রাজা ফার্নান্দো ধবধবে সাদা ঘোড়াটার রেকাবে পা রেখে লাফিয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়লেন। তারপর ঘোড়া ছোটালেন ক্যামেরিনালের দিকে।
রাজা রিকার্ডো আস্তে আস্তে রাজবাড়ির গাড়িতে উঠলেন। রানি কোনো কথা বললেন না, বার বার চোখ মুছলেন, মারিয়া রাজকুমারকে জড়িয়ে ধরে রইল।
ফ্রান্সিস কোচওয়ানের জায়গায় উঠে বসল। তারপর ঘোড়া দুটোর পিঠে চাবুক মারল। ঘোড়া দুটো ছুটল। গাড়ি কিছুটা দ্রুতই চলল। ওর গাড়ি চালানো দেখে রাজা রিকার্ডো বললেন ফ্রান্সিস বোধহয় একসময় কোচওয়ানের কাজ করেছে। ফ্রান্সিস এবার ঘোড়াদুটোর এপাশে-ওপাশে চাবুক হাঁকালো। গাড়িটা আরো দ্রুতগতিতে ছুটল।
একসময় ফ্রান্সিস দেখল একজন অশ্বারোহী ওদের গাড়ির দিকে ছুটে আসছে। কাছাকাছি আসতে ফ্রান্সিস চিনল–এই গাড়ির কোচওয়ান।ফ্রান্সিস হেসে গলা চাড়িয়ে বলল,–তাহলে বেঁচে আছে। কোচওয়ান হেসে বলল–হ্যাঁ। ঘোড়া নিয়ে একটা তুলাক্ষেতে ঢুকে পড়েছিলাম। যাব তোরাজারানি কেমন আছেন?
–ভালো। তবে আর বোধহয় ভালো থাকতে পারবেন না। রাজা ফার্নান্দো রাজা রিকার্ডোকে সেভিলে নিয়ে গিয়ে চিরদিনের জন্য কয়েদঘরে বন্দী করে রাখবে বলেছে। ফ্রান্সিস বলল।
-বলেন কি? কোচওয়ান বলল।
–হ্যাঁ-এটাই রাজা ফার্নান্দোর পরিকল্পনা। যাকগে সবই শুনবে জানবে। এখন ভাই, তুমি কিছুক্ষণ গাড়ি চালাও। গাড়িতে গিয়ে উঠেকিছুক্ষণ বিশ্রাম করবো। বড়ো পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছি। ফ্রান্সিস গাড়ির গতি কমাল। কোচওয়ান ঘোড়া থেকে নামল। ঘোড়াটার গলার সাজে একটা দড়ির মুখ বাঁধল। তারপর দড়ির অন্য মুখটা গাড়ির পেছনে বাঁধল। ঘোড়াটা গাড়িটার সঙ্গে সঙ্গে চলল।
কোচওয়ান গাড়িতে উঠল। ফ্রান্সিস ততক্ষণে নেমে পাদানিতে পা রেখেছে। গাড়ির দরজায় টোকা দিয়ে ঢাকল মারিয়া। গাড়ির ভিতর থেকে মারিয়া বলল-বলো। দরজা খোলো। আমি গাড়ির ভেতরে বসবো। খুব ক্লান্ত আমি। ফ্রান্সিস বলল।
গাড়ির দরজা খুলে গেল। ফ্রান্সিস ভেতরে ঢুকে মারিয়ার পাশে বসল। দেখল রাজা রিকার্ডো গম্ভীর মুখে বসে আছেন। চোখ দুটো লাল। বোঝা গেল–উনি কেঁদেছেন। রানি তো কেঁদে কেঁদেই চলেছেন। কিশোর রাজকুমার কিছুই বুঝতে পারছে না–এখন কী করবে। ছোটো রাজকুমার মারিয়ার গা ঘেঁষে বসে আছে। মারিয়া মাঝে মাঝে ওর কপালে গালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
ফ্রান্সিস নিম্নস্বরে বলল–মাননীয় রাজা–এখন আর গাড়ির দরজা জানালা বন্ধ রেখে কী হবে? জানালা খুলে দেব?
দাও। রাজা রিকার্ডোর গম্ভীর কণ্ঠস্বর। মারিয়া জানালাগুলো খুলে দিল। একটা শীতার্ত হাওয়া ছুটে এলো। গাড়ির মধ্যে আর গুমট ভাবটা রইল না।
–মহামান্য রাজা–এখন আপনি কী করবেন? ফ্রান্সিস বলল? রাজা রিকার্ডো একবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। দেখলেন তাকে ও রানীকে দেখতে লোজন ছুটে আসছে। দৃষ্টি ফিরিয়ে ফ্রান্সিসের দিকে তাকালেন। বললেন–আমার ছোটো ভাই ফার্নান্দো তো আমার ভাগ্য নির্ধারণ করে গেছে। আমাকে আর মাননীয়া রানি, রাজকুমার! রানি বলে উঠলেন–আমরাও রাজার সঙ্গে ঐ বন্দীশালায় থাকবো। যতদিন বাঁচবো ততদিন।
রাজপ্রাসাদের প্রশস্ত পাথর বাঁধানো চত্বরে গাড়ি এসে দাঁড়াল।
রাজা রানি রাজকুমার নামল। রাজপ্রাসাদের কয়েকজন পরিচায়ক এগিয়ে এলো। রাজা বিকার্ডো কোনোদিকে না তাকিয়ে প্রাসাদে প্রবেশ করলেন। নিজের শয়ন কক্ষে গিয়ে বিছানায় বসলেন। বাঁ হাতের কাটা জায়গাটার ব্যথা আরও বেড়েছে। কিন্তু তিনি রাজবদ্যিকে ডেকে পাঠালেন না। ব্যথা বেদনা সহ্য করতে লাগলেন।
রানি রাজকুমারকে সঙ্গে নিয়ে নিজের শয়নকক্ষের দিকে যাচ্ছেন তখনই সব। পরিচায়িকারা দল বেঁধে এলো। ওরা বলল–রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যরা তাদের এখানকার ঘরগুলোতে বন্দী করে রেখেছিলেন। দিন তিনেকতাদের শুধু জল খেতে দেওয়া হয়েছিল। তিন দিন ওরা না স্নান না খাওয়া। ওদের ঘর থেকে বেরোবার হুকুম ছিল না।
তিন দিন পর ওদের ওপর শাসন একটু শিথিল হল।
পরিচারিকাদের স্নান করতে দেওয়া হয় খেতে দেওয়া হয়। তিন দিনের বন্দী দশা থেকে ওরা মুক্তি পায়। রাজা রানি আর রাজকুমারকে ফিরে পেয়ে রাজপ্রাসাদের পরিচারক পরিচারিকারা খুব খুশি। আনন্দে তারা প্রায় নাচানাচি শুরু করল। কিন্তু যখন শুনল রাজাকে রাজা ফার্নান্দো সেভিলে নিয়ে গিয়ে চিরজীবনের জন্যে বন্দী করে রাখবে তখন তাদের কষ্টে বুক ভেঙ্গে গেল। সেই বন্দীশালায় রানি ও তার ছেলেকে নিয়ে থাকবেন এটাও তারা শুনল। ওরা ভেবেছিল রাজা রানি রাজকুমার ফিরে এলেন। ওরা সেই উপলক্ষ্যে আনন্দে উৎসব করবে। এখন এসব জেনে ওরা মনমরা হয়ে গেল।
ওদিকে রাজা ফার্নান্দোর হুকুমে সেনাপতিসহ সব সৈন্যরা প্রান্তরে সমবেত হল।
রাজা ফার্নান্দো এলেন। পরনে যুদ্ধের পোশাক নয়। ঢোলা হাতা গভীর রঙের। আলখাল্লা মতো। গলায় ঝুলছে মুক্তোর মালা। আর কোনো অলঙ্কার নেই।’
সৈন্যরা তাকে দেখে তার নামে জয়ধ্বনি করল। রাজা ফার্নান্দো ডালা চড়িয়ে বলতে লাগলেন–আমার দেশপ্রেমিক সৈনিকরা–যুদ্ধে আমাদের জয় হয়েছে। এখন তোমাদের যা করণীয় তা বলছি। আমি কাল সকালে রিকার্ডোর শৌখিন জাহাজে চড়ে দেশে ফিরে যাব। একটা যুদ্ধজাহাজ আমার সঙ্গে যাবে। তাতে অর্ধেক সৈন্যদল যাবে। বাকিরা এখানে থাকবে। আমি চলে গেলে আমাদের সেনাপতির হাতে আমার সব ক্ষমতা দিয়ে যাবো। সেনাপতিই আমার প্রতিনিধিরূপে এখানে রাজত্ব করবে। তোমরা তার হুকুম মেনে চলবে। রিকার্ডোর আহত সৈন্যদের এখানকার সৈন্যাবাসে রাখা হয়েছে। চিকিৎসা চলছে। বাকিরা তিনটি কয়েদঘরে বন্দী হয়ে আছে। এখন না পরে ভেবে দেখছি তাদের নিয়ে কী করা যায়। রাজা ফার্নান্দো থামলেন। তারপরে আবার বলতে লাগলেন- গুপ্তচরেরা খবর এনেছে মালাগার শাসনকর্তা ডিসিলভা এই ক্যামেরিনাল আক্রমণ করার জন্যে সৈন্য বাহিনীকে তৈরি করছেন। কাজেই আমাদের সদা সতর্ক থাকতে হবে। একটু থেমে বলতে লাগলেন– এক সপ্তাহের মধ্যে শৌখিন জাহাজটা ফিরে আসবে। রিকার্ডোকে বন্দী করে সেভিল নিয়ে যাবে। সেখানে তাকে কয়েদঘরে সারা জীবনের জন্যে বন্দী করে রাখা হবে। আজ যে আদেশগুলি দিয়ে গেলাম তাই তোমাদের পালন করতে হবে। রাজা ফার্নান্দো থামলেন। সৈন্যরা মুক্তকণ্ঠে রাজা ফার্নন্দোর জয়ধ্বনি দিল।
