–ঐ তো এক জ্বালা। কী যে হয়। ফ্রান্সিস বলল।
–আমার জন্যে ভেবো না। আমি ভালো আছি। মারিয়া বলল।
–তোমাকে সঙ্গে আনা ভালো হয়নি। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক উল্টে। আমার যে কী আনন্দ হয় কত বিচিত্র দেশ কত বিচিত্র মানুষ। রাজবাড়ির ঘরে পড়ে থাকলে এ জীবনেও দেখা হত না। আমি এসে খুশি হয়েছি। শরীরের ভালো-মন্দ লেগেই থাকে। একটু বিশ্রাম পেলেই আমার শরীর ভালো হয়ে যাবে। মারিয়া বলল।
–না। ভেনকে বলতে হবে ও যেন এখানকার কোনো কবিরাজের কাছ থেকে ভালো ভালো ওষুধ সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। বিশেষ করে তোমাকে চিকিৎসার জন্যে।
আমার কোনো অসুখ নেই। মারিয়া বলল।
–ঠিক আছে–সেটা ভেন বুঝবে। ফ্রান্সিস বলল।
প্রাসাদের বাইরে আনতে বন্ধুরা ছুটে এলো। আনন্দে ওরা ধ্বনি তুলল–ও-হো হো।
এবার সবাই জাহাজঘাটের দিকে চলল।
জাহাজে উঠে ফ্রান্সিস প্রথমেই ভেন-এর কেবিনঘরে গেল। ভেন আধশোয়া হয়ে ছিল। ফ্রান্সিসকে দেখে উঠে বসল। ফ্রন্সিস বলল–ভেন–তোমায় ওষুধটষুধ নিশ্চয়ই শেষ হয়ে এসেছে।
— কিছু ওষুধ জোগাড় করতে হবে। ভেন বলল।
–তাহলে এক কাজ করো। দুপুরে খেয়েদেয়ে তীরে নামো। দুএকজন কবিরাজকে খুঁজে বের করো। দরকারি ওষুধ তাদের কাছ থেকে নাও। শাঙ্কোর কাছ থেকে দশটা স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে যাও। ফ্রান্সিস বলল।
-স্বর্ণমুদ্রা লাগবে না। ভেন বলল।
–না লাগলে নিজের কাছেই রেখে দেবে। আবার আর এক বন্দরে পৌঁছলে সেখানেও ওষুধ জোগাড় করবে। ফ্রান্সিস বলল।
-ঠিক আছে। ভেন বলল।
–শোনো ভেন তোমার ওষুধ সংগ্রহের জন্যে আমরা এখানে দুদিন থাকবো। ফ্রান্সিস বলল।
–তাহলে তো খুবই ভালো হয়। ভেন বলল।
দুপুরের খাবার খেয়ে নিয়ে ভেন তীরভূমিতে নামল। তারপর সদর রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল উত্তরমুখো। খোঁজ করতে করতে তিনজন কবিরাজের ঠিকানা পেল। ভেন বেরুলো তাদের সঙ্গে দেখা করার জন্যে।
ফ্রান্সিসরা দুদিন ক্যামেরিনাল বন্দর শহরে রইল। ভেনও খুব ছুটোছুটি করে ওষুধ জোগাড় করল।
এবার যাত্রা। জাহাজের নোঙর তোলা হল। গোটানোপাল খুলে দেওয়া হল। বাতাস পড়ে গেছে। দাঁড়ঘরে গেল কয়েকজন। দাঁড় বাইতে লাগল। জাহাজ দ্রুত চলল সমুদ্রের ঢেউ ভেঙে।
সেদিন দুপুরবেলা। খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেছে। ফ্রান্সিসের কেবিনঘরে হ্যারি আর শাঙ্কো এলো। গল্পগুজব চলল। মারিয়াও যোগ দিল।
আলখাতিব ঢুকল। ফ্রান্সিস আলখাতিবকে ওর বিছানায় বসতে বলল। আলখাতিব বিছানায় বসল। তারপর বলল–আপনারা তো জাহাজ চালিয়ে চলে যাবেন। আমি কী করবো? ফ্রান্সিস বলল–তুমি এখানেই থাকবে।
–কিন্তু দৈবাৎ যদি রাজা ফার্নান্দোর গুপ্তচরের নজরে পড়ে যাই তাহলে ফাঁসির হাত থেকে আমাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। আলখাতিব বলল।
ফ্রান্সিস একটু চুপ করে থেকে বলল–আচ্ছা আলখাতিব কিছুদিন আগে তুমি এক রোমান সম্রাটের কথা বলেছিলে। জিরাল্ডা টাওয়ারের কোথাও সম্রাট মাতিস তার রাজভাণ্ডার লুকিয়ে রেখেছিলেন ব্যাপারটা কী বলল তো। তোমার প্রপিতামহ নাকি জানতো কোথায় মাতিস ধনসম্পদ রেখেছিল। আলখাতিব একটু চুপকরে থেমে বলল– সে অনেক কথা। সেসব আপনার শুনে কী হবে। সেটা আমরা বুঝব। তুমি বলো। হ্যারি বলল।
আলখাতিব একটু থেমে বলতে লাগল–সেভিল বন্দর শহরে প্রায় দেড়শো বছর আগে একজন রোমান সম্রাট মাতিস রাজত্ব করতেন। তিনি সেভিলে জিরাল্ডা টাওয়ার নির্মাণ করে ছিলেন। সেই টাওয়ার নির্মাণ করাবার সময় আমার এক পূর্বপুরুষ সোনিকা রাজমিস্ত্রির কাজ করেছিলেন। আলখাতিব থামল।
-তারপর? ফ্রান্সিস বলল।
–ঐসময়ে খলিফা আনমন সুরে সেভিল আক্রমণ করতে এসেছিল। গুপ্তচরমারফৎ এই খবর পেয়ে সম্রাট মাতিস স্থির করলেন রাজকোষ জিরাল্ডা টাওয়ারের মধ্যে কোথা গোপনে রেখে দেবেন।
সেইদিনই রাতে আমার পূর্বপুরুষ সোনিকা আর একজন রাজমিস্ত্রিকে রাজপ্রাসাদে ডেকে পাঠালেন। সেই রাতে দুজনকে নানা সুস্বাদু খাবার খাওয়ালেন। পেটপুরে খেল দুজনে। তারপর পাখির পালকে তৈরি বিছানায় দুজনেল শুল। কী সুন্দর ঘর। পাথরের দেয়ালে পাখি লতাপাতা ফুলের কাজ করা। ঘরের এক কোণায় কী জ্বলছে। ধূয়ো ছড়াচ্ছে। কী সুন্দর গন্ধ।
দুর্জনেঘুমিয়ে পড়ল।
গভীর রাতে দুজনেরই ঘুম ভেঙে গেল সম্রাটের ডাকে। দুজনে বিছানায় উঠে বসল। বিছানা থেকে নেমে এলো। সম্রাট সোনিক্কার হাতে দিলে একটা চামড়ার বড়ো থলি। সোনিক্কা ওটা কাঁধে করে নিয়ে নিল। সম্রাট বললেন আমার সঙ্গে এসো।
সম্রাটের সঙ্গে দুজনে প্রাসাদের বাইরে এলো।
সম্রাট হাঁটতে লাগলেন জিরাল্ডা টাওয়ারের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে বললেন–সব দ্বারী প্রতিহারীকে ছুটি দিয়েছি। আমি যা তোমাদের দিয়ে করাব না সেটা আমি গোপনে করতে চাইছি।
সোনিক্কা দেখল প্রাসাদের দরজায় বড়ো দেউড়ির কাছে কোথাও কোনো প্রহরী নেই।
রাত্রি জ্যোৎস্নালোকিত। সবই অনেকটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
তিনজনে জিরল্ডো টাওয়ারের নীচে এসে দাঁড়াল। সম্রাট সোনিকাকে নিয়ে টাওয়ারের প্রথম সিঁড়ির কাছে এলেন।সিঁড়ির ওপরে কয়েকটা পাথরের পাটা রাখা।সম্রাট বললেন অন্য মিস্ত্রিটাকে–তুমি বেশ শক্তসমর্থ। এই পাথরের পাটা নিয়ে টাওয়ারের মাথায় উঠতে হবে। তুমি যথেষ্ট বলশালী। তুমি পারবে। পাটাতনগুলো নাও। ঐ রাজমিস্ত্রি টানগুলোনিল।মাথার ওপর পাটাতনগুলো চাপিয়ে মিস্ত্রি সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল।
