কী করা যাবে আলাদা রাখার হুকুম না হলে তো যায় না।
কী যে বলেন–আপনার হুকুম কি কিছু কম? মহামান্য–আপনি শুধু পাহারাদারকে বলুন রাজকুমারীকে রাজা ফার্নান্দোর অন্দরমহলে রেখে আসতেওরা শুনতে বাধ্য। আপনাকে ওরা যমের মতো ভয় করে। সেনাপতি দাঁত বের করে হাসল। বলল– তা করে।
তবে আর ভাবছেন কেন? শাঙ্কো বলল।
–না ভাবছি রাজা যদি জানেন—
শুধু তো একটা রাত। কালকেই তো তোমার হুকুম জানা যাবে। শাঙ্কো বলল।
-তা বটে-এক রাতের জন্যে-সেনাপতি কথাটা শেষ করল।
–তাই তো বলছি–আপনার ক্ষমতা কিকিছুকম?শাঙ্কো বলল। সেনাপতি খ্যাক খ্যাক করে হেসে উঠল। বলল–দেখছি।
শাঙ্কো মারিয়ার ইশারায় কয়েদঘরে ঢুকতে মানা করল। মারিয়া কয়েদঘরে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রইল।
সেনাপতি রাজপ্রাসাদের দিকে চলল। সঙ্গে কয়েকজন সৈন্য।
কিছু পরে দুজন সৈন্য এলো। মারিয়াকে বলল আপনিই তো রাজকুমারী।
–হ্যাঁ। মারিয়া মাথা ওঠানামা করল।
–আমাদের সঙ্গে আসুন। আপনি প্রাসাদের অন্দরমহলে থাকবেন। মারিয়া মাথা। নেড়ে বলল–না আমি এখানেই থাকবো।
ফ্রান্সিসরা দরজা ধরে কয়েকজন দাঁড়িয়ে ছিল। ফ্রান্সিস মারিয়ার কথা শুনল। বলে উঠল–মারিয়া পাগলামি করো না। এই পরিবেশে এক রাত থাকলেই তুমি অসুস্থ হয়ে পড়বে। শাঙ্কো বলল- আমাদের জন্যে ভাববেন না। এসবে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আপনি অন্তঃপুরে যান।
মারিয়া আর কিছু বলল না। সৈন্য দুজনের সঙ্গে একটা ঘাসে-ঢাকা প্রান্তর দিয়ে রাজপ্রাসাদের দিকে চলে গেল।
কয়েদঘরে ফ্রান্সিস দেয়ালে হেলান দিয়ে বসল। হ্যারি শাঙ্কো আলখাতিব দুপাশে বসে আছে। আলখাতিব বলল–ভাগ্যিস আগের শুটকো সেনাপতিটা মারা গেছে, নইলে আমাকে ঠিক চিনতো। আমার বিপদ বাড়তো।
তখনই বিস্কো ফ্রান্সিসের কাছে উঠে এলো।মৃদুস্বরে বলল–আপনি এভাবে বন্দীদশা মেনে নেওয়াতে কিছু বন্ধু মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছে।
–এটা তো ভালো কথা নয়।কথাটা বলে ফ্রান্সিস উঠেদাঁড়াল। গলা চড়িয়ে বলল ভাই সব–আমি অযথা রক্তপাত মৃত্যু থেকে তোমাদের বাঁচাবার জন্যেই ধরা দিয়েছি। ওদের দুজাহাজ বোঝাই সৈন্য। এদিকে আমরা কজন মাত্র। লড়াইয়ে নামলে আমরা শুকনো পাতার মতো উড়ে যেতাম। আমি সবদিক ভেবেই এই বন্দীদশা মেনে নিয়েছি। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল কালকে রাজা ফার্নান্দোর দরবারে যাচ্ছি। অর্থ সম্পদের লোভ রাজা গরিব সবারই সমান। বরং রাজাদের এই লোভ আরো বেশি। দেখা যাক কাল কী হয়।
পরদিন ফ্রান্সিসরাসকালের খাবার খাচ্ছেতখন সেনাপতি এলো। বলল–খেয়েটেয়ে চলো রাজসভায় তবে এতজনকে যেতে হবেনা। তোমাদের শুধুদলপতি গেলেই চলবে।
–আমি একা যাবো না–দুজন বন্ধুকেই নিয়ে যাবো। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে। তাই যেও। সেনাপতি বলল।
ফ্রান্সিস হ্যারি আরশাঙ্কো রাজসভা ঘরে গিয়ে পৌঁছল। ঘরটা একটু অন্ধকার মতো। দেয়ালে আটকানো মশাল জ্বলছে। আর একটা বিচার চলছিল। রাজা ফার্নান্দো একটা কাঠের সিংহাসনে বসে আছেন। সিংহাসনের গদীটা নীল ভেলভেটের কাপড়ে ঢাকা। রাজা ফার্নান্দোর বেশ বয়েস হয়েছে। মাথার পাকা চুলের ওপর সবুজ মিনে করা মুক্তো বসানো সোনার মুকুট। মুখে পাকা দাড়ি গোঁফ।
তখন একটা বিচার চলছিল। বিচার শেষ হল। যে দু’জন বিচার চাইতে এসেছিল তাদের একজন হাতের উল্টেপিঠে চোখের জল মুছতে মুছতে গেল। অন্যজন হাসছিল। সে কয়েকজন সঙ্গীর সঙ্গে সভাঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
এবার সেনাপতি ফ্রান্সিসদের এগিয়ে আসতে ইশারা করল। ফ্রান্সিসরা এগিয়ে এসে মাথা একটু নিচু করে রাজাকে সম্মান জানিয়ে দাঁড়াল। সেনাপতি বলতে লাগল কী করে সে ফ্রান্সিসদের বন্দী করেছে।
ওদের কী বলে আপনার সন্দেহ হয়? রাজা সেনাপতিকে জিজ্ঞেস করলেন।
–ওরা ভাইকিং ভাই কিংবা জলদস্যু। ওদের জাহাজে তল্লাশী চালালে অনেক সোনাদানা চুনীপান্না পাওয়া যাবে। সেনাপতি বলল। এবার ফ্রান্সিস বলল–মহামান্য রাজা ইচ্ছে করলে সেনাপতিমশাই আমাদের জাহাজে তল্লাশী চালাতে পারেন। কিন্তু শুধু সন্দেহ করে আমাদের বন্দী করতে পারেন না।
–সেটা পরে দেখছি। এখন কয়েদঘরে থাকতে হবে। রাজা বললেন।
এবার ফ্রান্সিস আলখাতিবকে ফিফিস্ করে বলল–এগিয়ে যাও। কোনো ভয় নেই।
আলখাতিব রাজসিংহাসনের দিকে একটু এগিয়ে গেল। আলখাতিব রাজার নজরে পড়ল রাজ গলা চড়িয়ে বললেন–কি নিজে থেকেই ধরা দিতে এসেছো?
আলখাতিব কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর মাথা তুলে বলল মাননীয় রাজা–আমি যা জেনেছিলাম যা শুনেছিলাম সবই আপনাকে বলেছি।
-না-না-তুই মিথ্যে কথা বলেছিস। তুই সব জানি। রাজা বললেন।
এবার ফ্রান্সিস এগিয়ে এলো। মাথা নিচু করে সম্মান জানিয়ে বলল–মান্যবর রাজা! আমরা জাতিতে ভাইকিং। আমরা বেশ পরিশ্রম করে বুদ্ধি খাঁটিয়ে নানা গুপ্তধন সম্পদ উদ্ধার করেছি। রাজা ফার্নান্দো সাগ্রহে বললেন–সত্যি! তোমরা কি রোমান সম্রাট মাতসের গুপ্ত রাজকোষ উদ্ধার করতে পারবে?
-সব কিছু দেখে শুনে খোঁজখবর করে তবে বলতে পারবো। সেই ধনভাণ্ডার উদ্ধার করতে পারবো কি না। ফ্রান্সিস বলল।
বেশ দ্যাখো চেষ্টা করে। রাজা বললেন।
এবার কয়েকটা অনুরোধ। আমার বন্ধুরা কয়েদঘরে বন্দী। তাদের মুক্তি দিতে হবে। ওরা আমাদের জাহাজে ফিরে যাবে।
