পরদিন সকালে জাহাজঘাটে রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যরা জড় হল। সেনাপতি ঘোড়া চড়ে সব তদারকি করছে। সেনাপতি সৈন্যদের দুটো ভাগ করল। একদল ফার্নান্দোর সঙ্গে সেভিল ফিরে যাবে। অন্যদল এখানে থাকবে।
একটু বেলা হতে রাজা ফার্নান্দো ঘোড়ায় চড়ে জাহাজঘাটে এলেন। সৈন্যরা তার জয়ধ্বনি করল। রাজা ফার্নান্দো হাত নেড়ে সৈন্যদের উৎসাহিত করলেন। তারপর ঘোড়া থেকে নেমে শৌখিন জাহাজ থেকে পাতা পাটাতনের ওপর দিয়ে হেঁটে জাহাজ উঠলেন। যে সৈন্যরা সেভিল দিয়ে যাবে তারাও পাতা পাটাতনের উপর দিয়ে হেঁটে যুদ্ধজাহাজটায় উঠল।
কিছুপরে দুটো জাহাজই যাত্রা শুরু করল। সেদিন জোরে বাতাস বইছিল। জাহাজদুটোর পালগুলো সেই হাওয়ায় দ্রুত চলল সমুদ্রের জলের বিন্দুর মতো হয়ে গেল। তারপরই দৃষ্টির বাইরে চলে গেল। ফার্নান্দোর সৈন্যরা তখনও ঘাটে দাঁড়িয়ে রইল। সেনাপতির উচ্চ কণ্ঠস্বর শোনা গেল–সৈন্যাবাসে ফিরে চলো। সৈন্যরা সারি বেঁধে দাঁড়াল। তারপর চলল সৈন্যাবাসের দিকে।
ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো দাঁড়িয়ে এই ঘটনা দেখল। ফার্নান্দোর সৈন্যরা যখন সার বেঁধে ফিরে এলো ওরাও তখন ফিরে এলো রাজপ্রাসাদে। ওখানেই একটা ঘরে ওরা আশ্রয় নিয়েছে।
পরদিন সকালেই দুজন সৈন্য নিয়ে সেনাপতি এসে হাজির। দরজায় ধাক্কা দিল সঙ্গী সৈন্যদের একজন চেঁচিয়ে বলল–এই বিদেশি ভূতেরা–দরজা খোল।
ফ্রান্সিস আর শাঙ্কোর আগেই ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। দরজায় ধাক্কা দেওয়া চলল। শাঙ্কো উঠল। আস্তে আস্তে গিয়ে দরজা খুলল! সেনাপতি আর সৈন্যরা হুড়মুড় করে ঢুকল। সেনাপতি বলল–চলো–তোমরা বন্দী! তোমাদের কয়েদঘরে থাকতে হবে। ফ্রান্সিস দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল–আর কতবার কয়েদঘরে ঢুকবো। আমরা যাবো না।
তার মানে? সেনাপতি বলল।
–আমরা এখানেই থাকবো। শাঙ্কো বলল।
–এখন এখানে আমার কথাই আদেশ তা জানো? সেনাপতি বলল।
-হা হা জানি। ফ্রান্সিস বলল–রাজা ফার্নান্দো আপনাকে এখানকার শাসনকর্তা করে গেছে। কিন্তু সেটা আপনাদের সৈন্যদের ওপরে এখানকার অধিবাসীদের ওপরে। আমরা বিদেশি। আমাদের ওপর আপনার হুকুম চলবে না।
–কী বললে? সেনাপতি চেঁচিয়ে বলল। তারপর সৈন্যদুজনের দিকে তাকিয়ে বলল–এদের কয়েদখানায় নিয়ে যাও।
সৈন্য দুজন এগিয়ে এলো। ফ্রান্সিস একজন সৈন্যের বর্মের চামড়ার ফিতে টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলল। বর্ম মেঝেয় পড়ে গেল। সৈন্যটি অসহায়ভাবে সেনাপতির দিকে তাকাল। সেনাপতি সঙ্গে সঙ্গে তরবারি কোষমুক্ত করল। শাঙ্কো বলল–ফ্রান্সিস ঝামেলা বাড়িও না। চলো কয়েদখানায়। যা বলছে শোনো।
–বেশ–চলো। দুজন ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। সেনাপতি চলল কয়েখানার দিকে। প্রহরীরা দরজা খুলল। ফ্রান্সিসদের ঘরে ঢোকাল। সেনাপতি তলোয়ার কোষবদ্ধ হয় করল।
ফ্রান্সিসদের একঘেয়ে দিন কাটতে লাগল।
ওদিকে রাজা রিকার্ডোর দিন কাটতে লাগল গভীর দুঃখে-বেদনায়। তাকে রাজপ্রাসাদে তার ঘরেই থাকতে দেওয়া হয়েছে। হাত বাঁধা নেই। তবু রিকার্ডোর মনে শান্তি নেই। কাঁধের ঘা খুবই কষ্ট দিয়েছে তাকে। এখন সুস্থ। কাটা ঘা সেরে গেছে।
রাজা রিকার্ডো বিছানায় চুপ করে বসে ভাবেন। ভাবেন আর ভাবেন। সেভিলে নিয়ে গেলে চিরজীবনের বন্দীদশা। এখানেই বা কম কি। তার কাছে কারো আসার হুকুম নেই। এই হুকুম সেনাপতির।রিকার্ডো মুক্তির উপায় ভাবতে লাগলেন। উত্তরের পাহাড়ি এলোকায় তলেদোবাসীরা দুর্ধর্ষ যোদ্ধ। রাজা ফার্নান্দো হঠাৎই আক্রমণ করেছিল। তই তিনি তলেদোদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন নি। তাদের সাহায্য সহযোগিতা পেলে হয়তো আবার হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধার করতে পারবেন। কিন্তু কিভাবে যোগাযোগ করবেন? এখন তো তিনি বন্দী। তাঁর কাছে কারো আসার হুকুম নেই। রানি পর্যন্ত আসতে পারেন সারাজীবনে একবার সেনাপতির কড়া হুকুম।
হঠাৎই মনে পড়ে ফ্রান্সিসের কথা। ঋজু দেহ। বলিষ্ঠ যুবক। ওর সাহায্য পেলে তলেদোদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে। কিন্তু যুবকটি এখন কোথায়? রাজা রিকার্ডো এসব ভাবছেন তখনই রানি ঘরে ঢুকলেন।বিছানায় এসে বসলেন। রিকার্ডো বললেন জানো একটা উপায়ের কথা ভাবছি। সফল হলে ফার্নান্দোর সৈন্যদের যুদ্ধে হারিয়ে আমি মুক্ত হতে পারবো।
উপায়টা কী? রানি বললেন।
উত্তরদিকে তলেদো উপজাতির থাকে। দুর্ধর্ষ যোদ্ধ ওরা। ওদের নিয়ে যুদ্ধেনামতে পারলে জয় সুনিশ্চিত। রাজা বললেন।
–কিন্তু তুমি তো বন্দী। ওদের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করবে? রানি বললেন।
–একটি যুবক। ভাইকিং ওরা। আমাদের উদ্ধার করল। রাজা বললেন।
হা হা–ওর নাম ফ্রান্সিস। ওদেশের রাজকুমারীই তো ফ্রান্সিসের স্ত্রী মারিয়া। রানি বললেন।
-তাই নাকি। তাহলে তো ভালোই হল। এই মারিয়াকে বলো ও যে ভাবেই হোক। ফ্রান্সিসের সঙ্গে যেন যোগাযোগ করে। রাজা বললেন।
–আচ্ছা বলবো। রানি বললেন।
নিজের শয্যাকক্ষে এসে রানি একজন পরিচারিকাকে পাঠালেন মারিয়াকে ডেকে আনতে। কিছু পরে মারিয়া এলো। রানি রাজার সব কথা বললে। তারপর বলল– ফ্রান্সিস এখন কোথায় তুমি জানো?
–না। তবে ফ্রান্সিসকে আর কোথাও পাওয়া না গেলে বুঝতে হবে কয়েদঘরে আছে। মারিয়া বলল।
–তাহলে সেখানেই একবার খোঁজ করো। রানি বললেন।
–দেখি। মারিয়া বলল।
–ফ্রান্সিসকে বলো আমাদের দেশে উত্তরদিকেতলেদো বলে একটা পাহাড়ি জায়গা আছে। তলেদোর অধিবাসীরা বীর যোদ্ধ। ওরা রাজারিকার্ডোকে শ্রদ্ধা করে ভালোবাসে। রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যরা গভীর রাতে আক্রমণ করেছিল। তখন আমাদের সৈন্যরা সব ঘুমিয়ে পড়েছে। রাজা রিকার্ডো যদি তলেদোদের সংবাদ পাঠাবার সময় পেতেন তাহলে যুদ্ধের ফল অন্যরকম হত। আমরা জয়ী হতাম। থাকগে–মারিয়া, তুমি ফ্রান্সিসের খোঁজখবর করো।
