একটু পরেই জানালা খুলে গেল। দেখা গেল রাজা রিকার্ডো রানি রাজকুমারী আর মারিয়া গাড়িতে বসে আছে।
রাজা ফার্নন্দো গাড়ির জানালার কাছে এগিয়ে এলেন। বললেন–রিকার্ডো– আজাকে তোর নিস্তার নেই। থেমে আয়। শুধু দুজনের লড়াই। দেখা যাক কে বাঁচে কে মরে। রিকার্ডো দুর্বলকণ্ঠে বললেন–আমি আহত। আমাকে সুস্থ হতে দে। তারপর যেখানে খুশি আমাকে ডাকলেই একা লড়তে যাবো।
না না। আজকেই ফয়েসলা হবে। ফার্নান্দো খোলা তলোয়ার ঘুরিয়ে বললেন বাইরে আয়।
রানী ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। মারিয়া রাজকুমারকে কোলে বসান। রাজা রিকার্ডো আস্তে আস্তে উঠলেন। গাড়ি থেকে নেমে এলেন।
রাজা রিকার্ডোর মাথায় মুকুট নেই। কাঁচাপাকা লম্বা লম্বা চুল কপাল পর্যন্ত নেমে এসেছে। মাথার পেছনের লম্বা চুল নেমে এসেছে ঘাড় পর্যন্ত। চোখ দুটো লালচে। ঘুমুতে পারেন নি বলে অথবা কেঁদেছেন–নিজের দুর্ভাগ্যের কথা ভেবে।
সম্রাটের রাজকোষ রাজা ফার্নান্দো চেয়ে চেয়ে দেখলেন। পট্টি বাঁধা জায়গাটা দেখলেন। তারপর বললেন তলোয়ার বের কর। আজ দুজনের দ্বন্দ্বযুদ্ধ। রিকার্ডো আস্তে আস্তে কোমরের খাপ থেকে তলোয়ার বের করলেন।
রাজা ফার্নান্দোঝাঁপিয়ে পড়লেন। রিকার্ডো কোনোরকমে মারটা ঠেকালেন তলোয়ার দিয়ে।
হঠাৎ ফ্রান্সিস ছুটে এসে দুজনের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ান। ফার্নান্দো একটু অবাকই হলেন। বললেন–দ্বন্দ্বযুদ্ধ হচ্ছে। তুমি সরে যাও। ফ্রান্সিস ফার্নান্দোকে আস্তে আস্তে বলল–মান্যবর রাজা–এই দ্বন্দ্বযুদ্ধের ফলাফল কী হবে তা এখানে উপস্থিত সবাই জানে। দ্বন্দ্বযুদ্ধ বলে নিজের আপনি সান্ত্বনা দিচ্ছেন। একে সুযোগ বুঝে হত্যা করা বলা যায়। যে মানুষটা তলোয়ার পর্যন্ত তুলতে পারছেন না আপনি তার সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে নেমেছেন। এটা অমানবিক।
–তুমি সরে যাও। দ্বন্দ্বযুদ্ধ চলবে। ফার্নান্দো বললেন।
–হ্যাঁ দ্বন্দ্বযুদ্ধই চলবে। তরে রাজা রিকার্ডোর জায়গায় লড়বো আমি। ফ্রান্সিস বলল।
রাজা ফার্নান্দো হাহা করে হেসে উঠলেন। বললেন–তার আগে আমার দেহরক্ষীদের সঙ্গে লড়ো। তারপর আমার সঙ্গে লড়বে।
–ঠিক আছে। ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকিয়ে বলল।
–আমার দেহরক্ষীরা কিন্তু সাধারণ সৈন্য নয়। শ্রেষ্ঠ যোদ্ধরাই আমার দেহরক্ষী হয়। রাজা ফার্নান্দো বললেন।
–পরোয়া নেই। ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকিয়ে বলল।
তখনই মারিয়া চিৎকার করে ডাকল–ফ্রান্সিস–শান্ত হও।
–উপায় নেই মারিয়া। একজন আহত মানুষকে খুন করা চোখে দেখি কী করে। ভেবো না–আমি জয়ী হবোই। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিসের চারপাশে পাঁচজন দেহরক্ষী খোলা তলোয়ার নিয়ে এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস রিকার্ডোকে গিয়ে বলল–
মান্যবর–আপনার তলোয়ারটা দিন।
কিন্তু তুমি আমার জন্যে
— হ্যাঁ–আপনার জন্যেই লড়বো।
রাজা রিকার্ডো তরোবারিটা ফ্রান্সিসকে দিলেন। কিছু বললেন না। মাথা ঝুঁকিয়ে বিষণ্ণ ভঙ্গিতে এদিকে-ওদিকে নাড়ালেন।
ফ্রান্সিস তলোয়ারটা নিয়ে একটুক্ষণ চোখ বুজে রইল। তারপর চোখ খুলে তৈরি হয়ে দাঁড়াল। ফ্রান্সিসের তখন অন্য চেহারা। রুখে দাঁড়াল ফ্রান্সিস। ফ্রান্সিসের সে এক রুদ্রমূর্তি।
শুরু হল তলোয়ারের যুদ্ধ। ফ্রান্সিস বিদ্যুৎবেগে ঘুরে ঘুরে দেহরক্ষীদের সঙ্গে। তলোয়ারের লড়াই চালাল। একজন দেহরক্ষী সুযোগ বুঝে ফ্রান্সিসের বুকে লক্ষ্য করে তলোয়ার চালাল। সরে আসতে গিয়েও তলোয়ারটা ফ্রান্সিসের বুকের ওপর দিয়ে ঘেঁষ্টে গেল। জামা কেটে গেল। শরীরও কেটে গেল। রক্ত বেরিয়ে এলো। জামা খোলা। ফ্রান্সিস মুহূর্তে সেই দেহরক্ষীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। রক্ত দেখে ফ্রান্সিসের মাথায় যেন খুন চেপে গেল। প্রচণ্ড জোরে তলোয়ার চালাল। দেহরক্ষীর ঘাড়ের ওপর পড়ল সেই মার। দেহরক্ষী উবু হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। এপাশ-ওপাশ করতে লাগল।
এবার দুজন দেহরক্ষী ঝাঁপিয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস তৈরি ছিল।
দ্রুত হাতে তলোয়ার চালাল। একজনের হাত কেটে গেল। ও বসে পড়ল হাত থেকে তলোয়ার খসে পড়ে গেল। অন্যজনের পিঠে তলোয়ার গভীরভাবে বসে গেল। সে উবু হয়ে পড়ে গেল মাটিতে।
রাজা ফার্নান্দো গলা চড়িয়ে বলে উঠলেন থামো।
ফ্রান্সিস তলোয়ার নামাল। বাকি দুজন দেহরক্ষী ভীতমুখে সরে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস তখন মুখ হাঁ করে হাঁপাচ্ছে।
ফার্নান্দো তারোয়াল কোষবদ্ধকরলেন। গলা চড়িয়ে বললেন–আমার সিদ্ধান্ত আমি জানাচ্ছি।
রিকার্ডোকে সেভিল নিয়ে যাবো। একটা কয়েদঘরে সারা জীবনের জন্য বন্দী হয়ে থাকতে হবে।
–আর রানি ও রাজকুমার? ফ্রান্সিস বলল।
–তারা এখানকার প্রাসাদে থাকবে। তাদের সঙ্গে তো আমার শত্রুতা নেই। ফার্নান্দো। বললেন।
রানিমা গলা চড়িয়ে বললেন–আমি রাজপ্রাসাদে থাকবো না। ছেলেকে নিয়ে আমি স্বামীর সঙ্গে থাকবো। যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিন।
রাজা ফার্নান্দো দুহাতে ছড়িয়ে হতাশার ভঙ্গি করলেন। বললেন, ঠিক আছে আপনি যা চান তাই হবে। আপনার এখন প্রাসাদে ফিরে যান। কালকে সেভিলে ফিরে যাবার সময় রিকার্ডোকে নিয়ে যাবো।
রানিমা বললেন, আমরাও যাবো।
বেশ যাবেন। তারপর দুই আহত দেহরক্ষীকে বললেন তোমরা এখানকার কৃষকদের বাড়িতে যাও। একটা ঘোড়ার টানা গাড়ি জোগাড় করো। আহতদের নিয়ে ক্যামেরিনালে গিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করো।
