বনজঙ্গলে পৌঁছোবার আগেই সেনাপতি ফ্রান্সিসের হাতে ধরা পড়ল। তলেদো সৈন্যরাও এসে পৌঁছেছে। সেনাপতির হাতে তলোয়ার নেই। ফ্রান্সিস একজন তলেদো সেনার হাত থেকে তলোয়ার নিয়ে সেনাপতির দিকে ছুঁড়ে দিল। তলোয়ার মাটিতে পড়ল। বলল–অস্ত্র দিলাম। লড়াই করো। দুজনেই হাঁপাচ্ছে তখন। মাটি থেকে তলোয়ার তুলে সেনাপতি ফ্রান্সিসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস একটু সরে গিয়ে তলোয়ারের প্রথম মারটা সামলাল। তারপর আক্রমণ করল। দুজনের তলোয়ারের লড়াই চলল। ফ্রান্সিসের দ্রুত আক্রমণের মুখে সেনাপতির নিজেকে অসহায় মনে হল। তলোয়ারে কাটা হাত কাঁধ মুখ থেকে রক্ত ঝরছে। লড়াই চলল।
হঠাৎ একজন তলেদো সৈন্য সেনাপতির দিকে ছুটে গেল। ফ্রন্সিস বাধা দেবার আগেই সৈন্যটি সেনাপতির বুকে তলোয়ার বিধিয়ে দিল। সেনাপতি তলোয়ার ফেলে দুহাত তুলে পেছনে গড়িয়ে পড়ল। কয়েকবার হাঁ করে শ্বাস নিয়ে মারা গেল।
ফ্রান্সিস বেশ রেগে গেল। তলেদো সৈন্যটির কাছে গেল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল– তোমার আগেই আমি সেনাপতিকে হত্যা করতে পারতাম। কিন্ত করি নি। চেষ্টা করেছি সেনাপতিকে হার স্বীকার করাতে। যুদ্ধযাত্রার আগেই আমি বলেছিলাম বিনা কারণে আমরা নরহত্যা করব না তুমি তাই করলে?
ফ্রান্সিস একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সেনাবাসের দিকে ফিরে এলো। সেনাপতির সৈন্যদের তখন হাতে দড়ি বেঁধে কয়েদঘরে ঢোকানো হচ্ছে।
হ্যারি ফ্রান্সিসের কাছে এলো। বলল কী করবে এখন? রাজা রিকার্ডোর কাছে যাবো। তাঁর জয়ের সংবাদ জানাবো। তারপর মারিয়াকে নিয়ে চলে আসবো। জাহাজে ফিরে এসে জাহাজ চালাবো দেশের দিকে।
সব বন্ধুদের ডেকে এনে একত্র করা হল। সবাই চলল রাজপ্রাসাদের দিকে।
রাজপ্রাসাদের সামনে যখন ওরা এলো তখন ভোর হয়ে গেছে। রাজা রিকার্ডোর জয়ের সংবাদ তখন সারা ক্যামেরিনালে ছড়িয়ে পড়েছে। দলে দলে প্রজারা আসতে লাগল রাজপ্রাসাদের দিকে।
ফ্রান্সিসরা রাজপ্রাসাদের সামনে এলো। দেখল সদর দেউড়ি বন্ধ। প্রাসাদের সীমাঘেরা পাথরের দেয়ালের পরেই প্রজারা দাঁড়িয়ে আছে।
হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস–সমস্যায় পড়া গেল।
–হ্যাঁ। ভেতরেই তো যাওয়া যাবো না এখন। ফ্রান্সিস বলল।
–তারপর যুদ্ধে জয়ী রাজা এখন প্রজাদের দর্শন দেবেন। এতেও কম সময় যাবে না। শাঙ্কো বলল।
ফ্রান্সিসরা প্রায় ঘণ্টা দুয়েক অপেক্ষা করল। রাজা রিকার্ডো ডান হাত তুলে প্রজাদের উৎসাহিত করতে লাগলেন। প্রজারা রাজার জয়ধ্বনি করল।
আস্তে আস্তে প্রজারা চলে যেতে লাগল। প্রাসাদের চারপাশের ভিড় কমে গেল।
ফ্রান্সিস সদর দেউড়িতে এলো। প্রহরীকে ফ্রান্সিস বলল–ভাই–আমাদের একবার ভেতরে যেতেই হবে।
–কেন বলুন তো? প্রহরী বলল।
–দেখতেই পাচ্ছো আমরা বিদেশি। আমাদের দেশের রাজকুমারী প্রাসাদে আছেন। আমরা তাঁকে নিতে এসেছি। ফ্রান্সিস বলল।
তার জন্যে রাজার হুকুম লাগবে। প্রহরী বলল।
–ঠিক আছে–আমরা রাজার কাছে যাবো। ফ্রান্সিস বলল।
–মাত্র দুজন আসুন। কথাটা বলে প্রহরী দরজা খুলে দিল।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি ঢুকল। পাথর বাঁধা ছোটো পথটা ধরে ওরা প্রাসাদের প্রথমে ঘরটার সামনে এলো। দরজায় দুজন প্রহরী। হাতে পেতলের বর্শা। ঝকঝক করছে। ফ্রান্সিস মনে মনে হাসল। এত যে যুদ্ধ হল তখন কোথায় ছিল এরা। ফ্রান্সিস প্রহরীকে বলল–রাজা রিকার্ডোকে গিয়ে বলো দুজন ভাইকিং তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। প্রহরী চলে গেল। একটু পরেই এলো। বলল–আপনারা এ ঘরে বসুন। রাজা আসছেন।
ফ্রান্সিস হ্যারি ঘরটায় ঢুকল। দেখল ঘরটা বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। ঘরের মাঝখানে একটা শ্বেতপাথর বাঁধানো বড়ো টেবিল। টেবিলটার চারপাশে চেয়ার পাতা। চেয়ারের গদী পাখির পালকের।
ফ্রান্সিসরা বসল। রাজা রিকার্ডো ঢুকলেন। হাসতে হাসতে এগিয়ে এলেন। ফ্রান্সিস
হ্যারি উঠে দাঁড়াল। রাজ এগিয়ে এসে ফ্রন্সিসের হাতটা ধরলেন। হাতটা ঝুঁকুনি দিতে দিতে বললেন–আমি সব শুনেছি। আপনারা আমার দেশ শত্রু মুক্ত করলেন এজন্য আমি আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ।
ও কথা বলবেন না। তলেদোরাও দুর্ধর্ষ যোদ্ধ। ওদের সহায়তা পেয়েই আমরা যুদ্ধে জয়ী হলাম।
–তবু আপনারা তো এদেশবাসী নন। এখানে কে রাজা হল কে হল না এসবের সঙ্গে আপনাদের তো কোনো সম্পর্ক নেই। তবু আমার হয়ে লড়াই তো করেছেন।
মাননীয় রাজা একটা কথা বলছিলাম।
–বলুন।
–আমাদের দেশের রাজকুমারী আপনাদের অন্দরমহলে রয়েছেন। আমরা তাঁকে নিয়ে যেতে এসেছি।
বেশ তো। রাজা আস্তে হাততালি দিলেন। প্রহরী দুজন প্রায় ছুটে এলো।
অন্তঃপুরে রানিমাকে খবর পাঠাও।একজন বিদেদিনী রাজকুমারী অন্তঃপুরে রয়েছেন। তাঁকে এই ঘরে যেন পাঠানো হয়।
কিছুক্ষণ পরে একজন পরিচারিকার সঙ্গে মারিয়া ঘরটায় ঢুকল।ফ্রান্সিস আর হ্যারিকে দেখে হাসল। ফ্রান্সিস লক্ষ্য করল–মারিয়ার চোখমুখ কেমন শুকনো। চোখের নীচে কালি। মারিয়া এই কদিনেই বেশ রোগা হয়ে গেছে। মারিয়ার মুখটাও কেমন বিষণ্ণ।
রাজা রিকার্ডো আর একবার ফ্রান্সিসদের ধন্যবাদ জানালো।
ফ্রান্সিসরা প্রাসাদের বাইরে এলো। সদর দেউড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। তখন ফ্রান্সিস বলল–মারিয়া–তোমার শরীর বেশ খারাপ হয়ে গেছে। আর না এবার দেশে ফিরে যাবো। মারিয়া হেসে বলল–আবার খোঁজাখুঁজি করার কিছু পেলে দেশে ফিরে যাওয়ার কথা ভুলে যাবে।
