রাজা রিকার্ডোর গাড়ির পাশে এলো।
তখনই ফ্রান্সিস দেখল একদল সৈন্য ঘোড়া ছুটিয়ে আসছে। ফ্রান্সিস দেখেই বুঝল ফার্নান্দোর সৈন্য ওরা। রাজা রিকার্ডোর সৈন্যাবাসের ঘোড়াশাল থেকে ঘোড়া জোগাড় করেছে। তারপর ঘোড়া চালিয়ে রাজা রিকার্ডোকে ধরতে আসছে। ফ্রান্সিস বুঝল গাড়ির গতি বাড়াতে না পারলে ধরা পড়তে হবে।
ফ্রান্সিস একটু এগিয়ে কোচম্যানকে ইঙ্গিতে নেমে আসতে বলল। কোচম্যান চলন্ত গাড়ি থেকে এখানে ওখানে পা রেখে নেমে আসতে ফ্রান্সিস তাকে নিজের ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে দিল। নিজে গাড়ির পাদানিতে পা রেখে তারপর কোচম্যানের মতো কয়েকটা জায়গায় পা ফেলে ফেলে কোচম্যনের আসনের কাছে এলো। আসনে বসেই কোচম্যানের রেখে যাওয়া চাবুকটা ধরল। ততক্ষণে ফ্রান্সিসের গাড়ির গতি কমে গেছে। ফ্রান্সিস ঘোড়া দুটোরপিঠেচাবুক মেরে বলে উঠল–তুমি ভাই যেভাবে পারো পালাও, কোচম্যান বাঁদিকে ঘোড়ার মুখ ঘোরাল। তারপর প্রাণপণে ঘোড়া ছোটাল।
ফ্রান্সিস একবার পেছন দিকে তাকাল। দেখল ফার্নান্দোর সৈন্যরা ছুটে আসছে। ওরা অনেকটা এগিয়ে এসেছে। তখনই দেখল সৈন্যদের আগে রাজা ফার্নান্দো নিজে ঘোড়া চালাচ্ছে। ফ্রান্সিস স্থির করল ধরা দেবে না।
ফ্রান্সিস কোচম্যানের পাদানির ওপর ভর রেখে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর ঘোড়া দুটোর পিঠে চাবুক মেরে চলল। গাড়ির গতি বাড়ল। একটু পরেই দেখল নিজেদের গাড়িটা অনেকটা এগিয়ে এসেছে। আবার চাবুক মারতে লাগল। গাড়িটা আরো এগিয়ে গেল। ফার্নান্দো বেশ পেছনে পড়ে গেছে।
তখনই ডানদিকে একটা টিলামতো দেখা গেল। টিলাটার মাথা ন্যাড়া। টিলার নীচে ছাড়া ছাড়া ছোটো ছোটো জংলা গাছ। তারপরেই উঁচু উঁচু গাছ টিলার তলা পর্যন্ত বিস্তৃত।
ফ্রান্সিস দ্রুত গাড়ি ডানদিকে ঘোরাল। ছোটো ছোটো গাছপালার ওপর দিয়ে গাড়ি চলল। বড়ো বড়ো গাছগুলো আসতেই ফ্রান্সিস গাড়ি থামাল। তারপর সন্তর্পণে গাড়ি চালিয়ে কয়েকটা বড়ো গাছের আড়ালে এসে গাড়ি থামাল।
কোচওয়ানের জায়গা থেকে নেমে এলো। গাড়ির বন্ধ জানালার কাছে এসে গলা চড়িয়ে বলল-মানবের রাজা রাজা ফার্নান্দো কয়েকজন সৈন্য নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে আমাদের পিছু ধাওয়া করছে। আমি গাড়িটা একটা উঁচু টিলার আড়ালে এক জঙ্গলে এনেছি। মনে হয় ওদের দৃষ্টি এড়াতে পারবো। রাজা একটু ভগ্ন গলায় বলল–গাড়ি চালিয়ে ওদের নাগাল থেকে পালানো যায় না।
ফ্রান্সিস বলল না। আমাদের গাড়ির ঘোড়া দুটো খুবই পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছে। ওরা তো শুধু ঘোড়া চালিয়ে আসছে। আমাদের ঘোড়া দুটোকে একটা গাড়ি আর আরোহীদের টেনে আনতে হয়েছে।
হু। মনে হয় আমরা ওদের হাত থেকে পালাতে পারবো না। রাজা বললেন।
–সেইজন্যেই এইভাবে আড়াল নিয়ে এড়াবার চেষ্টা করলাম। এখন দেখা যাক। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে রইল।
একটু পরে রাজা ফার্নান্দো আর পাঁচজন সৈন্য টিলার কাছে এলো। সম্মুখে তাকিয়ে দেখল পাথর ছড়ানো রাস্তা সোজা চলে গেছে। রাজা রিকার্ডোর গাড়িটা বেপাত্তা।
ফার্নান্দো ঘোড়া থামালেন। সৈন্যরাও ঘোড়া থামাল। ফার্নান্দো বললেন– যেভাবে একটা গাড়ি আরোহীসমেত শুন্যে মিলিয়ে যেতে পারেনা।ওরা এখানে কোথাও গাড়িসুদ্ধ নিজেরাও গা ঢাকা দিয়েছে। টিলার ওপাশটা খোঁজ।
সৈন্যরা ঘোড়া থেকে নামল। চলল টিলার পেছন দিকে। বেশ কিছুক্ষণ ধরে খুঁজল। টিলাটার ঠিক নীচেই ঘন বনটায় ঢুকতে পারল না। এত ঘন জঙ্গল। ওরা ফিরে এলো। রাজাকে এসে বলল সব।
এবার রাজা ফার্নান্দো ঘোড়া থেকে নামালেন।তলোয়ার বের করলেন। তলোয়ারটা উঁচিয়ে ধরে প্রথমে ছোটো ছোটো গাছের ডালপালা কেটে কেটে এগিয়ে গেলেন টিলাটার নীচের জঙ্গলের দিকে। পেছনে পাঁচজন সৈন্য। বড়ো বড়ো গাছের গুঁড়ি কাণ্ড ডালপালা সব মিলিয়ে বেশ ঘন বন।
আর ঢোকা গেল না। রাজা ফার্নান্দো তবুঐ জায়গারই আশেপাশে খুঁজতে লাগলেন।
তখনই হঠাৎ ঘোড়ার মৃদু ডাক শোনা গেল। রাজা থককে দাঁড়িয়ে পড়ল। কান পেতে রইল। আবার ঘোড়ার ডাক। আগের চেয়ে একটু জোরে। বাঁদিক থেকে ডাক শোনা গেল।
রাজা ফার্নান্দো সঙ্গে সঙ্গে বাঁদিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। তলোয়ার লতাপাতা ডাল কাটার জন্যে খোলাই ছিল। খোলা তলোয়ার নিয়ে ফার্নান্দো ঘোড়ার ডাকের দিক স্থির করে চলল। সৈন্য পাঁচজনও চলল। ফার্নান্দো সাবধান হলেও পায়ের নীচে শুনো ডালপাতা ভাঙার শব্দ হতে লাগল।
হঠাৎ গাড়ি চলার শব্দ হল। ফার্নান্দো চিৎকার করে বললেন–গাড়ি আটকাও। ফার্নান্দোর সঙ্গে পাঁচজন সৈন্যও ছুটল।.
একটু এগোতেই দেখল গাড়িটা জোরে চালাবার চেষ্টা করছে কোচওয়ান। সৈন্যরা ছুটে গিয়ে গাড়ির চাকা ধরে ফেলল। গাড়ি থেমে গেল।
রাজা ফার্নান্দো এগিয়ে গেলেন। গাড়ির দরজা খোলার ইঙ্গিত করলেন। একজন সৈন্য ছুটে গিয়ে গাড়ির জানালা খুলতে চেষ্টা করল। পারল না। সঙ্গী সৈন্য দুজন এগিয়ে এলো। তার মানে ওরা জানালা ভেঙে ফেলবে।
ফ্রান্সিস কোচওয়ানের আসন থেকে নীচে নেমে এলো। বলল–জানালা ভাঙবেন না। আমি খোলবার ব্যবস্থা করছি। সৈন্য তিনজন দাঁড়িয়ে পড়ল।
ফ্রান্সিস বন্ধ জানালার গায়ে মুখে নিয়ে বলল–মান্যবর রাজা–আমরা ধরা পড়ে গেছি। একটা ঘোড়া ডেকে উঠেছিল বলে। যাকগে–রাজা ফার্নান্দো সামনেই কয়েকজন সৈন্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমরা ধরা পড়ে গেছি। আপনার জানালা খুলে দিন।
