–বেশ। তারপর? রাজা বললেন।
–এই রাজপ্রাসাদেই একটা ঘর আমাদের চারবন্ধুকে দিতে হবে। এতে আমাদের কাজ করার সুবিধে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
বেশ তোমাদের থাকবার ঘর দেওয়া হবে। রাজা বললেন।
–আমাদের সঙ্গে আছেন আমাদের দেশের রাজকুমারী। তাকে অন্দরমহলে থাকতে দিতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
-বেশ। তিনি অন্দরমহলেই থাকবেন। রাজা বললেন।
ফ্রান্সিসরা রাজসভা থেকে বেরিয়ে আসছে তখনই দেখল একটু দূরে মারিয়া দাঁড়িয়ে আছে। সঙ্গে একজন পরিচারিকা। ফ্রান্সিস মারিয়ার কাছে গেল। মারিয়া মাথা নেড়ে বললনা, না আমি তোমাদের সঙ্গেই থাকবো।
–তা হয় না মারিয়া। তার চেয়ে তুমি যখন খুশি আমাদের ঘরে এসো। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে। কথাটা বলে মারিয়া পরিচারিকাটির সঙ্গে চলে গেল।
প্রাসাদের বাইরে আসতে একজন রাজসভায় প্রহরী পেতলের বর্শা হাতে ওদের কাছে এলো।
চলুন–আপনাদের ঘরে পৌঁছে দিচ্ছি।
দ্বারীর সঙ্গে ওরা চলল। প্রাসাদের দক্ষিণ কোণায় প্রহরী একটা তালাবন্ধ ঘরের তালা হল! ফ্রান্সিসরা ঘরে ঢুকল। পাথর আর কাঠ দিয়ে ঘরটা তৈরি। ঘরটা বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন! মেঝেয় কাঠের বড়ো তক্তার ওপর বিছানাপত্র পাতা। ফ্রান্সিস ঘরে ঢুকেই হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। হ্যারি প্রহরীকে বলল–খাবার সময় আমাদের ডেকো। প্রহরীটি মাথা ওঠানামা করে চলে গেল।
এবার হ্যারিও বসল। শাঙ্কো ঘরে আস্তে আস্তে পায়চারি করতে লাগল।হ্যারি বলল– ফ্রান্সিস তোমার কি মনে হয়? রোমান সম্রাট মাতিসের রাজকোষ ঐ জিরাল্ডা টাওয়ারেই আছে? ফ্রান্সিস শুয়ে শুয়েই বলল–নিশ্চয় আছে। সেই গভীর রাতে সম্রাট ঐ টাওয়ারে গিয়েছিলেন কোষাগার গোপনে লুকিয়ে রাখার জন্য। খাতিবের প্রপিতামহকে আর একজন মিস্ত্রিকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। লক্ষ্য করো সম্রাট মাতিস অন্য কাউকে নিয়ে যান নি। নিয়ে গেলেন দুজন অভিজ্ঞ রাজ মিস্ত্রিকে। কাজেই ঐ টাওয়ারের কোথাও রাজকোষ লুকোবার জায়গা ওদের দিয়ে করিয়ে নিয়ে রাজকোষ লুকিয়ে রেখেছিলেন।
হ্যারি বলল–কিন্তু ঐ টাওয়ারের সব সিঁড়িই তো ভেঙে ফেলা হয়েছে। উঠবে কী করে?
–হ্যারি, বেশি ভাবতে পারছি না। ভীষণ খিদে পেয়েছে। ফ্রান্সিস চোখ বুজে বলল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন প্রাসাদরক্ষী ফ্রান্সিসদের খেতে ডাকল। প্রাসাদরক্ষী ফ্রান্সিসদের প্রাসাদের খাবার ঘরেই নিয়ে এলো। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ঘর। টেবিলে ফিকে নীল রঙের কাপড়ের ঢাকনা। প্লেট ছুরি কাঁটা চামচ ঝকঝক করছে। তখনই মারিয়া ঢুকল। বলল–আমি বলেছি যে দিনের বেলার খাবার আমি তোমাদের সঙ্গে খাবো। খেতে বসে মারিয়ার মনে পড়ল ওদের প্রাসাদের খাবার ঘরের কথা। মারিয়ার মন খারাপ হয়ে গেল। ও গম্ভীর মুখ খেতে লাগল। পাশেই খেতে খেতে ফ্রান্সিস বুঝল সেটা কিছু বলল না।
হঠাৎ মারিয়া ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ফ্রান্সিস মারিয়ার দিকে তাকাল। মারিয়া তখন হাতের উল্টো পিঠে চাখ মুছছে। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল–মারিয়া আমাদের জীবনটাই এমনি। কখনও বারোয়ারি অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ কখনও কয়েদখানার নোংরা পরিবেশ কখনও এইরকম সাজানো গোছানো সুন্দর ঝকঝকে পরিবেশ। আমাদের জীবনে দুটোই সত্যি। একটু চুপ করে থেকে ফ্রান্সিস বলল–কেঁদো না। আমার মন দুর্বল করে দিও না। মারিয়া চোখের জল মুছতে মুছতে হাসল। বলল–আর কাঁদবো না।
খেয়েদেয়ে ফ্রান্সিসরা ঘরে ফিরল। মারিয়া অন্দরমহলে চলে গেল। ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। বলল–অনেকদিন এত সুস্বাদু খাবার খাই নি। হ্যারি বলল–ভালো খাবারের স্বাদই ভুলে গিয়েছিলাম। হ্যারি আর শাঙ্কো বসল।
হঠাৎ ফ্রান্সিস উঠে বসল। বলল–বলেছিলাম না পেটপুরে খেলেই আমার বুদ্ধি খুলবে।
হ্যারি হেসে বলল–তোমার বুদ্ধি কী বলছে?
ফ্রান্সিস হেসে বলল-বুদ্ধি বলছে এখনও তোমার ভাবনার শেষ হয় নি। আরো ভাবো।
ওরা যখন কথাবার্তা বলছে তখনই সেই প্রহরীটি এলো। বলল–সেনাপতিমশাই আমাকে পাঠিয়েছেন। আপনাদের কোনও অসুবিধে হচ্ছে কি না জানতে।
ফ্রান্সিস বলল গিয়ে বলল যে আমাদের খুবই অসুবিধে হচ্ছে। উনি যেন একবার আসেন। প্রহরীটি চলে গেল।
একটু পরে সেনাপতি বেশ ব্যস্ত হয়ে এলো। বলল–আপনাদের কী অসুবিধে হচ্ছে।
–বিশেষ কিছু না। আমাদের এবার দুটো জিনিস চাই। বেশ লম্বা একগাছা কাছি নয় তো দড়ি। শক্ত দড়ি। ধরে ওঠানামা করা যায় এমনি। অন্যটা হল একটা বড় লাঠি মতো। এটা কাঠের টুকরোয় জোড় দিয়ে করা যায়। ফ্রান্সিস বলল।
–কাছি বা দড়ি দেখছি পাওয়া যায় কিনা। তবে লাঠির মতো যেটা করতে বলছেন। সেটা আমাদের কাঠের মিস্ত্রিকে বলুন সে তৈরি করে দেবে। আর কিছু? সেনাপতি বলল।
–না শুধু এই। ফ্রান্সিস বলল।
সেনাপতি চলে গেল।
একটু পরে কাঠের মিস্ত্রি এলো।
ফ্রান্সিস তাকে বলল–তুমি তো ঐ জিরাল্ডা মিনারটা দেখেছে।
-হা ও তো ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছি। মিস্ত্রি হেসে বলল।
–ঐ মিনারের ঠিক মাঝমাঝি পর্যন্ত ওঠে এরকম একটা লাঠি তৈরি করতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
মিস্ত্রি একটু ভেবে নিয়ে বলল–তা করা যাবে।
–তাহলে আজকেই লেগে পড়ো কাল দুপুর নাগাদ ওটা আমার চাই। ফ্রান্সিস বলল।
পরদিন দুপুর নাগাদ মিস্ত্রি এলো। বলল দেখে যান কাঠের লাঠিটা ঠিক বানানো হল কিনা। ফ্রান্সিসরা ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। দেখল লম্বা কাঠ জোড়া দিয়ে দিয়ে বেশ বড়ো একটা কাঠের লাঠি মিস্ত্রি তৈরি করে প্রাসাদের চত্বরে রেখেছে। ফ্রান্সিস দেখল। টাওয়ার আর তার কাছেই চেস্টনাট গাছের উচ্চতাটা হিসেব করল। বলল ঠিক আছে।তারপরলাঠিটারমাথা দেখিয়ে মিস্ত্রিকে বলল–ঐ চেস্টাট গাছটা থেকে গুলতির মতো জোড়া ডাল কেটে আন। তারপর সেটাকে লাঠির মাথায় পেরেক দিয়ে ঠুকে গুলতির মতো কাটা ডালটা লাগিয়ে দাও।
