে মুখ নামিয়ে ফ্রান্সিস ডাকল–শাঙ্কো–ও–ও। ডাকের শব্দটা টাওয়ারের দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হল। শাঙ্কো নীচে থেকে বলল–বল–শুনছি।
ফ্রান্সিস কথাটা শুনতে পেল। বলল–একটা কুড়ুল নিয়ে এখানে উঠে এসো।
একটু পরেই একটা কুড়ল কোমরে গুঁজে দড়ি বেয়ে বেয়ে শাঙ্কো উঠে এলো। শাঙ্কোর হাত থেকে ফ্রান্সিস কুড়ুলটা নিল। দড়ি ধরে ঝুলে পড়ল। দড়িতে দুপা জড়িয়ে একটু আলগা হয়ে কষ্টিপাথরে কুড়ুলের ঘা মারল। কুড়ুলের ঘায়ে মিনারেশব্দ উঠল– গম–গম্।
ফ্রান্সিস আরো কয়েকবার ঘা মারলো। কষ্টিপাথরটা ভাঙল না।ক্লান্ত ফ্রান্সিস বলল– শাঙ্কো কুড়ুলটা নাও। মনে হচ্ছে কষ্টিপাথরটা ভাঙা যাবে না। ঠিক খাঁজে খাঁজে মারো। শাঙ্কো কুড়ল নিল। দড়িতে পা জড়িয়ে ভারসাম্য রেখে কষ্টিপাথরটার খাঁজে খাঁজে কুড়ুলের ঘা মারতে লাগল। কষ্টিপাথরটার একটা কোণা ভেঙে পড়ল। আরো কটা ঘা মারতে কষ্টিপাথরের অর্ধেকটা ভেঙে পড়ে গেল। খোঁদল হল। খোঁদলের মধ্যে দেখা গেল রুপোর সুতোয় প্যাচানো একটি দড়ি। শাঙ্কো হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–ফ্রান্সিস একটা দড়িমতো দেখা যাচ্ছে। তুমি উঠে এসো। আমি দেখছি। ফ্রান্সিস বলল।
