–তুমি এতসব জানলে কী করে? হ্যারি বলল।
–আমরা বংশপরম্পরায় এই ঘটনাটি শুনে আসছি। আমাদের পূর্বপুরুষ সোনিক্কা নিশ্চয়ই এই ঘটনা বংশের কাউকে বলেছিলেন। সেটাই আমাদের বংশের মানুষদের মধ্যে গল্পকথার মতো চলে আসছে। আলখাতিব বলল।
–তারপর বল। হ্যারি বলল।
অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে তিনজনে উঠতে লাগলেন। টাওয়ারের জায়গায় জায়গায় তো জানালার মতো চৌকো ফোকর। এখানে চাঁদের আলো পড়েছে।
সম্রাট সামনে। পেছনে অন্য মিস্ত্রিটি। শেষে সোনিক্কা। তিনি আগেঅন্ধকারে চামড়ার বড়ো থলিটার মুখ খুলে ফেলেছিলেন। এবার থলিতে হাত ঢোকালেন। একমুঠো কী যেন তুলে আনলেন।চাঁদের আলোয় দেখলেন হীরেমণিমাণিক্য। রেখে দিলেন সেসব। মুহূর্তে বুঝলেন এসব রাজকোষ থেকে আনা। এই জিরাল্ডা মিনারের কোথাও লুকিয়ে রাখার জন্যে সম্রাট এনেছেন। দুজন মিস্ত্রির সাহায্যে তিনি এটা করবেন। তারপর বুদ্ধিমানেরা যা করে তাই করবেন। সোনিক্কা আর অন্য মিস্ত্রিটাকে হত্যা করবেন।
–সোনিক্কা পালালেন–তাই না? ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ। সোনিক্কা থলিটা সিঁড়িতে রেখে ফিরে দাঁড়ালেন। সম্রাটের সতর্ক দৃষ্টিতে ধরা পড়ল। সম্রাট সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়িয়ে সোনিকাকে বললেন–পালাবার চেষ্টা করবে। না। কিন্তু সোনিক্কা ততক্ষণে কয়েকটা সিঁড়ি শেষে এসেছেন। সম্রাট সঙ্গে সঙ্গে তলোয়ার কোষমুক্ত করলেন। অন্ধকারেই তলোয়ার চালালেন। সেই তলোয়ারের ঘা সোনিক্কার পিঠে পড়ল। আহত সোনিকা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলেন। সম্রাটও কয়েকটা সিঁড়ি দ্রুতপায়ে নেমে এলেন। সোনিকা ততক্ষণে মিনারের বাইরে চলে এসেছেন। পাগলের মতো ছুটতে লাগলেন। সম্রাট বুঝলেন সোনিকাকে ধরা যাবে না।তিনি টাওয়ার থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। দেখলেন সোনিকা সদর দেউড়ির মাথায় উঠে পড়েছেন। সান্ত্রী প্রহরী কেউ নেই যে সোনিক্কার পিছু ধাওয়া করবে।
সম্রাট টাওয়ারে ফিরে এলেন।
হ্যারি বলল–তাহলে বোঝা যাচ্ছে সম্রাট তার রাজকোষ কোথায় গোপনে বানালেন সেটা তোমার পূর্বপুরুষ সোনিকা দেখতে পান নি।
না। আলখাতিব বলল–তবেঅন্য রাজমিস্ত্রিটি রাজকোষ কোথায় গোপনে রাখা হল সেটা জানতো কারণ ও নিজেই কাজটা করেছিল। কিন্তু সেই রাজমিস্ত্রিটিকে পরে কেউ কোনোদিন দ্যাখেনি। তার মানে সম্রাট তাকে হত্যা করেছিলেন।
কিন্তু রাজা তোমাকে বন্দী করে রেখেছিল কেন ফ্রান্সিস বলল।
–রাজা ফার্নান্দোর মন্ত্রীরা বংশের সঙ্গে আমাদের বংশের শত্রুতা অনেকদিন যাবৎ, চলে আসছে। সেই সেনাপতিই রাজাকে বলেছিল যে আমাদের পরিবারের লোকরা জানে–রোমান সম্রাট কোথায় তার রাজকোষ গোপনে রেখেছিলেন।
রাজা ফার্নান্দোর সৈন্য আমাকে বন্দী করে রাজার সভা ঘরে নিয়ে এলো। সেনাপতিটি যখন সেনাপতি হল তখনই আমি জানতাম আমাদের পরিবারের ওপর অত্যাচার শুরু হবে। তাই বাবা আর ঠাকুর্দাকে হুয়েনভায় নিয়ে গিয়েছিলাম। এক আত্মীয়ের বাড়িতে রেখে এসেছিলাম। সৈন্যরা বাবা আর ঠাকুর্দাকে পায় নি।
-তারপর? ফ্রান্সিস বলল।
–রাজ ফার্নান্দো আমার কাছে জানতে চাইলেন আমার কোনো পূর্বপুরুষ সম্রাট মাতিসের রাজকোষ কোথায় লুকিয়ে রাখা হল তা জেনেছিল কিনা। আমি বললাম রাজকোষ জিরাল্ড টাওয়ারের কোথাও গোপনে রাখা হয়েছে এটা আমার পূর্বপুরুষ সোনিকা জানতে পারেন নি। সোনিকা জিরাল্ডা টাওয়ারে ওঠার আগেই পালিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু রাজা ফার্নান্দো সেটা বিশ্বাস করলেন না। কয়েদঘরে রেখে আমার ওপর ভীষণ অত্যাচার চালাল। অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আমি মিথ্যে করে বললাম যে আমার পূর্বপুরুষ সোনিক্কা মৃত্যুর সময় বলে গিয়েছিলেন যে সম্রাট মাতিসের গুপ্তধন জিরাল্ডো টাওয়ারের সিঁড়ির ধাপে পুঁতে রাখা হয়েছে। কথাটা বলে আমি অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচলাম। কিন্তু আমার বিপদ কাটল না। রাজা ফার্নান্দো তাঁর শ’পাঁচেক সৈন্যকে লাগালেন জিলাল্ডা টাওয়ারের সব সিঁড়ি ভেঙে ফেলার জন্যে। আমাকে মুক্তি দেওয়া হল।
কিন্তু রোমান সম্রাটের কোষাগার পাওয়া গেল না–এই তো? ফ্রান্সিস হেসে বলল।
–হ্যাঁ। আমি হুয়েনভা বন্দর শহরে পালিয়ে গিয়েছিলাম। ক্রুদ্ধ রাজা ফার্নান্দো আমাকে ধরবার জন্যে গুপ্তচর লাগাল।আমি ধরা পড়লাম।আবারকয়েদখানায় ঢোকানো হল আমাকে। আলখাতিব থামল।
কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না।
ভেন ঘরে ঢুকল। ফ্রান্সিস বলল-ভেন দরকারি ওষুধটষুধ পেয়েছো?
—হ্যাঁ।
–তাহলে কাল সকালেই জাহাজ ছাড়তে হবে। হ্যারিকে বলল
–হ্যারি সবাইকে ডেক-এ আসতে বলল। আমার কিছু কথা বলার আছে। হ্যারি ঘর থেকে বেরিয়ে সবাইকে খবর দিতে চলল।
কিছুক্ষণ পরে হ্যারি ফিরে এলো। বলল–ফ্রান্সিস সবাই এসেছে। তুমি চল।
ফ্রান্সিস হ্যারি মারিয়া জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো।
ডেক-এ বন্ধুরা সব জড়ো হয়েছে। ফ্রান্সিস কী বলে শুনতে এসেছে। ফ্রান্সিস একবার চারদিকে তাকিয়ে নিল। গলা চড়িয়ে বলতে লাগল–ভাইসব–আমরা এখন হুয়েন বন্দর শহরে যাবো। ওখান থেকে যাবো সেভিলে। প্রায় দেড়শ বছর আগে এক রোমান সম্রাট মাতিস জিরাল্ডা টাওয়ারের কোথাও তাঁর রাজকোষ গোপনে রেখে গেছেন সেটা আমি উদ্ধার করবো। ভাইকিং বন্ধুদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হল। শাঙ্কো একটু গলা চড়িয়ে বলল–ফ্রান্সিস আমরা অনেকদিন দেশছাড়া। এখানে পড়ে না থেকে চলো এবার দেশে ফিরে যাই।ফ্রান্সিসদৃঢ়স্বরে বলল-শাঙ্কো চোমরা ভালো করেই জানোআমাকেসঙ্কল্পচ্যুত মুক্ত করা যায় না। আর কোনো বন্ধু কিছু বলল না। ফ্রান্সিস বলল–সেভিলে যাবো আমি হ্যারি আর বিস্কো। গুপ্ত রাজকোষ খুঁজবো। তোমরা এখানে হুয়েভা বন্দরে থাকবে।
