কিছুক্ষণের মধ্যেই জাহাজের হালটা ধরল। তখন শাঙ্কো বেশ হাঁপাচ্ছে। জাহাজের দড়িদড়া ধরে হালের খাঁজে খাঁজে পারে রেখে রেখে জাহাজে উঠল।
ডেক-এ আট দশজন ভাইকিং ঘুমিয়ে। শাঙ্কো গিয়ে ওদের কয়েকজনকে ধাক্কা দিয়ে বলল–খুব ঘুমিয়েছো এবার ওঠো। ভাইকিংরা ধড়ফড় করে উঠে বসল। শাঙ্কো বলল অস্ত্রঘরে যাও। অস্ত্র নিয়ে তৈরি হও। আজ লড়াই।
বন্ধুরা উঠে ছুটল অস্ত্রঘরের দিকে। হ্যারির কেবিনঘরে ঢুকে শাঙ্কো হ্যারিকে সব বলল। হ্যারি বলল –কিন্তু ফ্রান্সিস কেন লড়াই করতে চাইছে বুঝলাম না। শাঙ্কো বলল–সেনাপতি যেভাবে রাজপ্রাসাদ পাহারার ব্যবস্থা করেছে তাতে কারো পালাবার উপায় নেই। রাজা রানি রাজপুত্র আর বিশেষ করে মারিয়ার মুক্তির জন্যে আমাদের লড়াইতে নামতেই হবে।
–ঠিক আছে। কিন্তু আমরা যাবো কীভাবে? সদর রাস্তা ধরে যাওয়া চলবে না। সশস্ত্র আমাদের যেতে দেখলো সেনাপতি জানতে পারবেই। তাহলে ওখানেই লড়াই, শুরু হয়ে যাবে। শাঙ্কো বলল।
–না না। সেসব আমি আর ফ্রান্সিস ভেবেছি।
সেনাপতির সৈন্যাবাসের সামনেই বিরাট প্রান্তর। তারপর একটা বন। আমরা সেই বনের আড়ালে আড়ালে বনের প্রান্তে চলে আসবো। ওখান থেকে গভীর রাতে আমরা রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যদের ছাউনিতে ঝাঁপিয়ে পড়বো। ঘুমন্ত সৈন্যরা ঘুম ভেঙে উঠে তলোয়ার হাতে নেবার সময়ও পাবে না। হ্যারি বলল।
–ঠিক পরিকল্পনা। কিন্তু ঐ বনের প্রান্তে আমরা যাবো কি করে? জাহাজ চালিয়ে তীরে নিয়ে গিয়ে–শাঙ্কো বলল।
–অসম্ভব। আমরা জাহাজ থেকে সমুদ্রের জলে নামবো। তারপর নিঃশব্দে সাঁতরে বেশ কিছুটা গিয়ে তীরে উঠব। তারপর রাজপ্রাসাদকে ডাইনে রেখে আমরা হাঁটবো উত্তর মুখে। বেশ কিছুটা গেলেই বন পাবো। বনের আড়ালে আড়ালে ফ্রান্সিসদের কাছে। চলে যাবো।
–ফ্রান্সিসদের মানে? ফ্রান্সিস তো একা। হ্যারি বলল।
–না–উত্তরদিকেতলেদো নামে একদল উপজাতি থাকে। তারা রাজা রিকার্ডোকে খুব শ্রদ্ধকরে ভালোবাসে। আমরা ওদের সঙ্গে নিয়ে লড়াইয়ে নামবো।
–তাহলে তো তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে বেরোতে হবে। শাঙ্কো বলল।
— হ্যাঁ–এটা তুমি বন্ধুদের বলে দাও। হ্যারি বলল।
বন্ধুরা হ্যারির কাছে সব শুনলো। তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে সবাই তৈরি হল।
জাহাজ রইল শুধু ওদের বৈদ্য ভেন। আর সবাই তলোয়ার কোমরের ফেট্টিতে গুঁজে জাহাজের হালে পা রেখে রেখে সমুদ্রের জলে নামল।
শাঙ্কো একটু গলা চড়িয়ে বলল–তোমরা সবাই আমার পেছনে পেছনে এসো।
শাঙ্কো নিঃশব্দে সাঁতার কাটতে লাগল। পেছনে আর সবাই। শাঙ্কো লক্ষ্য ঠিক করে নিল। জাহাজঘাট থেকে বেশ দূরে তীরভূমিতে একটা জায়গা বেছে নিল। আকাশে ভাঙা চাঁদ। জ্যোৎস্না উজ্জ্বল নয়। পরিষ্কার কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তার ওপর সমুদ্রের বুকে কুয়াশা। সমুদ্রের জোর হাওয়ায় কখনো কখনো কুয়াশা ছড়িয়ে যাচ্ছে। তখনই তীরভূমি দেখা যাচ্ছে।
শাঙ্কোরা তীরভূমিতে উঠল। সবাই হাঁপাচ্ছে তখন। ওখান থেকে আবছা রাজা ফার্নান্দোর জাহাজ দেখা যাচ্ছে।
শাঙ্কোর পেছনে পেছনে বন্ধুরা আড়াআড়ি সদর রাস্তা পার হল। ঝোপঝাড়ের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে রাজপ্রাসাদের ঘেরা দেয়াল দেখল। রাজপ্রাসাদ পার হয়ে একটা ছোটো মাঠমতো। তারপরেই শুরু হয়েছে বনাঞ্চল।
শাঙ্কোরা বনে ঢুকল। শাঙ্কো তখন ভাবছে ফ্রান্সিসরা এসে পৌঁছেছে কিনা। বনের ফাঁক দিয়ে শাঙ্কো দেখল ডানদিকে প্রান্তর শুরু হয়েছে। শাঙ্কোরা হাঁটতে লাগল।
এবার বনের আড়াল থেকে শাঙ্কো দেখল প্রান্তরের ওপাশে সৈন্যাবাস। এখান থেকে আক্রমণ করা সহজ।
কিন্তু ফ্রান্সিসরা কোথায়? শাঙ্কো বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল–ভাইসব–তোমরা আস্তে আস্তে কথা বলতে বলতে এসো।
–একথা কেন বলছো? বিস্কো বলল।
–আমরা নিঃশব্দে ফ্রান্সিসদের দিকে গেলে ওরা আমাদের শত্রু মনে করতে পারে। তলোয়ার নিয়ে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। শাঙ্কো বলল।
কিছুটা গিয়ে শাঙ্কো একটু গলা চড়িয়ে ডাকল–ফ্রান্সিস ফ্রান্সিস। উত্তর নেই। শাঙ্কো যেতে যেতে আবার ডাক–ফ্রান্সিস। বনজঙ্গলের মধ্যে থেকে ফ্রান্সিসের গলা শোনা গেল–শাঙ্কো? ফ্রান্সিসরা জঙ্গলের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো। তলেদোরাও এলো। দুদল একত্র হল।
এবার আক্রমণ। সবাই তলোয়ার কোষমুক্ত করল। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল– যোদ্ধরা। অযথা নরহত্যা করবে না। জীবন বিপন্ন হলে তবেই নরহত্যা করবে। চলো।
সবাই জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলো। তারপর প্রান্তরের অস্পষ্ট চাঁদের আলোর মধ্য দিয়ে সৈন্যাবাসের দিকে ছুটতে লাগল।
অল্পক্ষণের মধ্যেই সৈন্যাবাসের কাছে এলো। তারপর লাথি দিয়ে দরজাগুলো ভাঙতে লাগল। ঘরের ভেতরে ঢুকতে লাগল। দরজা ভাঙার শব্দে রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যদের ঘুম ভেঙে গেল। তারা বিছানা ছেড়ে লাফিয়ে উঠল। কিন্তু তখন দেরি হয়ে গেছে। কিছুই করার নেই। অস্ত্রঘরে যাবারও উপায় নেই।
কিছুক্ষণের মধ্যে রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যরা বন্দী হল। ফ্রান্সিসরা ওদের প্রান্তরে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাল। কিন্তু সেনাপতি কোথায়? ফ্রান্সিস চারদিকেতাকাতে লাগল। তৎক্ষণাৎ দেখল সেনাপতি প্রান্তরের মধ্য দিয়ে ছুটছে।
ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে সেনাপতির পিছু ধাওয়া করল। আরও দুজন তলেদো সেনা ফ্রান্সিসের পিছু পিছু ছুটল।
