সভা ভঙ্গ হল। ভাইকিং বন্ধুরা কেউ কেউ নিজেদের কেবিনঘরে ফিরে গেল। কেউ কেউ ডেক-এ শুয়ে বসে রইল।
কেবিনঘরে ফিরে মারিয়া বলল–তুমি কি দেশে ফিরতে চাও?
না চাই না। এভাবে দেশে দেশে দ্বীপে দ্বীপে ঘুরে জীবনটা কাটাতে চাই।
–আমি তা চাইনা। মারিয়া বলল।ফ্রান্সিস মনে ব্যথা পেল।বলল–মারিয়া, তুমি যদি দেশে ফিরে যেতে চাও আমি তার ব্যবস্থা করে দেব।
মারিয়া ফুঁপিয়ে উঠল। বলল–আমার ভুল হয়েছে আমাকে মাফ করো। আমি ফিরে যাবো না। তুমি যেখানে যাবে আমিও সেখানে যাবো। ফ্রান্সিস হাসল। বলল
ঘরের বাইরের জীবন আমাদের অনেক কিছু শেখায়। হিংসা দ্বেষ থেকে মুক্তি দেয় আমাদের। যাকগে–তুমি যদি সেভিলে যেতে চাও যেতে পারো।
–হ্যাঁ আমি যাবো। মারিয়া বলল।
–বেশ। ফ্রান্সিস বলল।
পরদিন সকালে জলখাবার খেয়ে ফ্লেজার জাহাজ ছাড়ার জন্যে তৈরি হল। গুটানো পাল সব খুলে দেওয়া হল।হওয়া উদ্দাম। পালগুলো ফুলে উঠল। জোরগতিতে জাহাজ মাঝ সমুদ্রের দিকে চলল।
বিকেল নাগাদ ফ্রান্সিসদের জাহাজ হুয়েনভা বন্দর শহরের কাছে এলো। ফ্রান্সিস হ্যারি জাহাজের রেলিং ধরে জাহাজঘাটের দিকে তাকিয়েছিল। জাহাজঘাটায় রাজা ফার্নান্দোর দুটো যুদ্ধজাহাজ নোঙর করে আছে।
হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস জাহাজঘাটে জাহাজ নিয়ে যাওয়াটা ঠিক হবে না। আমরা রাজা ফার্নান্দোর বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। এখন আমরা বাঘের মুখে।
–কিছু ভেবো না হ্যারি। আমার কাছে মহাস্ত্র আছে। সব রাজারাই সেই অস্ত্রে ঘায়েল হয়। ফ্রান্সিস বলল।
–মহাস্ত্রটা কী? হ্যারি বলল।
রোমান সম্রাট মাতিসের গুপ্তধন ভাণ্ডার।ফ্রান্সিস বলল।
–কিন্তু তোমাকে সে ক্ষেত্রে সেই গুপ্ত ধনভাণ্ডার উদ্ধার করতেই হবে।
–ঠিক। কিন্তু যদি কোনো ব্যাপারটা জটিল গুপ্তভাণ্ডার উদ্ধার করতে পারবে না তবে রাতের অন্ধকারে পালাবে। ফ্রান্সিস বলল।
–তাহলে চলো জাহাজ জাহাজঘাটেই লাগাই। দেখা যাকে কী হয়। হ্যারি বলল।
দূর থেকে ফ্রান্সিস আর হ্যারি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে দেখতে লাগল। যা আশঙ্কা করা গিয়েছিল তাই হল। রাজা ফার্নান্দোর দুই যুদ্ধ জাহাজেই সৈন্যদের ছুটোছুটি দেখল
–ফ্রান্সিস আমরা ধরা পড়ে গেছি। হ্যারি বলল।
–সেটা জেনেই এখানে এসেছি। দেখা যাক রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যরা কী করে। ফ্রান্সিস বলল।
তীরভূমির খুব কাছে এসে ফ্রান্সিসদের জাহাজ থামল। নোঙর ফেলা হল। কাঠের পাটাতন ফেলা হল না।
বিকেলের পড়ন্ত আলোয় দেখা গেল তীরভূমি দিয়ে কয়েকজন রাজা ফার্নান্দোর সৈন্য ফ্রান্সিসদের জাহাজের দিকে আসছে।
সামনের লোকটিকে দেখে বোঝা গেল নতুন সেনাপতি। ওরা ফ্রান্সিসদের জাহাজের সামনে এসে দাঁড়াল। একজন সৈন্য চেঁচিয়ে বলল–এ দেশের সেনাপতি এসেছেন। পাটাতন ফ্যালো৷ ফ্রান্সিস বলল–বিস্কো যা বলছে তা করো। বিস্কো পাটাতন ফেলল। সেনাপতি দলবল নিয়ে ফ্রান্সিসদের জাহাজে উঠে পড়ল। নতুন সেনাপতির চেহারা আগের সেনাপতির বিপরীত। ঠোঁটের ওপর মোটা গোঁফ। গোবদা গোবদা শরীর। কুকুতে চোখ। জাহাজে উঠে বলল তোমাদের দলনেতা কে?
ফ্রান্সিস এগিয়ে এলো। বলল আমি।
–তোমাদের সবাইকে বন্দী করা হল। কয়েদঘরে থাকতে হবে তোমাদের। নতুন সেনাপতি বলল।
-বেশ। আপত্তি নেই। কয়েদঘরে থাকবো আমরা। কিন্তু কাল সকালে রাজা ফার্নান্দোর কাছে আমাদের যেতে দেবেন। ফ্রান্সিস বলল।
-কেন? সেনাপতি বলল।
–সেটা আমি রাজা ফার্নান্দোকেই বলবো। ফ্রান্সিস বলল।
–না। আগে আমাকে বলবে। সব শুনে আমি অনুমতি দিলে তবেই রাজার সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করবো। নতুন সেনাপতি বলল।
–বেশ শুনুন–প্রায় দেড়শো বছর আগে এক রোমান সম্রাট শত্রুর হাত থেকে বাঁচাতে তাঁর রাজকোষেরসবমূল্যবান অলঙ্কার পাথর সোনার চামচ জিরাল্ডারটাওয়ারের কোথাও গোপনে রেখেছিলেন। ফ্রান্সিস বলল।
-হ্যাঁ এই ঘটনার কথা আমি শুনেছি। পরে এখানকার রাজারা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও সেই মূল্যবান ধনসম্পদ উদ্ধার করতে পারে নি। নতুন সেনাপতি বলল।
–আমিও চেষ্টা করবোই ঐ ধনসম্পদ উদ্ধার করতে। ফ্রান্সিস বলল।
নতুন সেনাপতি খ্যাক খ্যাক করে হেসে উঠল। বলল–হাতিঘোড়া গেল তল মশা বলে কত জল। ফ্রান্সিসও সঙ্গে সঙ্গে জোরে হো হো করে হেসে উঠল। সেনাপতি হাসি থামিয়ে কড়াচোখে ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। তারপর বলল–ঠিক আছে। রাজা ফার্নান্দোর সঙ্গে তোমার কথা বলিয়ে দেবো। কালকে সকালে রাজসভায়।
-খুব ভালো কথা। শাঙ্কো বলল।
নাও-এবার কয়েদখানায় চলো। সেনাপতি বলল।
ফ্রান্সিসরা দল বেঁধে চলল। সঙ্গে মারিয়া। ওদের ঘিরে নিয়ে চলল সৈন্যরা সেনাপতির পাশের হাঁটছিল শাঙ্কো।শাঙ্কো বলল–আগের সেনাপতি যে ছিল সে তো তালপাতার সেপাই। হা–সেনাপতি হলে তার চেহারা আমার মতোই হাওয়া চাই। সেনাপতি ঠোঁটের ফাঁকে হাসল। তারপর শাঙ্কোর মন্তব্যটা সবাই শুনল কিনা সেটা চারদিকে তাকিয়ে যাচাই করে নিল। বোঝা গেল তাদের কয়েকটি সৈন্য শাঙ্কোর মন্তব্য শুনেছে। সেনাপতি একবার গোঁফে তা দিল।
সন্ধে নাগাদ ফ্রান্সিসরা কয়েদঘরের সামনে পৌঁছল। কয়েদঘরের দরজার দুপাশে মশাল জ্বলছে। দুজন পাহারাদার পাহারা দিচ্ছে।
ঢং ঢং শব্দ তুলে দরজা খোলা হল। শাঙ্কো সেনাপতির কাছে গেল। বলল-দেখুন, মহামান্য সেনাপতি আমাদের দেশের রাজকুমারী আমাদের সঙ্গে রয়েছেন। এই কয়েদঘরে স থাকতে তার খুবই কষ্ট হবে।
