–তোমরা তো তলেদো জাতি? ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ। যুবকটি বলল।
তোমাদের গ্রামের মোড়লের সঙ্গে দেখা করবো। তুমি আমাদের নিয়ে যেতে পারবে? ফ্রান্সিস বলল।
কি ব্যাপার বলুন তো? যুবকটি বলল।
–সেটা তোমাদের মোড়লকে বলবো। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ। চলো। যুবকটি বলল।
যুবকটি আগে আগে চলল। ফ্রান্সিসরা পেছনে। রাস্তার ধারের বাড়িঘর থেকে লোকজন ওদের দেখতে লাগল। ওরা বোধহয় ভাবছিল এই বিদেশিগুলো কোত্থেকে এলো? এখানে কী করতে এসেছে?
একটা বড়ো বাড়ির সামনে এসে ওরা দাঁড়াল। যুবকটি বলল–এটাই মোড়লের বাড়ি। বাড়ির বাইরে লাঠি হাতে একজন পাহারাদার বসেছিল। যুবকটি এগিয়ে গিয়ে পাহারাদারকে কী বলল! পাহারাদার বাড়ির ভেতরে চলে গেল। একটু পরে বেরিয়ে এলো। বাইরের ঘরের দরজা খুলে দিল। ফ্রান্সিসরা ঘরটায় ঢুকল। বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ঘর। মাটিতে একটা নানা রঙের সুতোর কাজ করা মোটা কাপড় বিছানো। যুবকটি বলল–বসো। ফ্রান্সিস শাঙ্কো ঐ কাপড়ের ওপর বসল।
একটু পরেই মোড়ল ঘরে ঢুকল। মোড়ল বয়স্ক লোক। শরীরের বাঁধুনি দেখেই বোঝা যাচ্ছে যৌবনে সুদেহী পুরুষ ছিল। মোড়ল মোটা কাপড়টায় বসল। বলল–
–আপনারা তো বিদেশি?
–হা–আমরা ভাইকিং। ফ্রান্সিস বলল।
–ও। আপনারা আমার কাছে এসেছেন কেন? মোড়ল জানতে চাইল।
কয়েকদিন আগে সেভিলের রাজা ফার্নান্দো ক্যামেরিনাল আক্রমণ করে। ক্যামরিনালের রাজা রিকোর্ডা লড়াইয়ে হেরে গেছেন। এখন তার প্রাসাদে তিনি বন্দী। ফ্রান্সিস বলল।
–সে কি। এই লড়াইয়ের কোনো খবরই তো আমরা জানতাম না। মোড়ল বলল।
–এখন রাজা রিকার্ডো চাইছেন তার দেশ থেকে শত্রুদের তাড়াতে। সেইজন্যে উনি আপনাদের সাহায্য চেয়েছেন। ফ্রান্সিস বলল।
–আমরা নিশ্চই লড়াইয়ে নামবো। রাজা রিকার্ডোকে আমরা শ্রদ্ধা করি ভালোবাসি মোড়ল বলল।
–তাহলে আর দেরি না করে আজ সন্ধ্যাবেলা আপনার সাহসী যোদ্ধাদের নিয়ে যাত্রা শুরু করি। ফ্রান্সিস বলল।
-ঠিক আছে। মোড়ল বলল। তারপর যুবকটির দিকে তাকিয়ে কয়েকজন যোদ্ধার নাম করে তার সঙ্গে দেখা করতে বলল।
ফ্রান্সিসরা বাড়ির বাইরে এলো। যুবকটি ফ্রন্সিসদের নিজের বাড়িতে নিয়ে এলো। একটা ঘরে ফ্রান্সিসদের থাকবার ব্যবস্থা করল। ঘরটার মেঝেয় নানা কাজ করা মোটা চাদর বিছানো৷ ফ্রান্সিসরা বসল। একটু পরে ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। চোখ বুজে বলল– শাঙ্কো–এবার আমাদের বন্ধুদের কী করে খবর পাঠাবে?
–তুমি ভেবো না। আমি ঠিক ওদের খবর দিয়ে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যাতে আসতে পারে তার ব্যবস্থা করবো। শাঙ্কো বলল।
–দেখো চেষ্টা করে। ফ্রান্সিস বলল।
কিছুক্ষণ পরে একটা বাচ্চা মেয়ে একটা চিনেমাটির বাটি নিয়ে ঢুকল। মেঝেয় রাখল। ফ্রন্সিস আর শাঙ্কো বাটি দুটো নিয়ে খাবার খেতে লাগল। যরে ছাতুতে তৈরি সুস্বাদু খাবার। একে গত কয়েকদিন কয়েদঘরের অখাদ্য খাবার আর আজকে এতটা হেঁটে আসা দুজনের খিদেয় পেট জুলছিল। মুহূর্তে খেয়ে নিল।
পরদিন। দুপুরের খাওয়া খেয়ে শাঙ্কো চলে গেল। জাহাজ থেকে বন্ধুদের আনতে হবে।
সন্ধের মধ্যেই ফ্রান্সিসরা রাতের খাবার খেয়ে নিল। প্রায় চল্লিশ-পঞ্চশজন তলোদা সেনা এসে মোড়লের বাড়ির সামনে জড়ো হল। বর্ম শিরস্ত্রাণ পরা। কটিদেশে তলোয়ার ঝুলছে। বোঝা গেল লড়াইতে ওরা পটু। প্রত্যেকেরই স্বাস্থ্যজ্জ্বল দেহ।
মোড়ল বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। সব কথাবার্তা থেমে গেল। মোড়ল দুহাত তুলে বসতে লাগল–রাজা রিকার্ডো ছোটো ভাই ফার্নান্দোর কাছে লড়াইয়ে হেরে গেছেন। এখন তিনি বন্দী ফার্নান্দোর সেনাপতির হাতে। রাজা রিকার্ডো, রানি ও রাজপুত্রকে মুক্ত করতে হবে। বোঝাই যাচ্ছে সেনাপতি তাঁদের মুক্তি দেবে না। লড়াই করে সেনাপতিসহ অন্য সৈন্যদের লড়াইয়ে হারিয়ে রাজা রানি আর রাজপুত্রকে মুক্ত করতে হবে। লড়াইয়ে জয়ী হয়ে তোমরা ফিরে এসো। তোমাদের শৌর্য বীর্যের প্রতি আমি বিশ্বাস রাখি। ভাইকিংরা বিদেশি। তবু রাজারানির মুক্তির জন্যে তারা তোমাদের দলে থেকে লড়াই করবে। মোড়ল থামল। তলোয়ার কোষমুক্ত করে উঁচু করে তুলে ধরে তলেদোরা চিৎকার করে উঠল। তারপর তলোয়ার কোষবদ্ধ করল। এবার যুদ্ধযাত্রা।
ফ্রান্সিস সকলের সামনে দাঁড়াল। বলল–আমিই তোমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। আমি সেনাপতির কয়েদঘরে বন্দী ছিলাম। কাজেই সেনাপতির সৈন্যদের কোথায় কোথায় মোতয়েন করা হয়েছে আমি জানি। সেনাপতির সেনা শিবির কোথায় কোথায় তা আমি জানি। সৈন্যাবাসের আগে আছে একটা বিস্তৃত প্রান্তর! তারপরেই বনজঙ্গল। আমরা এখন যাত্রা শুরু করলে মধ্যরাত নাগাদ ঐ বনজঙ্গলের আড়ালে পৌঁছুতে পারবো। সেনাপতির নিদ্রিত সৈন্যদের আমরা আক্রমণ করবো। এবার চলো।
তলেদো সেনাদের নিয়ে ফ্রান্সিস যাত্রা শুরু করল।
ফ্রান্সিসের হিসেবটাই ঠিক ছিল। ওরা যখন বনের শেষপ্রান্তে এসে গাছগাছালির আড়ালে দাঁড়াল তখন বেশ রাত।
ওদিকে শাঙ্কো ক্যামেরিনাল নগর থেকে দূরে দূরে ঘুরে জাহাজঘাটার কাছে এলো। দেখল সেনাপতির যুদ্ধে জাহাজ জলে ভাসছে। চাঁদের আবছা আলোয় দেখল বেশ দূরে ওদের জাহাজটা নোঙর করা।
শাঙ্কো কোনো শব্দ না তুলে আস্তে আস্তে সমুদ্রের জলে নামল। তারপর নিঃশব্দে সাঁতরে চলল ওদের জাহাজের দিকে।
